করোনাকাল নতুন উদ্যমে জেগে ওঠা তারা

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০২১, ২২:০৬

  অমিতা সিনহা

 

সারা বিশ্বে করোনার দুর্যোগ মুহূর্তেও নারী অদম্য শক্তি কাজে লাগিয়ে আধুুনিকতার ছোঁয়ায় নবরূপে অর্থনীতির ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছে নতুন এক উদ্যমে। করোনায় ঘুমন্ত নিস্তেজ শক্তিকে পুরোদমে সজীব-সতেজময় ফিরে পেতে কর্মযজ্ঞে নিমগ্ন হয়েছে সিলেটের চার জন দুঃসাহসী নারী। প্রযুক্তিবান্ধব মাধ্যমকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে আঁকড়ে ধরে দৃষ্টান্ত রেখেছেন সিলেটের এই উদীয়মান নারীরা।

মহামারি করোনাকালে সিলেটের প্রতিভাবান চার জন নারী অল্প সঞ্চিত পুঁজি দিয়ে প্রকার ভেদে ব্যবসা ধরে স্বচ্ছলতা ফিরে পেয়েছেন। তার মধ্যে কেউ ঘরে বসে আর কেউবা দোকান ঘর খুলে কম সময়ের মধ্যে নিজ পায়ে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছেন। যার প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে বেছে নিয়েছিল আধুনিক যুগের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও মুঠোফোনকে। এর ফলে ভয়ংকর মহামারিকালে নিজেদের সব বাধাকে উপেক্ষা করে আত্মনির্ভরশীল হতে মেধা ও মননশীলতাকে জোগান দিয়েছিলেন তারা। পরিণতিতে কেউ ব্যবসা শুরু করেছেন প্রসাধনী সামগ্রীর, কেউ করছেন ইমিটেশন গহনার, কেউ করছেন মণিপুরী হস্তশিল্পের আর কেউবা করছেন দেশীয় পোশাকের।

আখালিয়ার নেহারীপাড়ার বাসিন্দা গৃহিনী সামসুর নাহার মহিলা অঙ্গনকে বলেন, ১৯৯৮ সাল থেকে নারীদের স্বাবলম্বী করার জন্য নিজ উদ্যোগে বাঁশ-বেতের সৃষ্ট তৈজসপত্রের কারখানা ও নারীদের টেইলারিং প্রশিক্ষণ দিয়ে সফলতার সহিত দীর্ঘ দিন ধরে ব্যবসা করে যাচ্ছি। কিন্তু হঠাত্ করে প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাস আসার পর থেকে সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে আছে। যে ৩০ জন নারীদেরকে নিয়ে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেছিলাম, আজ সেই ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আর্থিক সংকটে ধসে পড়েছে। দেশে করোনার চলমান পরিস্থিতির জন্য ছয় মাস বন্ধ থাকার পর ফের নতুন উদ্যমে মাত্র চার জন নারী কর্মীকে নিয়ে নিজ উদ্যোগে দর্জির দোকান দিয়েছি। আধুনিক যুগের মুঠোফোনের দ্বারা নানা বয়সের মানুষ ঘরে বসেই অর্ডার দিচ্ছে। তাই নারী কর্মীদের পরিচালনা করতে এখন আর চিন্তায় পড়তে হয় না। তিনি আরো বলেন, যে বাঁশ-বেতের কারখানাটি বন্ধ আছে, খুব শিগিগরই একটু আর্থিক সচ্ছলতা ফিরে পেলেই বৃহত্তর পরিসরে যে কোনো সময় পুনরায় খুলে দেওয়ার ইচ্ছে আছে।

করোনা ভাইরাস আসার পথ থেকেই স্বামীর সংসারে সন্তানদের নিয়ে নিত্য দিন হিমশিম খেতে হয় কুমারপাড়ার বাসিন্দা শামিমা আক্তারকে। উপায়ন্ত না দেখে নিজের ব্যবহূত স্বর্ণালঙ্কার বিক্রি করে প্রসাধনী সামগ্রীর ব্যবসা শুরু করেন ঘরে বসেই। বর্তমানে তার প্রসাধনী সামগ্রীর ফেসবুকে ফলোওয়ার ছাড়িয়েছে ৫০ হাজারের  ঊর্ধ্বে। তিনি মহিলা অঙ্গনকে বলেন, দেশে করোনা মহামারি আসার আগ থেকেই খুব কষ্টে দিন চলছিল। স্বামীরও ব্যবসাপাতি শূন্য। একপর্যায়ে স্বামী-সন্তানদের সহযোগিতায় নিজের ফেসবুকে পেইজ খুলি। আর সেখানে খুব ভয়ে ভয়ে মেয়েদের প্রিয় প্রসাধনী সামগ্রীর ‘আদনান কালেকশন’ নামে ব্যবসা শুরু করি। বর্তমানে অনলাইনে প্রসাধনীর সামগ্রী ব্যবসা মোটামুটি সফলতা পেয়ে যাচ্ছি।

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স পড়ুয়া ছাত্রী সূচনা সিনহা। করোনা ভাইরাসের জন্য সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। তাই ফিরে যেতে হয় মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জের আদমপুরের তেতইগাঁওয়ের গ্রামের বাড়িতে। ঘরে বসেই একঘেয়েমি থাকতে থাকতে অলস হয়ে পড়েছিল সূচনা। তাই তার বোনের পরামর্শ নিয়ে নিজস্ব ফেসবুক পেইজ খুলে ইমিটেশন গহনার ব্যবসা শুরু করেন। এ বিষয়ে সূচনা সিনহা মহিলা অঙ্গনকে বলেন, করোনার জন্য দীর্ঘ দিন ধরে পড়াশোনা থেকে অনেকটা দূরে আছি। তাই সর্বদায় মুঠোফোনে হাতাহাতি করে সময় কেটে যেত। ভাবলাম ঘরে বসে সময় নষ্ট করার চেয়ে কিছু একটা করলে ভালো হয়। সেই থেকে আমার নিজস্ব সঞ্চিত মাত্র ৩ হাজার টাকা দিয়ে ইমিটেশন গহনার ব্যবসা শুরু করি সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে ‘ওরনা মেন্টস বাই সিস্টারস’ নামের পেইজ খুলে। চাহিদাও বেশ ব্যাপক আকারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

ব্যবসায়ী অনিবালা দেবী প্রতিবেদককে বলেন, তরুণী বয়সে স্বেচ্ছায় মণিপুরী কাপড় বুনন করেছি। এরপর সংসার জীবনে এসে নিজের কিছু সঞ্চিত অর্থ আর ঋণ নিয়ে প্রায় ১ লাখ টাকা ব্যয়ে সিলেটের শিবগঞ্জে ‘অর্ণব কটেজ’ নামে মণিপুরী কাপড়ের একটি শোরুম খুলেছি ২০১১ সালে। মধ্যম পরিসরে হলেও ব্যবসায় মোটামুটি সচ্ছলতা ফিরে পেয়েছিলাম। কিন্তু মহামারি করোনায় অনেক কষ্টে দিন যাপন করতে হয়েছে। তবুও মানুষের চাহিদা থাকায় ঝুঁকি নিয়ে ব্যবসায় হাল ধরতে হয়েছে আমাকে। দেশের প্রথম দফায় করোনাকালে স্মার্ট মুঠোফোনে নানা প্রান্ত থেকে অর্ডার আসত। তাই যারা সিলেটের বাইরে কাপড়ের ব্যবসা করেছিল, তাদেরকে সেই সময় পাইকারী দরে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছিলাম। সেই থেকে এখনো স্মার্ট ফোনে একের পর এক বড় বড় ব্যবসায়ীদের অর্ডার আসছে। তিনি আরো বলেন, ইচ্ছে আছে, যদি বড় পরিসরের কোনো লোনের ব্যবস্থা হয়, তবে মণিপুরী হস্তশিল্পকে আরো বেশি জোরালোভাবে গড়ে তোলার ইচ্ছা আছে।