গল্প-কথায় পদার্থবিজ্ঞান:আলবার্ট আইনস্টাইন

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২১, ১৯:১৭

মাধব রায়

সহকারী অধ্যাপক, পদার্থবিজ্ঞান

ব্লু বার্ড হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, সিলেট

 

 

 

 

 

অণু বলল-বাবা এবার আইনস্টাইন সম্পর্কে বলো।

নীলকান্তবাবু বললেন-আলবার্ট আইনস্টাইন ১৪ মার্চ ১৮৭৯খ্রিস্টাব্দে জার্মানির উলম শহরে জন্মে ছিলেন এবং ১৯৫৫ সালের ১৮ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন।  তাঁর ইচ্ছানুযায়ী মরদেহ পুড়িয়ে ফেলা হয়।

বিন্দু বলল-কিন্তু তাঁর ছেলেবেলার কথা তো আমরা জানি না।

হ্যাঁ বলছি, বললেন নীলকান্তবাবু। ১৮৮০ খ্রিস্টাব্দে পিতা হেরম্যান আইনস্টাইন মা পলিনসহ মিউনিখ শহরে চলে আসেন। সেখানে একটি বিদ্যুত্ সরঞ্জাম ও ইঞ্জিনিয়ারিং কারখানা স্থাপন করেন। আলবার্ট আইনস্টাইন মিউনিখ শহরে কয়েকটি বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করেন। সঙ্গীতেও তালিম নিয়েছিলেন তিনি। একটা বেহালা তার সাথে থাকত বড় হবার পরেও।

সঙ্গীতের কথা শুনে রেখা খুশি হলো। বলল-আইনস্টাইন কি ছোটবেলা থেকেই ভালো ছাত্র ছিলেন?

মোটেই না, বললেন নীলকান্তবাবু। স্কুলের শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রায়ই অভিযোগ আসত এই অমনোযোগি ছাত্র সম্পর্কে। ক্লাসে কেউ তার সঙ্গী ছিল না। সবসময় পিছনের বেঞ্চে গিয়ে বসে থাকতেন। শুধু তাই নয়, তার জন্য অন্যরাও মনোযোগি হতে পারত না। তাই স্কুল শেষে তাঁর সাজা হতো। পনের বছর বয়সে ইতিহাস, ভূগোল এবং ভাষাতত্ত্বে যথেষ্ট খারাপ গ্রেড নিয়ে এবং কোনও ডিগ্রি না নিয়েই স্কুল ত্যাগ করতে হয় তাঁকে। পিতার ব্যবসায় মন্দা দেখা দিলে মিউনিখ ছেড়ে মিলানে চলে যান১৮৯৪ সালে।

আইনস্টাইন একা একা থেকে গেলেন? বলল সীমা।

হ্যাঁ, তিনি পরে সুইজারল্যান্ডের একটি পলিটেকনিক স্কুলে ভর্তি হলেন। কিন্তু সেখানেও প্রথমবার ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারলেন না।

বিন্দু, সীমা, অণু সবাই মুখ টিপে হাসছে আইনস্টাইনের এই খবর শুনে।

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিকুল মনোভাব দেখে আলবার্ট ১৮৯৬ সালের ২৮ জানুয়ারি সরকারিভাবে জার্মান নাগরিকত্ব বর্জন করেন। অবশ্য ১৯১৪ সালে জার্মানরা তাঁকে আবার নাগরিকত্ব সনদ প্রদান করে।

ভর্তি পরীক্ষায় ফেল করার পর অনন্যোপায় হয়ে আরাউ ক্যান্টন স্কুলে ভর্তি হতে হয় তাঁকে। সেই শহরটি জুরিখ থেকে বেশি দূরে নয় এবং সেখান থেকে পাশ করলে সরাসরি পলিটেকনিক স্কুলে ভর্তি করা হয়। সেই পলিটেকনিক স্কুলেই তিনি চার বছর পদার্থবিদ্যা অধ্যয়ন করেন। এই স্কুলটি তখন সারা পৃথিবীর সকলের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু। পলিটেকনিক শিক্ষা শেষ করে ১৯০২ সালে সুইজারল্যান্ডের প্যাটেন্ট অফিসে তিনি প্রযুক্তি কর্মকর্তার চাকরি নিলেন। সেখানে কাজের চাপ তেমন ছিল না। ফলে অফিসে বসেই বিভিন্ন গবেষণার কাজ করতে পারতেন।

চন্দ্রা বলল-আর পড়াশুনা করেননি?

হ্যাঁ, সেখানে চাকরিরত অবস্থায়ই ১৯০৫ সালে তিনি জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে এর আগেই ১৯০৩ সালে তিনি মিলেভা মারিচ নামের সহপাঠিনীকে বিয়ে করেন। আকাশ বলল-কিন্তু তাঁর গবেষণাকর্ম কখন প্রকাশ হতে থাকে?

