মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় সংসদে এক অধিবেশনে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেছেন, ‘বর্তমান পাট কারখানাগুলো সবচেয়ে পুরোনো, পঞ্চাশ-ষাটের দশকে তৈরি। এগুলো দিয়ে শিল্পে লাভ করা সম্ভব নয়। পাটের একটা উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ রয়েছে। সেজন্য আমরা চাইছি এটাকে নতুনভাবে তৈরি করতে।’ বিগত সময়ে প্রত্যেক বছর সরকারি পাটকলগুলো অনেক লোকসান দিয়েছে। সরকারকে যে পরিমাণ ক্ষতিপূরণ দিতে হয়েছে, তার কিয়দংশ ব্যয় করে কারখানাগুলো আধুনিকায়ন করা সম্ভব। কলগুলোর পুরোনো সব যন্ত্রপাতি বদলে ফেলে সেখানে নতুন, উন্নত ও আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপনের মাধ্যমে এই শিল্পকে উন্নত করা যাবে। তবে সেগুলো ব্যবহারের জন্য দক্ষ অভিজ্ঞতা সম্পন্ন শ্রমিক নিয়োগ করতে হবে। যার ফলে কম সময়ে ও কমসংখ্যক শ্রমিক দিয়ে কয়েক গুণ বেশি পণ্য উত্পাদন সম্ভব। মিলগুলো আধুনিকায়ন করা গেলে অনেক ধরনের পাটের পণ্য তৈরি করা যাবে। বৈশ্বিক বাজারের চাহিদা অনুযায়ী পণ্য উত্পাদন ও জোগান দিতে আমাদের সক্ষমতা থাকলে প্রতি বছর অনেক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে সক্ষম হব। তবে সব প্রচেষ্টার সফলতা নির্ভর করছে সুষ্ঠু কর্মপরিকল্পনা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপর। বিজেএমসি এবং ট্রেড ইউনিয়নের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে। যারা ট্রেড ইউনিয়নের নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারা পারেন শ্রমিকদের কর্মস্পৃহা বৃদ্ধি করার জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, বাংলাদেশ চলতি অর্থবছর ২০২০-২১ সালের প্রথম মাস তথা জুলাইয়ে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি করে ৩৯১ কোটি ডলার আয় করেছে, যার মধ্যে ১০ কোটি ৩৫ লাখ ১০ হাজার ডলার এসেছে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে। এই ধারা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। পৃথিবীতে পাট দিয়ে তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্রের চাহিদা বাড়ছে। আমাদের দেশীয় পাটকলগুলোকে খেয়াল রাখতে হবে, যাতে সেই চাহিদাকে পূরণ করতে পারে। সরকারি পাটকলসমূহের ব্যবস্থাপনায় যারা জড়িত আছেন, তাদের দিকে আমরা চেয়ে থাকি বিভিন্ন দিকনির্দেশনা পাওয়ার জন্য। জানা গেছে, সময়মতো পাট কেনার সিদ্ধান্ত গ্রহণের অভাব ও কিছু কিছু ক্ষেত্রে দুর্নীতির কারণে মানুষের চাহিদা পূরণ করতে কষ্টকর হচ্ছে। নেতৃত্ব ও কর্মপরিকল্পনা প্রণয়নের অভাব, বৈশ্বিক বাজার দখলে কৌশলগত ত্রুটি, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব, অদক্ষ ও বেশিসংখ্যক শ্রমিক নিয়োগের ফলে বছরের পর বছর লোকসান গুনতে হয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত এই পাটকলগুলোকে। ফলে কলগুলো বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় সরকার। পাটশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা যদি আরো সচেতন থাকতেন, তাহলে এই শিল্প হয়তো উন্নতির পথে পরিচালিত হতো। তবে আমি আশাবাদী। বর্তমান সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশের সরকারি পাটকলগুলো নব উদ্যমে কাজ করবে এবং আমাদেরকে বিভিন্ন পাটজাত দ্রব্য উপহার দেবে।
পলি ব্যাগের অতিমাত্রায় ব্যবহার পরিবেশের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ব্যাগের যথেচ্ছ ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। পাট থেকে বস্তা, ফেব্রিক, হ্যান্ডব্যাগ, কার্পেট, শাড়ি, পর্দা, জুতা, সোফা, শো-পিসসহ শত শত রকমের পণ্য তৈরি করা সম্ভব। ইতিমধ্যেই পাটকাঠি পোড়ানো ছাই চীনে রপ্তানির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে, যা আইনতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আমাদের দেশে বছরে অনেক টাকার পাটের বস্তার ব্যবহার বাড়বে। এখন সবার দরকার সম্মিলিতভাবে জাতীয় পাটনীতি-২০১৮’ বাস্তবায়ন করা। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগ ও দেশের মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এই নীতির বাস্তবায়ন হবে। পাটজাত পণ্য উত্পাদন ও রপ্তানির পাশাপাশি নিজেদের পাট জাতীয় পণ্যের ব্যবহারে আগ্রহী হতে হবে।
ছোটবেলা থেকে মুখস্থ করে আসছি পাটকে সোনালি আঁশ বলা হয়। পাট এই বাংলার ঐতিহ্য। এই শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের এক সফল ইতিহাস এবং মিশে আছে আমাদের নিজস্বতা। এদেশের অর্থনীতিতে বহু বছর ধরে স্বমহিমায় উজ্জ্বল ছিল পাটশিল্প। সোনালি আঁশ ও রুপালি কাঠি উভয়ই বেশ সম্ভাবনাময় দিক। আমাদের আদমজী পাটকল ছিল বিশ্বের বৃহত্তম পাটকল হিসেবে স্বীকৃত। পৃথিবীর বিভিন্ন উত্পাদনকারী দেশের চেয়ে বাংলাদেশের পাট অনেক উন্নত ও অধিক সমাদৃত। তাই আমাদের পাটশিল্প ছিল অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এমনকি স্বাধীনতার পরেও দুয়েক বছর আমাদের পাটশিল্পের গৌরব ছিল অক্ষত।
বাংলাদেশের ভূমি ও আবহাওয়া পাট চাষের জন্যে উন্নত হলেও বিভিন্ন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এর চাষ কমতে শুরু করেছে। তবে অপেক্ষাকৃত উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে উত্পাদন আগের তুলনায় বেড়েছে। বাংলাদেশি কাঁচাপাট, পাটজাত পণ্য প্রধানত, চীন, ইউরোপ, আইভরিকোস্ট, থাইল্যান্ড, তুরস্ক, ইরান, আমেরিকা, সিরিয়া, অস্ট্রেলিয়া, সৌদি আরব, জাপান, সুদান, ঘানা, ভারতসহ আরো কিছু দেশে রপ্তানি করা হয়। আমি মনে করি, বর্তমান সরকারের শুভদৃষ্টির কারণে এই পাট চাষাবাদে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের ভাগ্যের পরিবর্তন হবে।
আমরা যেখানে পরিবেশ দূষণের কারণে নিজেদের অনেক সময় অনিরাপদ ভাবি, সেখানে পাটচাষ আমাদের পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ অক্সিজেন সরবরাহ করবে। অনেক সচেতন মানুষ এখন প্রকৃতি ও পরিবেশকে সংরক্ষণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুতরাং পাটশিল্পে যে সম্ভাবনা আমাদের রয়েছে, তা কাজে লাগিয়ে আমাদের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির আলো ছড়িয়ে পড়ুক সারা বিশ্বে। সময় এসেছে নিজেদের কাঁচামাল ব্যবহারে সমৃদ্ধি অর্জন করার, উন্নত দেশ গড়ার মাধ্যমে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার।
n লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট
