কোন পথে জাপান

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০২১, ২১:৪৭

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজিত অক্ষশক্তির প্রভাবশালী দেশ জাপান। যুদ্ধের শেষ দিকে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় রণাঙ্গনে জাপানের শক্তি ও দাপট নিশ্চিহ্ন করে দেয় আমেরিকার পরমাণু আক্রমণ। আজ থেকে প্রায় ৭৫ বছর আগে ঘটে যায় বিশ্ব ইতিহাসের এই নজিরবিহীন ঘটনা। মাত্র এক দিনের ব্যবধানে আত্মসমর্পণের দ্বারপ্রান্তে থাকা জাপানের দুই গুরুত্বপূর্ণ শহর হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পরপর দুটি পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে করুণতম ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে। এরপর দ্রুতই জাপানের আত্মসমর্পণ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের যবনিকাপাত ঘটায়। যুদ্ধ শেষে পরাজিত জাপানের হাতছাড়া হয় নিজ সাম্রাজ্যের বিশাল অংশ। এই সূত্র ধরে জাপানের ভবিষ্যত্ প্রতিশোধ গ্রহণের স্প্রিহাকে স্তব্ধ করে দিতেই দেশটিকে সামরিকভাবে শক্তিশূন্য করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেয় সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক পক্ষ। এরই ধারাবাহিকতায় জাপানের ওপর আরোপিত হয় বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা। এই পর্যায়ে আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতায় সীমিত হয়ে পড়ে জাপানের সামরিক বাহিনীর ভবিষ্যত্ আধুনিকায়ন প্রক্রিয়া। অন্যদিকে ব্যাপক আন্তর্জাতিক চাপের মুখে নতুন শান্তিবাদী সংবিধান প্রণয়নের উদ্যোগ নেয় জাপান সরকার। ফলে ১৯৪৭ সালে গৃহীত নতুন সংবিধানে দেশটির সামরিক কার্যক্রম শুধু আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে পরিচালিত করতে একটি অনুচ্ছেদ সংযোজন করে জাপানি সংসদ। এতে করে দেশটির পুনঃশক্তি সঞ্চয়ের সমস্ত ইচ্ছা কার্যত স্থায়ীভাবে নিঃশ্বেষ হয়। অবশ্য তত্পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় জাপান-আমেরিকা নিরাপত্তা সহযোগিতার ঘনিষ্ঠতা অব্যাহতভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে। যদিও টোকিওর পররাষ্ট্র ও সামরিক নীতিতে আমেরিকার প্রভাব আধুনিক বিশ্বব্যবস্থার এক ব্যতিক্রম বাস্তবতা হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। অন্যদিকে ষাট ও সত্তরের দশক থেকে জাপানের অর্থনৈতিক উত্থান আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশটির গুরুত্ব অত্যধিক বাড়িয়ে দেয়। মূলত নিজের প্রভূত অর্থনৈতিক সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে জাপান বিশ্বের প্রধান দাতা দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়। সামরিক ব্যয়ের সীমাবদ্ধতা থাকার কারণে দ্রুত অর্থনৈতিক সাফল্য পায় জাপান। ফলে দেশটি দ্রুতই বিশ্বের অন্যতম বৃহত্ অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়। অর্থনৈতিক সক্ষমতার এই বাস্তবতা জাপানের পুনর্বার সামরিক শক্তি অর্জনের সুপ্ত ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটায়। সেদেশের রাজনীতিকদের বিভিন্ন সময়ের কর্মকাণ্ডে এ ধরনের আকাঙ্ক্ষার স্পষ্ট বহিঃপ্রকাশ ঘটে। মূলত আঞ্চলিক বিরোধ, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজের অতীত গৌরব পুনরুদ্ধার, বিশ্বব্যবস্থায় নিজের অবস্থান সুসংহত রাখতেই জাপান আবার সামরিকভাবে শক্তিশালী হতে সচেষ্টতা প্রদর্শন করে আসছে। এক্ষেত্রে আমেরিকার ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর পাশাপাশি চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে নিজের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক