>> জিদনী আন নাহিয়ান জিদান
বিশ্ব মহামারি করোনা ভাইরাসের কবলে গোটা বিশ্ব যখন থমকে আছে ঠিক তখনই বাংলাদেশে এক তরুণ জলবায়ুযোদ্ধার দেখা মিললো। আজ এমনই এক সম্ভাবনাময় তরুণকে নিয়ে সকলের সামনে আসছি যিনি কি না ‘ইয়ুথ পাওয়ার’ নিয়ে তার জীবনের তোয়াক্কা না করে জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় ঘরের বাইরে বেরিয়ে পড়েছিলেন উপকূলবাসীর জন্য জলবায়ু ন্যায্যতার দাবিতে। আর সেই সময়ে ছিল করোনার চরম পর্যায় এবং লকডাউনে সবাই ঘরবন্দী। বলছি পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সন্তান শান্ত নূরের কথা। পুরো নাম তার মো. জাবেদ নূর শান্ত হলেও সবাই তাকে শান্ত নূর কিংবা ফটোগ্রাফার শান্ত নামেই চিনে।
শান্ত শিক্ষার্থী হলেও মাধ্যমিক শিক্ষা জীবন থেকেই লেখাপড়ার পাশাপাশি ক্রীড়াসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত। মাশরাফি, সাকিব, মুমিনুলদের দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে স্কুলজীবনে ক্রিকেট নিয়ে ক্যারিয়ার গড়তে চাইলেও পরিবারের চাপে তাকে ক্রিকেট ছাড়তে হয়। এরপর তিনি ছবি ভালোবেসে অবসর সময়ে শখের বসে শুরু করেন ফটোগ্রাফি নামের এক নতুন অধ্যায়। শান্ত নূর ২০১৬ সালে কক্সবাজার সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সফলতার সঙ্গেই মাধ্যমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে উত্তীর্ণ হন। লেখাপড়ার পাশাপাশি তিনি ওয়েডিং ফটোগ্রাফিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের হয়ে ফটো-সাংবাদিকতার পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকান্ডের মাধ্যমে কক্সবাজারে বেশ সুনাম অর্জন করেন। সেই ধারাবাহিকতায় শান্ত নূর ২০১৭ সালের নভেম্বরে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে ফটোগ্রাফার হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। সেখানে তিনি রোহিঙ্গা শরণার্থী শিশুদের দৈনন্দিন জীবনের বিভিন্ন চিত্র ফ্রেমবন্দী করেন। ইউরোপ-রাশিয়ার বিভিন্ন ছোট-বড় গণমাধ্যমে রোহিঙ্গা শিশুদের তোলা সেই ছবিগুলো ধীরে ধীরে গল্পসহকারে প্রকাশ পেতে থাকলে ওয়াশিংটন ডিসি হতে আন্তর্জাতিক মানের একজন ফটোগ্রাফার হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন শান্ত নূর।
কক্সবাজার শহরের টেকপাড়া এলাকার বাসিন্দা মরহুম জাফর আলম এবং মমতাজ শফিনা আজিম দম্পতির সন্তানদের মধ্যে শান্ত নূর ছোট। তার বড় ভাই জাহেদ নূর জিতু আইন বিভাগের ছাত্র। জিতু-শান্তর বাবা ২০০১ সালে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেও থেমে যায়নি তাদের জীবনের গতি। বরং, বাবার অবর্তমানে মা তাদের দুই ভাইকে মানুষ করার জন্যে আজ পর্যন্ত মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এমনই এক মায়ের সন্তান শান্ত নূর; আর তিনি কি না স্বপ্ন দেখছেন জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় টেকসই সমাধান এবং বসবাসযোগ্য পৃথিবী।
শান্ত নূর বলেন, ‘আমি একাই জলবায়ু সংকট মোকাবেলা করছি—তা নয়। তরুণরা বর্তমানে অনেকটা সচেতন হয়েছে। আমার মতো অনেকেই এ সংকট মোকাবেলা করতে এখন মাঠে নেমেছে। সামনে থেকে হোক কিংবা পেছনে, পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে পৃথিবীকে বাঁচাতে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ মিশনে নেতৃত্ব দেওয়ার সুযোগ আমি একা পেলেও পরিশ্রম করছি আমরা সবাই। আমরা নিশ্চিত করতে চাই একটি শীতল-সবুজ, নিরাপদ বাসযোগ্য পৃথিবী। জলবায়ু সংকট এখন চরম পর্যায়ে, তাই সকলকে বইয়ের জগত্ হতে বের হয়ে যত দ্রুত সম্ভব মাঠ পর্যায়ে এ সংকট মোকাবেলায় কাজ করতে হবে। বাংলাদেশের পরিবেশ এবং জীব-বৈচিত্র্য রক্ষা এবং টেকসই সমাধান নিশ্চিতকরণে আমি একটি উদ্যোগ গ্রহণ করতে যাচ্ছি। তাই পলিসি ও কর্মকান্ডে আমার অংশগ্রহণের সুযোগ বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশী জরুরি বলে মনে করছি। কারণ, আমার এই উদ্যোগ জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আমার বিশ্বাস।’
শান্ত নূর বর্তমানে ‘ইয়ুথনেট ফর ক্লাইমেট জাস্টিস’ নামে একটি সংস্থার কক্সবাজার জেলায় সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। জানা যায়, ২০২০ সালে উপকূলীয় অঞ্চলসহ সারা দেশে জলবায়ু ন্যায্যতার দাবিতে শান্তর নেতৃত্বে কক্সবাজার জেলায় দেশের সর্বপ্রথম ‘জলবায়ু অবরোধ’ কর্মসূচি পালন করা হয়। যা ছিল করোনা পূর্ববর্তী সময়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় কক্সবাজারের তরুণদের প্রথম চ্যালেঞ্জ। গত বছর এশিয়া ক্লাইমেট লিডারশিপ ক্যাম্পে বাংলাদেশের হয়ে প্রতিনিধিত্ব করেন শান্ত নূর।
