যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে অভিশংসিত করেছে কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ। গত সপ্তাহে কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটল হিলে দাঙ্গার ঘটনায় বিদ্রোহে উসকানি দেওয়ার কারণে তাকে অভিশংসিত হতে হলো। নিজের দল রিপাবলিকান পার্টির ১০ জন সদস্য ট্রাম্পের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন। ট্রাম্পের অভিশংসনের পক্ষে ২৩২ ভোট এবং বিপক্ষে ১৯৭ ভোট পড়ে। তিনি দেশটির প্রথম প্রেসিডেন্ট, যিনি দুই বার অভিশংসনের শিকার হলেন এবং কংগ্রেসের পক্ষ থেকে যাকে অপরাধ সংঘটনে জড়িত থাকার কারণে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে ক্ষমতার মেয়াদ কম থাকায় সিনেটে এখনই তাকে অভিশংসিত করা সম্ভব নয়। এদিকে অভিশংসনের পর প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সমর্থকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন এবং বাইডেনের শপথ অনুষ্ঠানকে নির্বিঘ্ন করতে সব ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। খবর বিবিসি ও রয়টার্সের
যে অভিযোগে ট্রাম্পকে অভিশংসন :প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে কংগ্রেসের অভিযোগে বলা হয়েছে, ৬ জানুয়ারি হোয়াইট হাউজের বাইরে তিনি তার ভাষণের মাধ্যমে ক্যাপিটল হিলে হঠাত্ হামলার মাধ্যমে দখলে নেওয়ার ঘটনায় উসকানি দিয়েছেন। তিনি তার সমর্থকদের শান্তিপূর্ণভাবে এবং দেশপ্রেমের সঙ্গে নিজেদের আওয়াজ তোলার আহ্বান জানিয়েছিলেন। সেই সঙ্গে যে নির্বাচন তার ভাষায় কারচুপির শিকার হয়েছে, তার বিরুদ্ধে ভয়ংকর লড়াইয়েরও আহ্বান জানিয়েছিলেন। ট্রাম্পের এমন বক্তব্যের জেরে তার সমর্থকেরা ক্যাপিটল হিলে জোর করে ঢুকে পড়ে। আইনপ্রণেতাদের অধিবেশন ও নির্বাচনের ফলাফলকে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়ার প্রক্রিয়া স্থগিত করে তাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বাধ্য করে। পুরো ভবনে লকডাউন দেওয়া হয় এবং এ ঘটনায় পাঁচ জন নিহত হন। অভিশংসনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ট্রাম্প বারবার মিথ্যা বক্তব্য দিয়ে এটা প্রতীয়মান করার চেষ্টা করেছেন যে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ফলাফলে কারচুপি হয়েছে এবং তা গ্রহণযোগ্য নয়। এতে বলা হয়, এরপর তিনি বারবার একই দাবি তুলেছেন এবং ইচ্ছাকৃতভাবে জনগণের সামনে বলে তাদের উত্সাহিত করেছেন এবং এ কারণেই ক্যাপিটলে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা সহিংসতা ও প্রাণহানিতে রূপ নিয়েছে।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চরমভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও এর সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তাকে বিপন্ন করেছেন। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অখণ্ডতাকে হুমকির মুখে ফেলেছেন, ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ হস্তান্তরকে বাধাগ্রস্ত করেছেন এবং সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছেন। গত সপ্তাহে ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল এবং ট্রাম্পের হারকে মেনে নেওয়ার বিপক্ষে ১৩৯ জন রিপাবলিকান ভোট দিয়েছেন।
বিতর্কে আইনপ্রণেতারা কী বলেছেন?
বুধবার অভিশংসনের ভোট হওয়ার আগে বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয় ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদে। হাউজ স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি ফ্লোরে বলেন, প্রেসিডেন্ট এই সহিংস উত্থানকে উসকে দিয়েছেন, আমাদের দেশের বিরুদ্ধে এই সশস্ত্র বিদ্রোহকে উত্সাহ দিয়েছেন। তিনি অবশ্যই যাবেন। আমাদের ভালোবাসার দেশের প্রতি তিনি স্পষ্ট এবং চলমান হুমকি। ডেমোক্র্যাট কংগ্রেসম্যান জুলিয়ান ক্যাস্ট্রো ট্রাম্পকে ওভাল অফিসের দায়িত্ব নেওয়া সবচেয়ে বিপজ্জনক ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বেশির ভাগ রিপাবলিকানই ট্রাম্পের বক্তব্যের পক্ষে সাফাই দেননি। এর পরিবর্তে তারা বলেছেন, অভিশংসনের প্রস্তাব প্রথাগত শুনানি ছাড়াই উত্থাপিত হয়েছে এবং জাতীয় ঐক্যের জন্য এটিকে বাদ দিতে ডেমোক্র্যাটদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা। এত কম সময়ের মধ্যে প্রেসিডেন্টকে অভিশংসিত করাটা ভুল সিদ্ধান্ত হবে বলে জানিয়েছেন শীর্ষ রিপাবলিকান কেভিন ম্যাককার্থি। তবে ৬ জানুয়ারি হামলার ঘটনায় প্রেসিডেন্টকে দায়িত্ব নিতে হবে বলে উল্লেখ করেন। ওহাইও রাজ্যের রিপাবলিকান জিম জর্ডান ডেমোক্র্যাটদের বিরুদ্ধে দেশকে বেপরোয়াভাবে রাজনৈতিক বিভাজনের দিকে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ তোলেন।
পরবর্তী পদক্ষেপ কী?
