নীলকণ্ঠ টি স্টলে একদিন

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০১৯, ১৮:১৩

n  সুমন্ত গুপ্ত

 

ঘুম থেকে উঠেছিলাম সেই সকালে ঝরা পাতার শব্দে। ঘুম থেকে উঠেই বারান্দায় বসে ঝরাপাতার কাব্যগাথা শুনছিলাম। অসাধারণ লাগছিল। আছি শ্রীমঙ্গলের দুসাই রিসোর্টে। আজ ভ্রমণের দ্বিতীয় দিন। সকালের নাশতা শেষ করে বের হয়ে গেলাম নতুন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। কর্মক্লান্ত শরীরে সতেজতা আনতে মন্ত্রের মতো কাজ করে এক কাপ গরম চা। তাছাড়া সাহিত্যিক কাজী ইমদাদুল হকের লেখা ‘অদ্ভুুত এক চাখোর’ গল্পে চাখোর লোকটি কোথাও যাওয়ার জন্য ট্রেনে উঠেছিল। কিন্তু ট্রেনে চা নেই। লোকটি ভাবলেন পরের স্টেশনে ট্রেন থামলে স্টেশনের টি স্টল থেকে চা খাবেন। কিন্তু পরপর কয়েকটি স্টেশনেও চা পেলেন না। তবে এক স্টেশনে চায়ের স্টল না পেলেও ছোট্ট একটি দোকান পেয়েছেন। লোকটি সে দোকান থেকে কিছু চা পাতা আর চিনি কিনলেন। ভাবলেন ট্রেনে চা তৈরি করে খাবেন। ট্রেনে পাশের লোকের কাছ থেকে কিছুটা পানি ও দিয়াশলাইও সংগ্রহ করেছেন। কিন্তু ট্রেনে চা তৈরির কোনো পরিবেশ পেলেন না। পরে চাখোর লোকটি চায়ের তেষ্টা মেটাতে এক গ্লাস পানি আর একমুঠো কাঁচা চা পাতা মুখে দিয়ে গিলে ফেললেন। ট্রেনের লোকজন এটা দেখে অবাকই হলো। শুধু গল্পের লোকটি নয়, চা পান করতে পছন্দ করেন না, সারা বিশ্বে এমন লোকের সংখ্যা খুবই কম। আর তাদের প্রতি ভালোবাসা জানাতেই চায়ের রাজ্য মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলে রমেশ রামগৌড় প্রতিষ্ঠা করেন ‘নীলকণ্ঠ চা কেবিন’। এ কেবিনের বৈশিষ্ট্য হলো এখানে একই কাপে ১০ লেয়ার বা ১০ রঙের চা পাওয়া যায়। তাই আজ আমাদের ভ্রমণ-গন্তব্য হলো সাতরঙা চায়ের জন্য প্রসিদ্ধ নীলকণ্ঠ টি স্টল। অনেক আগেই শুনেছিলাম নীলকণ্ঠ টি স্টলের নাম, কিন্তু সময়ের অভাবে যাওয়া হয়নি। আমরা রিসোর্ট থেকে বের হয়ে তিন চাকার বাহন নিলাম। পাইলট (সিলেটে রিকশাওয়ালাকে স্থানীয়রা পাইলট ডাকেন) মহোদয়কে বললাম, ‘নীলকণ্ঠ টি স্টলে যেতে চাই।’ বলতেই পাইলট মহোদয় হেসে বললেন, ‘ঠিক আছে স্যার চলেন।’ আমি ও সানন্দা উঠে পড়লাম রিকশায়। দুই দিকে সুশোভিত চাবাগান, সঙ্গে মিষ্টি রোদ। প্রকৃতির অসাধারণ সেই রূপ দেখতে দেখতে এগিয়ে চললাম। বাগানের রাস্তায় প্রবেশ করলাম আমরা। স্বল্প সময়ের মধ্যে পৌঁছালাম রামনগর, মনিপুরী পাড়ায় অবস্থিত আদি নীলকণ্ঠ টি স্টলে। প্রবেশ করলাম আমরা। ভিতরটা বেশ জমজমাট। একপাশে গিয়ে বসলাম। বসার সঙ্গে সঙ্গে একজন হাসি মুখে এসে উপস্থিত, ‘কী লাগবে?’ বললাম, ‘এসেছি রঙিন চা খেতে। তা-ই দিন।’ আমাদের চাহিদা জেনে ভদ্রলোক চলে গেলেন ভিতরের এক কক্ষে। সেই কক্ষ থেকেই মূলত এই সাত রঙের চা বানিয়ে দেওয়া হয়। এই কক্ষে অন্য কারও প্রবেশ নিষিদ্ধ। কথা হলো আদি নীলকণ্ঠ টি স্টলের এক কর্মচারীর সঙ্গে। তিনি জানালেন, রমেশ রামগৌড় ২০০২ সাল থেকে সাত রঙের এ চা বানিয়ে যাচ্ছেন। তার দুইটি দোকান রয়েছে, শ্রীমঙ্গলের মণিপুরী অধ্যুষিত রামনগর ও কালিঘাট রোডের ১৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের ক্যান্টিনে। তার দোকান দুটির নাম নীলকণ্ঠ টি-কেবিন। ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার আটানিবাজারে একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর অংশীদার ছিলেন রমেশ রামগৌড়। কিন্তু তার অংশীদার পুরো টাকা আত্মসাত্ করে। ফলে ভাগ্য বদলের উদ্দেশ্যে ২০০০ সালের মার্চ মাসের প্রথম সপ্তাহে স্ত্রী, তিন ছেলে, দুই মেয়েকে নিয়ে শ্রীমঙ্গলে চলে আসেন। সঙ্গে ছিল মাত্র দেড় হাজার টাকা। রামনগর মণিপুরী পাড়ায় বাসা ভাড়া নিয়ে শহরের নতুন বাজারে একটি দোকানে চাকরি নেন। ওই বছরের আগস্ট মাসে চাকরি ছেড়ে দিয়ে বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) সংলগ্ন কাকিয়াছড়া চা বাগানে একটি চায়ের দোকান দেন। এরপর নিবিড়ভাবে চিন্তা ও পরিশ্রম করে ২০০২ সালে একই গ্লাসে দুইরঙা চা আবিষ্কার করে শ্রীমঙ্গলে তোলপাড় সৃষ্টি করেন। ধীরে ধীরে চায়ের স্তর বাড়াতে শুরু করেন। বর্তমানে এটি আট স্তরে আট রঙে এসে দাঁড়িয়েছে। কথার মাঝেই টেবিলে হাজির হলো আট রঙের চা। চা পেয়েই সানন্দা খুব খুশি। বলল, ‘অনেক দিনের শখ ছিল এই চায়ের স্বাদ নেওয়ার। আজ তোমার কল্যাণে সম্ভব হচ্ছে।’ বললাম, ‘আগে ছবি তুলে নিই পরে চায়ের কাপে চুমুক দিয়ো।’ ছবি তোলা শেষ এবার চুমুক দেওয়ার পালা—অসাধারণ স্বাদ! পাশের টেবিলে বসা পর্যটক বলছিলেন, তাদের সঙ্গে আসা ভ্রমণ সঙ্গীদের শ্রীমঙ্গল বেড়াতে এসে কেউ নীলকণ্ঠের চা পান না করে যান না। এমনকি সেই নীলকণ্ঠের কালার চায়ের স্বাদ নিতে ভুলেননি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। শ্রীমঙ্গলে কয়েকটি উন্নয়ন কাজের উদ্বোধন করতে এসে প্রধানমন্ত্রী ঘুরে গেছেন রমেশের চা স্টলে। আর প্রধানমন্ত্রীকে সম্মান জানাতে রমেশ রামগৌড় প্রধানমন্ত্রীর চা পানের ছবি ও সেই পাত্রটি গ্লাসের ভিতর সাজিয়ে রেখেছেন দোকানে। আমিও দেখলাম দেয়ালে শুধু প্রধানমন্ত্রীর ছবি নয়, রমেশের চায়ের দোকান ঘুরে যাওয়া দেশি-বিদেশি নামকরা ব্যক্তিদের ছবি টাঙিয়ে রাখা হয়েছে। মনোযোগ দিয়ে দেওয়ালে টাঙানো ছবিগুলো দেখলাম। নীলকণ্ঠে যে শুধু রঙিন চা পাওয়া যায় তা নয়, এখানে রঙিন চায়ের পাশাপাশি রয়েছে ৮-১০ রকমের চা। আর রমেশের ১০ রঙের চা পান করলে দেখবেন একেক রঙে একেক রকম স্বাদ। এদিকে সানন্দা বায়না ধরল লেবু চা খাবে, ভাবলাম আমি আর কেন বাদ থাকব। দুজনের জন্য লেবু চায়ের অর্ডার দিলাম। স্বল্প সময়ের মধ্যে দেওয়া হলো লেবু চা। বাসায় আমরা চা খাই, কিন্তু এখানকার চায়ের স্বাদ অন্যরকম। বর্তমানে আট স্তরের চা ৮৫ টাকা, সাত স্তরের চা ৭৫ টাকা, ছয় স্তরের ৬০ টাকা, পাঁচ স্তরের ৫০ টাকা, চার স্তরের ৪০ টাকা, তিন স্তরের ৩০ টাকা, দুই স্তরের চা ২০ টাকা, হাই স্পেশাল চা ২০ টাকা, স্পেশাল দুধ চা ১০ টাকা, গ্রিন চা ১০ টাকা, আদা চা ১০ টাকা, লাল চা ১০ টাকা এবং লেবু চা ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

যা বে ন  কী ভা বে

ঢাকা থেকে রেল ও সড়ক পথে শ্রীমঙ্গল যাওয়া যায়। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে রিকশা নিয়ে কালিঘাট রোড ধরে কিছুদূর গেলেই দেখতে পাবেন বড় সাইনবোর্ডে লেখা ‘নীলকণ্ঠ’। ভাড়া নেবে ১০ টাকা। কেবিনটি ১৪ রাইফেল ব্যাটালিয়নের ক্যান্টিনে থাকায় সব ধরনের নিরাপত্তা পাবেন। নিরিবিলি ও খোলামেলা জায়গায় ভিতরে বা বাইরে বসে চা পান করতে পারবেন। দ্বিতীয়টি একই সড়ক ধরে গেলে রামনগরে অবস্থিত। ২০-২৫ টাকা রিকশা ভাড়া দিয়ে যেতে পারেন। এখানে চা বাগানের চমত্কার পরিবেশে বসে চা পান করতে পারবেন।