বিরোধ নিষ্পত্তিতে নিজের শক্তির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে টোকিও। ফলে গত দশক থেকে দেশটির শান্তিবাদী সামরিক নীতির পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। এই পর্যায়ে দেশটি নানাভাবে নিজের সামরিক বাহিনী আধুনিকায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে। এর বাইরে জাপান সরকারের আগ্রহে সেখানে নতুন করে উন্নত অস্ত্র মোতায়েন করে আমেরিকা। এই ধারাবাহিকতায় ২০০৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে দেশটির নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষর আঞ্চলিক নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট বিষয়ে একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। অনুরূপ কায়দায় ২০০৮ সালে ভারতের সঙ্গেও দেশটির নিরাপত্তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে ভারত মহাসাগরীয় রণনিরাপত্তা কৌশলে আসে পরিবর্তন। এই পরিবর্তন চীনের প্রতিকূলে মার্কিন অক্ষের কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধির বিভিন্ন প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, যেখানে দীর্ঘদিনের পরীক্ষিত মার্কিন মিত্রদের চীনের বিরুদ্ধে লেলিয়া দেওয়ার প্রেক্ষাপট সৃষ্টি করতে ওয়াশিংটন সফলতা পেয়েছে বলে ধারনা করা হয়। সংগত কারণেই জাপানের এ ধরনের সামরিক পদক্ষেপ চীনের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবেই ধরে নেওয়া হয়। উল্লেখ্য, একসময়ের জাপানি উপনিবেশ চীন আজ বিশ্বরাজনীতির প্রধান একটি ফ্যাক্টর। অন্যদিকে চীন-জাপান সম্পর্ক সাধারণভাবে স্বাভাবিক বোধগম্য হলেও জাপান সম্পর্কিত চীনের মনোভাবে আছে তীব্র বিদ্বেষ। চায়নাদের মতো উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়াও সমানভাবে জাপানকে ভিন্ন চোখে দেখে। মূলত ঐপনিবেশিক যুগে জাপানি শাসনের তীব্র বঞ্চনা থেকেই উপরোক্ত তিন দেশের সঞ্চারিত ক্ষোভ এখনো ব্যাপকভাবে ক্রিয়াশীল, যে কারণে উল্লেখিত আঞ্চলিক দেশগুলো কোনোভাবেই জাপানের সামরিক শক্তি অর্জনের প্রচেষ্টাকে ভালো চোখে দেখে না। এর মধ্যে জাপানের সামরিক শক্তি অর্জনের সমস্ত প্রচেষ্টায় কার্যকর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে চীন। কেননা, এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় চীন-মার্কিন কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জাপান আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। এক্ষেত্রে জাপানে মোতায়েন থাকা মার্কিন সেনাদের শক্তি-সক্ষমতা যাচাই করে চীনের সামরিক কৌশল বিন্যস্ত করা আছে। তাই এই মুহূর্তে যদি জাপান নতুন করে শক্তি সঞ্চয় ও নিজের যুদ্ধক্ষমতা বাড়িয়ে নেয়, তাহলে সেটি হবে চীনের জন্য বড় ধরনের দুশ্চিন্তার কারণ। এমনটি হলে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির যুদ্ধকৌশলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। জাপানের অর্জিত শক্তির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চীনকেও নিজের সক্ষমতা আরো যুগোপযোগী করে তুলতে হবে। আর এই মুহূর্তে ভারতের সঙ্গে মারাত্মক উত্তেজনার মধ্যে থাকা চীনকে জাপানের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে আরেকটি ফ্রন্টে কৌশলগত লড়াইয়ে অবতীর্ণ হতে হচ্ছে। এখানে আবারও উল্লেখ করতে হয় যে পরিবর্তনশীল বিশ্বব্যবস্থায় চীন-আমেরিকা শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিশ্বরাজনীতিতে স্নায়ুযুদ্ধের মতো এক প্রচ্ছন্ন লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয়েছে। এই লড়াইয়ে চীনবিরোধী অক্ষের শক্তি হিসেবে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশ জাপানকে বলীয়ান করতে মার্কিন আগ্রহের ব্যাপারটি আর গোপন কিছু নয়। তাই তো গত এক দশক থেকেই জাপানের সামরিক বাজেট বর্ধনশীল। সর্বশেষ গত মাসে জাপানের পার্লামেন্ট দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সামরিক বাজেট অনুমোদন করেছে, যার আকার প্রায় ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। মূলত ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা বৃদ্ধি একই সঙ্গে উন্নত জঙ্গি বিমান সংগ্রহের পাশাপাশি উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা অর্জনে বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ ব্যয় হবে। ফলে ধারে নেওয়া হচ্ছে, এই প্রক্রিয়ায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে নিজেদের ভূমিকা জোরদার করার বিভিন্ন ইঙ্গিতকে বাস্তবসম্মত করল জাপান। এর ফলে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় রণকৌশলে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী আমেরিকা ও চীনের ঠান্ডা লড়াই আরো জোরদার আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়িয়ে চলমান সামরিক উত্তাপকে উত্তেজনার তুঙ্গে নিয়ে যেতে পারে। এখানে উল্লেখ করতে হয় যে, দীর্ঘদিন থেকেই জাপান তার মৌলিক কর্মকৌশলে তিনটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দিয়ে থাকে। প্রথমত, নিজের অর্থনৈতিক পরাশক্তিমূলক অবস্থান ধরে রাখা। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক সাহায্য প্রদানপূর্বক আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়; এই প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসন লাভ করে রাজনৈতিক পরাশক্তি হিসেবে আত্বপ্রকাশ। তৃতীয়ত, নিজের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ সামরিক শক্তির অধিকারী হয়ে বিশ্বের বুকে নিজের প্রভাব-প্রতিপত্তি বৃদ্ধি করা। এতদোদ্দেশ্যে দেশটি অনেক আগেই বেসামরিক পরমাণু কার্যক্রমের সূচনা করেছিল। সুতরাং এখানে স্পষ্টভাবেই লক্ষণীয় যে, জাপানের আত্মোপলব্ধিতে নিজেকে প্রচলিত-অপ্রচলিত অস্ত্রে সজ্জিত করার ব্যাপারটি চীনকে লক্ষ্য করেই। এই প্রক্রিয়ার প্রাথমিক ধাপ হচ্ছে দেশটির সামরিক বাজেট বৃদ্ধির সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত। জাপানের এ ধরনের উদ্যোগে আমেরিকার ইন্ধন না থাকার কোনো অবকাশ নেই। মূলত এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকায় চীনের বিদ্যমান আধিপত্যকে নিয়ন্ত্রণে রাখার মার্কিন কৌশলে জাপানের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির প্রসঙ্গটি আমেরিকার অনুকূলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে জাপানের বাণিজ্য আধিপত্য কাজে লাগিয়ে চীনের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রেখে চলা দেশগুলোকে এককাট্টা করা সম্ভব হলে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ের সুরক্ষা নিশ্চিত হবে। পরিশেষে বলা যায়, জাপানের সামরিক বাজেট বৃদ্ধির প্রাসঙ্গিকতার প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে চীনের শক্তি চ্যালেঞ্জ করা। আর এ ধরনের জাপানি পদক্ষেপ এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার বিদ্যমান সামরিক স্থিতাবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম হবে। এর ফলে অদূর ভবিষ্যতে এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় এলাকার রাজনৈতিক কর্তৃত্বে জাপানের ভূমিকা আরো কার্যকারিতা পেতে পারে, যা অবশ্যই চীনের জন্য দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠবে।

n লেখক : বিশ্লেষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা