পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনছেন না বাইডেন!

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২১, ২১:৩৯

 

সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চার বছরে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে আমূল পরিবর্তন ঘটে গেছে। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ধারা বদলে দিয়েছেন। তিনি মার্কিন মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি করেছেন। চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছেন। ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি বাতিল করে নতুন নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছেন। উত্তর কোরিয়ার পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ করতে দেশটির নেতা কিম জং উনের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের নীতি বাতিল করে জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন। সব মিলিয়ে পররাষ্ট্র নীতিতে এক বিশৃঙ্খল অবস্থা তৈরি করে রেখে গেছেন তিনি। যেটা উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছেন নতুন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন।

বিভক্ত আমেরিকায় ঐক্যের ডাক দিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন বাইডেন। তিনি পররাষ্ট্র নীতিতে পরিবর্তন এনে যুক্তরাষ্ট্রকে আবারও নেতৃত্বের আসনে বসানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, মার্কিন মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করবেন, বিশেষ করে যাদের সঙ্গে গত কয়েক বছরে সম্পর্ক নষ্ট হয়েছে।  ট্রাম্পই প্রথম প্রেসিডেন্ট নন, যিনি ন্যাটোর অন্যান্য সদস্য দেশকে প্রতিরক্ষা খাতে আরো অর্থ ব্যয়ের জন্য চাপ দিয়েছেন। কিন্তু ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে ন্যাটোকে হুমকি দিয়েছেন অন্য সদস্যরা যথেষ্ট অর্থ না দিলে যুক্তরাষ্ট্র এই জোট থেকে বেরিয়ে যাবে। বাইডেন জানিয়েছেন, এখন সেই ক্ষত সারিয়ে তোলার চেষ্টা করবেন।

দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সঙ্গে টেলিফোনে আলাপ করেছেন। দুই দেশের বিভিন্ন ইস্যুতে আলোচনার জন্য শিগগিরই তারা সাক্ষাত্ করবেন বলে জানিয়েছেন। রাশিয়ার সঙ্গে পরমাণু চুক্তির মেয়াদ আরো পাঁচ বছর বাড়াতে চান তিনি। নিউ স্টার্ট (স্ট্র্যাটেজিক আর্মস রিডাকশন ট্রিটি) নামে এ চুক্তিটির মেয়াদ ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী দুই দেশ ১ হাজার ৫৫০টির বেশি পরমাণু অস্ত্র রাখতে পারে না। হোয়াইট হাউজ জানিয়েছে, আফগান সশস্ত্র গোষ্ঠী তালেবানের সঙ্গে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের করা শান্তি চুক্তি পুনর্বিবেচনা করবে নতুন প্রশাসন। বাইডেনের নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেইক সুলিভান এরই মধ্যে আফগান কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন।

নতুন প্রশাসন এসব উদ্যোগ নিলেও মার্কিন ওয়েব পোর্টাল ভক্সডটকমের এক নিবন্ধে বলা হয়েছে, অনেক বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির সঙ্গে বাইডেনের পরিকল্পনার মিল নেই। তারপরও কিছু সময়ের জন্য হলেও ট্রাম্প প্রশাসনের অনেক নীতির ধারাবাহিকতা রাখার পরিকল্পনা করছেন বাইডেন। তার সম্ভাব্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের সাম্প্রতিক বিবৃতিতে বোঝা যাচ্ছে, ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতির অনেক বিষয় বদলে দেওয়ার চেয়ে তার ধারাবাহিকতা রক্ষার সম্ভাবনা বেশি। ভেনিজুয়েলা থেকে ইউক্রেন, ইসরাইল থেকে চীন, অনেক ক্ষেত্রে পররাষ্ট্রনীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চান তারা।

বাইডেনের মনোনীত পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন গত মঙ্গলবার সিনেটের শুনানিতে নতুন প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতির বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, ভেনিজুয়েলার বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদোকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে বাইডেন প্রশাসন স্বীকৃতি দিয়ে যাবে। নিকোলাস মাদুরো সরকারের ওপর অবরোধ অব্যাহত রাখা হবে। রাশিয়ার আগ্রাসনকে বিবেচনায় রেখে ইউক্রেনে সামরিক সহায়তা অব্যাহত থাকবে।

তিনি জানান, জার্মানি ও রাশিয়ার মধ্যে নর্ড স্ট্রিম-২ পাইপলাইনের নির্মাণকাজ নিয়ে বাইডেন প্রশাসন আপত্তি জানাবে। ২০১৯ সালে এই পরিকল্পনার জন্য রাশিয়ার ওপর অবরোধ আরোপ করে ট্রাম্প প্রশাসন। তাদের দাবি ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের তেল সরবরাহ ব্যবস্থা ইউরোপকে মস্কোর ওপর আরো নির্ভরশীল করবে। রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে অচিরেই কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনাও নেই বাইডেন প্রশাসনের। এই পাইপলাইন নিয়ে জার্মানির সঙ্গে বিরোধ সৃষ্টি হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের। যদিও চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল জানিয়েছেন, তিনি এই ইস্যুতে নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা করবেন।

নতুন প্রশাসন জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে বিবেচনা করবে এবং সেখানে মার্কিন দূতাবাস রাখবে। ট্রাম্প ২০১৮ সালে জেরুজালেমকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেন এবং দূতাবাস সরাতে অনুমোদন দেন। চীনের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের কঠোর মনোভাব সঠিক বলে মনে করেন ব্লিনকেন। তার মতে, চীন ইস্যুতে বাইডেন প্রশাসনের কৌশল ভিন্ন হবে, তবে চীন বিরোধিতায় তাদের অবস্থান একই থাকবে। ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তিতে ফেরার কথা বাইডেন জানালেও তার প্রশাসন শিগগিরই এ ধরনের উদ্যোগ নিতে পারছে না। এজন্য সময় দরকার বলে মনে করেন বাইডেনের সহযোগীরা।

নির্বাচনি প্রচারণার সময় পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে ট্রাম্পের ব্যাপক সমালোচনা করেছিলেন বাইডেন। ধারণা করা হচ্ছিল, তার প্রশাসন সব কিছু বদলে দেবে। কিন্তু তা এখনই হচ্ছে না। আর তাতে অনেক বিশ্লেষকও বিস্মিত নন।