নির্বাচনে সহিংসতার ছায়া

আপডেট : ১৪ জানুয়ারি ২০২১, ২৩:০০

স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা বাড়ছে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও সংঘর্ষ হচ্ছে। এরই মধ্যে এই নির্বাচন ঘিরে রক্তক্ষরণ ও বেশ কিছু প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। ঝিনাইদহের শৈলকুপায় দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে এক প্রার্থীর ভাইয়ের মৃত্যুর পাঁচ ঘণ্টা পর আরেক প্রার্থীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। অনেক জায়গায় আচরণবিধি লঙ্ঘন থেকে শুরু করে প্রতিপক্ষের নির্বাচনি ক্যাম্পে হামলা-ভাঙচুর ও জবরদস্তির ঘটনাও ঘটেছে। আগামীকাল শনিবার দ্বিতীয় ধাপে দেশের ৬০ পৌরসভায় ভোট অনুষ্ঠিত হবে। এর আগেই বিভিন্ন জায়গায় সংঘর্ষ, ভাঙচুর শুরু হয়ে গেছে। বিশেষ করে, যেসব পৌরসভায় ক্ষমতাসীন দলের বিদ্রোহী প্রার্থী সক্রিয়, সেখানে পরিস্থিতি ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। তবে বেশির ভাগ সংঘর্ষ হচ্ছে কাউন্সিলর নির্বাচনকে ঘিরে।

নির্বাচনি সহিংসতার বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) শাহাদাত হোসেন চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, সহিংসতার ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তত্পর হতে বলেছি। স্থানীয় সরকার নির্বাচনগুলোয় উত্তেজনা থাকে, সহিংসতাও হয়। যদিও তা কাম্য নয়। যেসব জায়গায় সহিংসতা হচ্ছে, সেখানে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সহিংসতা রোধে কঠোর থাকতে নির্বাচন কমিশন থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, ঝিনাইদহের শৈলকুপা পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে এক প্রার্থীর ভাই নিহত হওয়ার পাঁচ ঘণ্টা পর প্রতিপক্ষ প্রার্থী আলমগীর হোসেন খানের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বুধবার গভীর রাতে উপজেলার দেবতলা গ্রামের পাশে কুমার নদ থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আনোয়ার সাঈদ জানিয়েছেন, শ্যাওলার ভেতর থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয় লোকদের কাছ থেকে খবর পেয়ে মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তবে মরদেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, ঐ সংঘর্ষের পর পালাতে গিয়ে নদী পার হওয়ার সময় তীব্র শীতে স্ট্রোক করে তার মৃত্যু হয়েছে।

আমাদের ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি বিমল সাহা জানান, বুধবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে শৈলকুপা পৌর নির্বাচনে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থী মো. আলমগীর হোসেন খান বাবু ও প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী শওকত আলির সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে লিয়াকত হোসেন নামে একজন নিহত হন। তিনি উমেদপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ও কাউন্সিলর প্রার্থী শওকত আলীর ছোট ভাই। এ ঘটনার পর আলমগীর খান বাড়ি থেকে বের হয়ে যান। রাতে নদী থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

আলমগীর খানের স্ত্রী ইতি খাতুন জানান, রাত ১০টার দিকে মোবাইল ফোনে তার স্বামীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, এখন নদীর ধার দিয়ে হেঁটে নিরাপদ স্থানে যাচ্ছেন। পরে গভীর রাতে স্বামীর মরদেহ উদ্ধারের খবর পান।

এদিকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। গত মঙ্গলবার রাতে নগরীর মোগলটুলি মগপুকুর পাড় এলাকায় ২৮ নম্বর পাঠানটুলি ওয়ার্ডের আওয়ামী লীগ সমর্থিত কাউন্সিলর প্রার্থী নজরুল ইসলাম বাহাদুর ও বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুল কাদেরের অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে আজগর আলী বাবুল (৫৫) মারা যান ও অন্য এক জন গুলিবিদ্ধসহ কয়েকজন আহত হন। এই সংঘাতের মামলায় কাউন্সিলর প্রার্থী আব্দুল কাদেরসহ ১১ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বুধবার তিন দিনের রিমান্ডে পাঠিয়েছে আদালত।

এছাড়া নারায়ণগঞ্জের তারাবো ও গাজীপুরের শ্রীপুরে পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সহিংসতা হয়েছে। পাবনার ভাঙ্গুড়া পৌর নির্বাচনের প্রচারণা ঘিরে বর্তমান ও সাবেক কাউন্সিলর প্রার্থীর কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। গত মঙ্গলবার রাতে পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বর্তমান কাউন্সিলর মোজাম্মেল হক বিশু ও সাবেক কাউন্সিলর আসাদুল ইসলামের কর্মীদের মধ্যে এ সংঘর্ষ হয়। গত এক সপ্তাহের মধ্যে বগুড়ার শেরপুরে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর নির্বাচনি মিছিলে হামলা, কার্যালয় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ, বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর কার্যালয় ভাঙচুর এবং আওয়ামী লীগ সমর্থিত এক কাউন্সিলর পদপ্রার্থীর কার্যালয়ে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। ঝালকাঠির নলছিটি পৌর নির্বাচনে ৮ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদপ্রার্থী আব্দুল্লাহ আল মামুন লাভলুর প্রচার মাইক ভাঙচুর এবং এক সমর্থককে পিটিয়ে আহত করার অভিযোগ উঠেছে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে।

এর আগে পৌর নির্বাচনের প্রথম ধাপেও সংঘর্ষে কুষ্টিয়ায় এক জন মারা গেছেন। গত ২৬ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া পৌরসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দুই কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে সোহেল সরকার মারা যান। গত ২৮ ডিসেম্বর প্রথম ধাপের ভোটের দিন পঞ্চগড়ে রিটার্নিং অফিসারের গাড়িতে হামলাসহ পাঁচ মোটরসাইকেল ভাঙচুর, কাউন্সিলর সমর্থকদের মধ্যে ধাওয়া-পালটাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

সহিংসতায় যারা জড়িত তাদের ছাড় দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর। তিনি ইত্তেফাককে বলেন, এরই মধ্যে নির্বাচন কমিশন পুলিশের আইজি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের সঙ্গে বৈঠক করে পৌর নির্বাচন নিয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন। সহিংসতাকারীদের ছাড় দেওয়া হবে না। 

প্রসঙ্গত, এবার পৌরসভার নির্বাচন হচ্ছে ধাপে ধাপে। গত ২৮ ডিসেম্বর প্রথম ধাপের পৌরসভার নির্বাচন সম্পন্ন হয়। দ্বিতীয় ধাপে আগামী ১৬ জানুয়ারি, তৃতীয় ধাপে ৩০ জানুয়ারি এবং চতুর্থ ধাপে ১৪ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচন হবে আগামী ২৭ জানুয়ারি।