ট্রাম্প এখন সিনেটে বিচারের সম্মুখীন হবেন। দোষী সাব্যস্ত হলে তিনি আবারও ক্ষমতায় আসার সুযোগ চিরতরে হারাতে পারেন। তবে তার মেয়াদ আরো এক সপ্তাহ বাকি থাকলেও তাকে এখনই হোয়াইট হাউজ ছাড়তে হচ্ছে না। কারণ এ সময়ের মধ্যে সিনেট আবার গঠন করা সম্ভব না। গত নভেম্বরে জো বাইডেনের কাছে নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর আগামী ২০ জানুয়ারি ক্ষমতা ছাড়তে হবে তাকে।
অভিশংসনের আর্টিকেলটি সিনেটে যাবে, যেখানে প্রেসিডেন্ট দোষী কি না, তার বিচার অনুষ্ঠিত হবে। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের জন্য দুই-তৃতীয়াংশ ভোট দরকার হবে। অর্থাত্ ১০০ আসনের উচ্চকক্ষে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে অন্তত ১৭ জন রিপাবলিকানকে ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে ভোট দিতে হবে। মঙ্গলবার নিউ ইয়র্ক টাইমস এক প্রতিবেদনে জানায়, কম করে হলেও ২০ জন রিপাবলিকান প্রেসিডেন্টের বিচার চান। ট্রাম্প যদি সিনেটে দোষী সাব্যস্ত হন তাহলে আইনপ্রণেতারা চাইলে আরেকটি ভোট অনুষ্ঠিত করতে পারেন, যা তাকে ২০২৪ সালে আবারও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পথকে বন্ধ করে দেবে। ট্রাম্প দোষী প্রমাণিত হলে আমেরিকায় ১৯৫৮ সালে প্রণীত সাবেক প্রেসিডেন্ট সম্পর্কিত ধারা অনুযায়ী সাবেক প্রেসিডেন্ট যেসব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন, যেমন জনগণের অর্থে অবসর ভাতা, স্বাস্থ্য বিমা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার সুযোগ সেসবও তিনি হারাবেন। তবে এ বিচারকাজ ট্রাম্প ক্ষমতায় থাকার সময় অর্থাত্ আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে না।
এক বিবৃতিতে রিপাবলিকান সিনেট নেতা মিচ ম্যাককোনেল বলেন, সব নিয়ম, প্রক্রিয়া এবং সিনেট যেখানে প্রেসিডেন্টের বিচার অনুষ্ঠিত হবে তার নজির অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট-ইলেক্ট বাইডেন শপথ নেওয়ার আগে একটি নিরপেক্ষ বা গুরুতর বিচার কোনোভাবেই অনুষ্ঠিত করা সম্ভব হবে না। তিনি বলেন, এর চেয়ে যদি বাইডেন প্রশাসনের জন্য একটি শান্তি ও সুশৃঙ্খল ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা যায়, তাহলে সেটিই জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করবে। ম্যাককোনেল তার সহকর্মীদের এক নোটের মাধ্যমে জানিয়েছেন যে, তিনি কীভাবে ভোট দেবেন সেটি এখনো ঠিক হয়নি। এখনো কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট অভিশংসনের মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে অপসারিত হননি। ২০১৯ সালে হাউজে অভিশংসিত হলেও ট্রাম্প সিনেটে পার পেয়ে যান। একই ধরনের ঘটনা ১৯৯৮ সালে বিল ক্লিনটনের সঙ্গে এবং ১৮৬৮ সালে অ্যান্ড্রু জনসনের সঙ্গে ঘটেছিল।
হামলায় জড়িতদের শাস্তি দাবি ট্রাম্পের
অভিশংসনের পর ট্রাম্প বলেন, আমার প্রকৃত কোনো ভক্ত কখনো রাজনৈতিক সহিংসতা করতে পারে না। তাই হাঙ্গামায় যারা যুক্ত ছিল, তাদের শাস্তি হওয়া উচিত। ট্রাম্প বলেছেন, স্পষ্ট কথায় সহিংসতার নিন্দা করছি। আমাদের দেশে, আমাদের কোনো আন্দোলনে সহিংসতার স্থান নেই। কোনো অজুহাত নয়। কোনো ব্যতিক্রম নয়। আমেরিকা হলো আইন মেনে চলা দেশ। ট্রাম্প তার সমর্থকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ওয়াশিংটনে শান্তি রক্ষায় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি জো বাইডেনের শপথ অনুষ্ঠানে যাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয় সেজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান। অবশ্য ট্রাম্প তার বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব নিয়ে একটি কথাও ভিডিও বার্তায় বলেননি। এক দিন আগেই ট্রাম্প বলেছিলেন, যেভাবে তাকে ইমপিচ করার চেষ্টা হচ্ছে, তাতে মানুষ খুবই ক্ষুব্ধ।