নীলকান্তবাবু বললেন- ১৯০৫ সালে জার্মানির পদার্থবিদ্যা বিষয়ক মাসিক পত্রিকা এনালিন (Annalen) এ তিনি তার গবেষণা A new Determination in Molecular Dimension প্রকাশ করেন এবং এর মাধ্যমেই পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। এই বছরই এই পত্রিকায় তাঁর আরও চারটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। একটি প্রবন্ধে আইনস্টাইন বলেন-আলো স্বতন্ত্র কণা দ্বারা গঠিত, যা তরঙ্গধর্ম ছাড়াও কণার ক্ষেত্রে অন্যান্য ধর্ম প্রদর্শন করে। আলোর আঘাতে কঠিন পদার্থের ইলেকট্রন বের হয়, যার নাম আলোক তড়িত্ ক্রিয়া। আইনস্টাইন এই তত্ত্বেরও ব্যাখ্যা দেন।

আকাশ অবাক হয়ে বলল-আলো থেকে বিদ্যুত্?

সীমা বলল-কিন্তু আমরা তো দেখি বিদ্যুত্ থেকে আলো আসছে, তাপ আসছে।

নীলকান্তবাবু বললেন-আলো থেকেও বিদ্যুত্ আসে, এ নিয়ে আইনস্টাইনের একটি সমীকরণ রয়েছে। কমলা বললেন-তাহলে আপেক্ষিক তত্ত্ব কখন প্রকাশ করলেন?

ষোল বছর বয়সে একটি প্রবন্ধ On the Electrodynamics of Moving Bodies দিয়ে তাঁর আপেক্ষিকতার বিশেষ তত্ত্বের কাজ শুরু হয়। সেখানে তিনি বলেন-যদি সকল প্রাসঙ্গিকতায় আলোর বেগ ধ্রুব হয়, তবে সময় এবং বেগ দর্শকের কাছে আপেক্ষিক মনে হবে। পরবর্তীতে এই তত্ত্ব দিয়েই তাঁর বিখ্যাত সমীকরণ E = mc2 প্রকাশ করেন।

নীলকান্তবাবু বললেন-আইনস্টাইন তখন প্যাটেন্ট অফিসের চাকরি ছেড়ে দিয়ে প্রাগ এর জার্মান ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা শুরু করেন। আইনস্টাইনের ছেলেমেয়ে কয়জন ছিল? বললেন কমলা।

প্রথম স্ত্রী মিলেভা মারিচ এর এক কন্যা সন্তান জন্ম নেয় ১৯০২ সালে। এর নাম রাখা হয় লির্সাল। লির্সালকে আইনস্টাইন কখনোই দেখেননি। কারণ মেয়েটিকে দত্তক দেয়া হয়েছিল এবং মিলেভা মারিচ এর সাথে আইনস্টাইনের সম্পর্ক বেশিদিন টেকেনি। ১৯০২ সালে আইনস্টাইনের বাবা হেরম্যানও অসুস্থতাজনিত কারণে মৃত্যুবরণ করেন। ১৯০৪ সালে আইনস্টাইন-মিলেভা দম্পতির প্রথম পুত্র হান্স অ্যালবার্ট এবং ১৯১০ সালে দ্বিতীয় পুত্র এডওয়ার্ড এর জন্ম হয়। ১৯১৯ সালে আইনস্টাইন এবং মিলেভার মধ্যে চিরদিনের জন্য ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। পরবর্তীতে আবার এলসাকে বিয়ে করেন এবং এই দম্পতির দুটি কন্যা সন্তান জন্ম নেয়।

আকাশ বলল-আইনস্টাইন যে বললেন, আলো বেঁকে যায়, এ নিয়ে কোনও পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়নি?

হয়েছে, বললেন নীলকান্তবাবু। ব্রাজিলের সোব্রালে ও আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল প্রিন্সিস দ্বীপ থেকে ১৯১৯ সালের ২৯মে একটি পূর্ণগ্রাস সূর্যগ্রহণ দেখতে পারার কথা। লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটি সূর্যগ্রহণের মুহূর্তে আলোকরশ্মির বেঁকে যাওয়ার ঘটনা পরখ করার সিদ্ধান্ত নিলো। এ উদ্দেশে বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী আর্থার এডিংটন এর নেতৃত্বে একটি দল চলে গেল আফ্রিকার পশ্চিম উপকূলে, অন্য একটি দল গেল ব্রাজিলে। উদ্দেশ্য-সূর্যের কিনার ঘেঁষে দূরের যে নক্ষত্রটি দিনের বেলা দেখতে পারা যায় না, গ্রহণের সময় কালো আকাশে ঢাকা পড়া সূর্যের কাছ ঘেঁষে এটি দেখা যায় কি-না। এর আগেই হিসাব নিকাশ করে নক্ষত্রটি কোথায় থাকবে, তার নকশা করা হয়েছে।

পূর্বের তোলা ছবির সাথে মিলিয়ে দেখা গেল নক্ষত্রটি যে বিন্দুতে থাকার কথা, সেখান থেকে সরে গেছে। বিজ্ঞানী এডিংটন অত্যন্ত খুশি হলেন এটি দেখে এবং গণিতবিদ লিটলউড এর মাধ্যমে বার্টান্ড রাসেলকে টেলিগ্রাম করে জানালেন-আইনস্টাইনের তত্ত্ব সম্পূর্ণরূপে সমর্থিত। এরপর ৬ নভেম্বর রয়্যাল সোসাইটি ঘোষণা করল, আলো বেঁকে যায়, যা নিউটনের তত্ত্বে নেই, আছে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্বে।

 

পরের অংশ আগামীকাল