তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণে

ওপেকের ভূমিকা কতটা

আপডেট : ২২ জানুয়ারি ২০২১, ২১:০৪

শফিকুর রহমান রয়েল

 

গেল সেপ্টেম্বরে তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেক তাদের ৬০ বছর পূর্তি পালন করে, এমন একটা সময়ে, যখন চলছে সংগঠনটির ইতিহাসের সবচেয়ে সংকটময় মুহূর্ত। অতীত ঘাঁটলে দেখা যায়, তেলের মূল্য নিয়ন্ত্রণের ওপর তাদের ক্ষমতার হ্রাসবৃদ্ধি ঘটেছে। কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কেভিড-১৯ প্রাদুর্ভাব শুরুর আগেই ওপেকের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাটাই পড়ে যায় প্রশ্নের মুখে। ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে চলে যাওয়া শিল্পকে উদ্ধারের জন্য গত এপ্রিল থেকে তারা ভূমিকা রাখতে শুরু করেছে এক প্রকার অনিচ্ছা সত্ত্বেও। গত ছয় দশক জুড়ে তেলের বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের দিক উভয়ে অনেকটাই বিবর্তিত হয়েছে ক্রমাগতই ওপেককে খাপ খাওয়াতে বাধ্য করে, এমনকি সংগঠনটিকে যখন অচল মনে হয়েছে তখনও। এটির বিলুপ্তি ঘটবে, এমর আশঙ্কা অনেকেই করছেন। কিন্তু প্রিন্সটন অধ্যাপক রবার্ট কিওহান এর অভিমত ভিন্ন, আন্তর্জাতিক কোনো প্রতিষ্ঠানের মৃত্যু কদাচিত্ই ঘটে। এগুলো সৃষ্টির চেয়ে চালিয়ে নেওয়াটা অনেক ভালো। আর এভাবেই তিনটি স্তরের মারফত শেষ পর্যন্ত ওপেক কোনোমতে টিকিয়ে রাখে তার অস্তিত্ব।

কিন্তু ইদানীং এ প্রশ্নটি বেশ জোরালোভাবেই উঠছে যে, এভাবে আর কতদিন চলতে পারবে সংগঠনটি? ১৯৬০ থেকে ১৯৮০ এ সময়ে ওপেক ছিল ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগীর ভূমিকায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অনৌপনিবেশিকীকরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এর প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ইরান, ইরাক, কুয়েত, সৌদি আরব ও ভেনিজুয়েলা তেল সংরক্ষণের ওপর নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছিল, তখন যা ছিল বেশ কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানির হাতে। ১৯৭৩ সালে তেল উত্পাদনকারীরা টেক্সাসে সভা করে যুক্তরাষ্ট্রের বর্ধিষ্ণু অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে যাওয়া থেকে নিবৃত্ত হলে তাদের চুক্তিপত্রটিই পাশ্চাত্যের অর্থনীতিকে নতজানু করে তুলল ওপেকের কাছে, যা ছিল ইয়ম কপ্পুর যুদ্ধে ইসরাইলকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন করার বদলাস্বরূপ। তেলের বাজারে এটিই প্রথম ধাক্কা।

দ্বিতীয়টি আসল ১৯৭৯ সালে ইরানের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে। এর ফলে পশ্চিমা ভোক্তারা নামল বিকল্প জ্বালানি উেসর সন্ধানে। জ্বালানি দক্ষতা উন্নতির পাশাপাশি তারা চেষ্টা করল তেলের ওপর নির্ভরতা কমাতে। একজন বিশ্লেষকের মতে, তেলের মতো অতিপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম যখন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়, মানবপ্রজাতি তখন কেবল দুটি জিনিসই করতে পারে। এটি অধিক পরিমাণে খুঁজে বের করে অথবা যথাসম্ভব এর ব্যবহার কমিয়ে দেওয়ার উপায় অনুসন্ধান করে। পরিণামস্বরূপ দেখা গেল, তেলেন চাহিদায় শুধু ভাটাই পড়েনি, ওপেকবহির্ভূত দেশগুলো থেকে অপরিশোধিত অধিকসংখ্যক ব্যারেল তেল আসা শুরু করল, যেমন—আলাস্কা, সোভিয়েত ইউনিয়ন, মেক্সিকো ও নরওয়ে। ১৯৮০ থেকে ২০০০, এই দ্বিতীয় স্তরে ওপেক চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে নিজেকে সত্যিকারের জোট প্রমাণ করার চেষ্টায় নামল। কিন্তু উত্পাদনের সর্বোচ্চ সীমা ও মূল্য নির্ধারণ এবং উত্পাদন সমন্বয়ের প্রচেষ্টায় খুব বেশি সফল হতে পারল না। ওপেকের অবিসংবাদিত নেতা সৌদি আরব অধিকাংশ সমন্বয় সাধন করলেও দ্রুতগতিতে মূল্য না বাড়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক চাহিদার রাতারাতি কোনো উন্নতি ঘটল না। বরং দেখা গেল নিজেরাই রাজস্ব ভোগান্তির শঙ্কায় নাটকীয়ভাবে উত্পাদন কমিয়ে আনতে পারল না। ১৯৮২ সালে প্রথমবারের মতো অকার্যকর হয় ওপেকের চুক্তি। বস্তুত, প্রতারণা, নিজেদের ভেতরকার দ্বন্দ্ব ও বহিঃস্থ প্রতিযোগিতা ওপেকের কৌশলের কার্যকারিতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল।

কেবল ২০০০-র দশকে তেলপিপাসু চীন জোটকে স্বস্তি এনে দিয়েছিল। সে সুবাদে এই তরল পদার্থের মূল্য পৌঁছে গিয়েছিল ইতিহাসের সর্বোচ্চ সীমায়। ২০০৮ সালে ব্যারেলপ্রতি মূল্য ছিল প্রায় ১৫০ মার্কিন ডলার। এই তৃতীয় স্তরের ২০১৪ সাল পর্যন্ত ওপেক ছিল নিষ্ক্রিয় পর্যবেক্ষকের ভূমিকায়। বিশ্ববাজারে তেলের চাহিদা তরতর করে বাড়তে থাকায় সংগত কারণেই মূল্য বাড়ছিল লাফিয়ে লাফিয়ে। এ সময় বাজারে হস্তক্ষেপ প্রসঙ্গে ওপেক উদাসীন। ২০১৪ সালেই যুক্তরাষ্ট্রে শেল বিপ্লব শুরু হয়ে যাওয়াতে তাদের অভিজাত ক্ষমতা আবার পড়ে যায় ক্ষয়ের মুখে। তখন থেকে আজ পর্যন্ত ওপেকের বাকি গল্পটা তো আর অজানা নয়।

—ফরেন পলিসি ম্যাগাজিন অনুসরণে