অভ্যন্তরীণ উগ্রবাদ যখন বৃহত্তম শক্তির হুমকি!

আপডেট : ১৭ জানুয়ারি ২০২১, ২০:৫২

 

গত ৬ জানুয়ারি মার্কিন কংগ্রেস ভবন ক্যাপিটলে নজিরবিহীন হামলার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিভক্তির বিষয়টি সবার নজরে এসেছে। অনেকেই বলছেন, গত চার বছরে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিনিদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করেছেন। শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, কট্টর জাতীয়তাবাদের উত্থান হয়েছে। আর এই অভ্যন্তরীণ অসহিষ্ণুতা এবং উগ্রবাদই মার্কিন স্বার্থ আর মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি! আগামী বুধবার ২০ জানুয়ারি, নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন শপথ গ্রহণ করবেন। এই শপথ অনুষ্ঠানে যাচ্ছেন না বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ১৮৬৯ সালের পর এই প্রথম কোনো বিদায়ি প্রেসিডেন্ট তার উত্তরসূরির অভিষেক অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন না। ট্রাম্পের দাবি—তিনি পরাজিত হননি বরং ডেমোক্র্যাটরা ভোট জালিয়াতি করে জয়ী হয়েছে। ট্রাম্পের বেশির ভাগ সমর্থকও এটাই মনে করেন। ট্রাম্প গত ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের ফল উলটে দিতে সব রকম চেষ্টা করেছেন। ট্রাম্পকে ক্ষমতায় রাখতে গত ৬ জানুয়ারি তার সমর্থকরা ক্যাপিটলে হামলা চালায়। যেখানে পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে। 

এরপর মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই সতর্ক করে বলেছে, ট্রাম্প সমর্থকরা বাইডেনের শপথের আগে যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ অঙ্গরাজ্যে সশস্ত্র বিক্ষোভ করতে পারে। এ কারণে এখন প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে সশস্ত্র বিক্ষোভের আশঙ্কায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্পট, প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে সব যানবাহনে তল্লাশি চালানোর জন্য চেকপয়েন্ট বসানো হয়েছে। শপথ অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ন্যাশনাল গার্ডের ২৫ হাজার সেনা মোতায়েন করা হয়েছে। হোয়াইট হাউজের আশপাশের এলাকা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। রাজধানীর সঙ্গে সীমান্ত আছে—এমন রাজ্যগুলোতে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে। মার্কিন সিক্রেট সার্ভিসের প্রধান জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও বিশ্ব যে বিশৃঙ্খলা গত সপ্তাহে দেখেছে আমরা তা আবারও হতে দেব না।

গ্লোবাল টাইমসের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি কে? আমরা অনেক বার শুনেছি, যুক্তরাষ্ট্র তাদের জাতীয় স্বার্থ ও নাগরিকদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বাইরের দেশকে বিশেষ করে রাশিয়া ও চীনকে হুমকি মনে করে। কিন্তু গত ৬ জানুয়ারি ক্যাপিটলের দাঙ্গা আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের চিন্তার জন্য নতুন খোরাক দিয়েছে। সম্প্রতি কানাডার ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সাদিয়া মরিয়ম মালিক এক নিবন্ধে লিখেছেন, মার্কিন ক্যাপিটলে দাঙ্গার পর যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও অসন্তোষ দেশটির স্থিতিশীলতা ও মানুষের জীবনের ওপর বিদেশি সামরিক আগ্রাসনের হুমকির জায়গা নিয়েছে। এই বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রও সম্ভবত বুঝতে পারছে। ক্যাপিটলে দাঙ্গার পর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা বিস্ফোরণের মতো প্রকাশ পেয়েছে।

গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবাদবিরোধী বিক্ষোভ দেখা গেছে। মিনেসোটার মিনিয়েপোলিসে পুলিশ হেফাজতে এক কৃষ্ণাঙ্গের মৃত্যুর পর দেশটির প্রায় সব বড় শহরে বিক্ষোভ হয়েছে। অনেক শহরে কারফিউ জারি করা হয়। কিন্তু মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেসময় অনেকটাই নীরব ভূমিকা পালন করেছেন। বিক্ষোভ চলাকালে মার্কিন সমাজে বড় বিভক্তির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছিল। আর এখন এটা বললে ভুল হবে না যে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে যে বিভক্তির তৈরি হয়েছে তার অবসান সহজ নয়। নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন বারবার ঐক্যের কথা বললেও সেটা অর্জন তার জন্য সহজ হবে না। বরং রাজনৈতিক ও সামজিক মেরুকরণ এখন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তাতে শুধু বিদ্বেষ বাড়ছে এবং সহিংসতা ও দাঙ্গার উচ্চ ঝুঁকি তৈরি করেছে। যে কোনো মুহূর্তে সামাজিক অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে পারে।

আমেরিকান সমাজ কি এই বিভক্তির ক্ষত সারাতে পারবে, নাকি এই বিভক্তি বাড়বে? জাতীয় নিরাপত্তার প্রকৃত হুমকি যে নিজেরাই, এটা যদি যুক্তরাষ্ট্র চিহ্নিত করতে না পারে সেক্ষেত্রে দেশটির ভবিষ্যত্ অন্ধকারময় হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে কেন এই পরিস্থিতির তৈরি হলো? এর কারণ দীর্ঘ সময় ধরে যুক্তরাষ্ট্র অভ্যন্তরীণ সংকট নিরসনে আগ্রহ দেখায়নি। যুক্তরাষ্ট্র সব সময় বিদেশি হুমকিকে সামনে রাখার আগ্রহ দেখিয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পরিচালক জন র্যাটক্লিফ চীনকে জাতীয় স্বার্থের ১ নম্বর হুমকি বলে দাবি করেন। অন্যদিকে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন নির্বাচনি প্রচারণায় রাশিয়াকে বড় বৈশ্বিক হুমকি বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো—অন্য কোনো দেশ নয়, বরং অভ্যন্তরীণ সংকটই যুক্তরাষ্ট্রকে বিপর্যয়ের মুখে ফেলতে পারে। ৯/১১ হামলার পর বিদেশি জঙ্গিবাদ দমনে যুক্তরাষ্ট্র সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আসছে। কিন্তু এখন জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ও নির্বাচিত কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন, অভ্যন্তরীণ উগ্রবাদকে সমানভাবে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি হয়ে পড়েছে।