অনেক সময় ক্ষোভ প্রকাশ করিয়া বলা হয়, আমাদের গবেষণা সংস্থাগুলি তেমন কিছুই করিতে পারিতেছে না। কথাটি সর্বাংশে সত্য নহে। বিশেষ করিয়া কৃষি গবেষণার ক্ষেত্রে ইহা মানিয়া লওয়া কঠিন। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান আমলে গাজীপুরের জয়দেবপুরে যে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট গড়িয়া তোলা হয়, তাহার বিজ্ঞানীরা ধানের বিভিন্ন জাত আবিষ্কারে অভাবনীয় ও ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করিয়াছেন। পূর্বে জমিতে যেই ফসল হইত, এখন তাহার তুলনায় কয়েক গুণ বেশি ফলন হইতেছে। দেশে আবাদি জমি হ্রাসের কারণে কৃষি উত্পাদন কমিয়া যাইবার কথা ছিল। কিন্তু কমে নাই, বরং বাড়িয়াছে। আবার জনসংখ্যা বৃদ্ধিতে আমাদের সংকট থাকিবার কথা ছিল। কিন্তু আজ আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এই উন্নয়নে কৃষিবিজ্ঞানীদের অবদান ব্যাপক। ইহাতে রহিয়াছে সরকারের ইতিবাচক ভূমিকাও। সার, বীজ, কীটনাশক ও কৃষি যন্ত্রপাতিতে সরকারের প্রণোদনা বেশ কাজে লাগিয়াছে। ফলে কৃষিক্ষেত্রে একধরনের বিপ্লব সাধিত হইয়াছে বলিলেও অত্যুক্তি হয় না। শুধু ধান, গম, আলু ইত্যাদি ফসল নহে, ফল উত্পাদনেও গত এক যুগে আমরা অভূতপূর্ব উন্নতি লাভ করিয়াছি।
গত এক যুগে বাংলাদেশে ফল উত্পাদনে যে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসিয়াছে, তাহা জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক তথ্যে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। এফএওর মতে, গত ১৮ বত্সর ধরিয়া বাংলাদেশে সাড়ে ১১ শতাংশ হারে ফল উত্পাদন বাড়িতেছে। এইদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলিতেছে, ২০০৮-০৯ অর্থবত্সরের চাইতে ২০১৯-২০ অর্থবত্সরে তথা এক যুগে আমাদের ফলের উত্পাদন বাড়িয়াছে ২০ লক্ষ মেট্রিক টনেরও অধিক। ফলে ফল উত্পাদনে বিশ্বে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান ২৮তম হইলেও উত্পাদনের হার বিবেচনায় আমরা রহিয়াছি বিশ্বের শীর্ষ স্থানে। কম আয়তনের দেশ হইয়াও ফল চাষে জমি বৃদ্ধির দিক হইতে আমরা বিশ্বে শীর্ষ স্থানে উঠিয়া আসিয়াছি। প্রতি বত্সর ১০ শতাংশ হারে ফল চাষের জমি বাড়িতেছে। ইহাতে কোনো কোনো ফল উত্পাদনে আমরা বিস্ময়কর সাফল্য লাভ করিয়াছি। যেমন—বাংলাদেশ এখন কাঁঠাল উত্পাদনে বিশ্বের দ্বিতীয়, আম উত্পাদনে সপ্তম ও পেয়ারা উত্পাদনে রহিয়াছে ষষ্ঠ স্থানে। ইহার বাহিরে জাম, লিচু, কুল, কামরাঙা, পেঁপে, বেল, লেবু, আনারস, আতা, সফেদা, লটকন, তরমুজ, ফুটি ও আমলকীর উত্পাদনও সন্তোষজনক। ফল উত্পাদনে কৃষির বহুমুখীকরণ নীতিও বেশ ফলপ্রসূ হইয়াছে। ইহাতে বিদেশি ফল মাল্টা, ড্রাগন, স্ট্রবেরি, থাই পেঁপে, বড় আকারের কুল প্রভৃতি ফলের চাষ বাড়িয়াছে। এই সাফল্যের পিছনে রহিয়াছে উচ্চফলনশীল জাতের চাষ, সরকারের কৃষিবান্ধব পলিসি গ্রহণ, পুষ্টিকর খাবার হিসাবে ফলের চাহিদা বৃদ্ধি, গণসচেতনতা ইত্যাদি।
বর্তমানে বাংলাদেশে ১৩০ রকমের ফল রহিয়াছে। তাহার মধ্যে প্রচলিত ও অপ্রচলিত মিলাইয়া ৭২ রকমের ফল বাণিজ্যিকভাবে চাষ হয়। অনেক বিদেশি ফল এখন আর নাগালের বাহিরে নহে, এই দেশেই উত্পাদিত হয়। ফল চাষের এই সাফল্যে আমরা গর্বিত। এই জন্য কৃষিবিজ্ঞানী, কৃষি কর্মকর্তা, সরকার ও খোদ ফলচাষিরা ধন্যবাদার্হ। কৃষির ডাইভারসিকেশন বা বহুমুখীকরণে কৃষকের ভাগ্য আজ খুলিয়া গিয়াছে। তাহাদের হাড্ডিসার অবস্থা আর নাই, পোশাক-আশাকেও তাহাদের পরিবর্তনের ছাপ লক্ষণীয়। তাহাদের অনেকেই আজ উচ্চশিক্ষিত। অষ্টম-দশম শ্রেণি পাশের নিচে কৃষকের দেখা মিলা ভার। শিক্ষিত বেকার তরুণগোষ্ঠী যখন এই পেশায় আসিতেছে, তখন গোটা কৃষিব্যবস্থার আরো উন্নয়নে আমরা খুবই আশাবাদী। ফল উত্পাদনে সাফল্য লাভের জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জানাই শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন।
