দুদককাণ্ডে ভুল বিচারে নিরপরাধ ব্যক্তির জেল!

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২১, ২২:৩৬

প্রকৃত আসামি নোয়াখালী সদরের পশ্চিম রাজারামপুরের কামরুল ইসলাম এখনো রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এসএসসি পরীক্ষার মার্কশিট ও প্রশংসাপত্র জাল করে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন মাইজদী কলেজে। সেই জাল-জালিয়াতি তদন্ত করে দায় চাপানো হয় নিরপরাধ পূর্ব রাজারামপুরের কামরুলের ওপর। সেই তদন্তের ভিত্তিতে এগিয়েছে বিচার। হুলিয়া ও সম্পত্তি ক্রোকের পুলিশ প্রতিবেদনে সঠিক চিত্র উঠে এলেও তা আমলে নেননি দুদক ও অধস্তন আদালতের বিচারক। দুদক ও বিচারকের এমন কাণ্ডে দণ্ডিত হন নিরপরাধ সেই ব্যক্তি। ভুল তদন্ত ও বিচারের এই ঘটনা শেষ পর্যন্ত গড়িয়েছে উচ্চ আদালতে। তাতে হস্তক্ষেপ করেছেন বিচারপতি এম. ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমানের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ। ইতিমধ্যে নজিরবিহীন এ ঘটনার দায় স্বীকার করে আদালতে ক্ষমা চেয়েছে দুদক। কমিশন বলছে, কোনো অসত্ উদ্দেশ্য থেকে এ কাজ হয়নি। যা হয়েছে সরল বিশ্বাসে। তাই এর দায় থেকে অব্যাহতি দেওয়া হোক। উভয় পক্ষের বক্তব্য নিয়ে বৃহস্পতিবার এ বিষয়ে রায়ের দিন ধার্য রেখেছে হাইকোর্ট।

নোয়াখালী সদরের পশ্চিম রাজারামপুরের বাসিন্দা আবুল খায়েরের পুত্র কামরুল ইসলাম ১৯৯৮ সালে এসএসসি পরীক্ষা দেন নোয়াখালী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে। পরীক্ষায় কৃতকার্য হতে না পেরে পরে এসএসসি পাশের জাল মার্কশিট ও প্রশংসাপত্র সৃজন করে ১৯৯৮-৯৯ শিক্ষাবর্ষে এইচএসসিতে (মানবিক) ভর্তি হন মাইজদী পাবলিক কলেজে। এ ঘটনায় ২০০৩ সালের ২৫ জানুয়ারি তত্কালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরোর কুমিল্লা অঞ্চলের পরিদর্শক মো. শহীদুল আলম সুধারামপুর থানায় মামলা দায়ের করেন। মামলার এজাহারে প্রকৃত আসামি কামরুল ইসলামের গ্রামের নাম ‘পশ্চিম রাজারামপুর’-এর স্থলে ‘পূর্ব রাজারামপুর’ লেখেন। এতে প্রকৃত আসামির পরিবর্তে তদন্ত এগোয় নিরপরাধ ব্যক্তির বিরুদ্ধে। নোয়াখালী কার্যালয়ের দুদকের উপসহকারী পরিচালক মো. মাহফুজ ইকবাল ২০১৩ সালে আদালতে চার্জশিট দাখিল করেন। তাতে বলা হয়, ১৯৯৮ সালের এসএসসি পরীক্ষার টেবুলেশনশিট যাচাই করে দেখা যায়, আসামি কামরুল কৃতকার্য হতে পারেননি। কিন্তু এর পরও তিনি এইচএসসিতে ভর্তি হন। তার ব্যবহূত নম্বরপত্র ও প্রশংসাপত্রটি ছিল জাল বা ভুয়া। জেনেশুনে এ ধরনের নথি ব্যবহার করে ভর্তি হওয়া শাস্তিযোগ্য অপরাধ হওয়ায় তাকে অভিযুক্ত করা হলো।

পুলিশের ক্রোকি প্রতিবেদনও আমলে নেননি বিচারক

অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে কামরুলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে আদালত। একই সঙ্গে সম্পত্তি ক্রোকের নির্দেশ দেওয়া হয়। আদালতের হুলিয়া ও ক্রোক্রি পরোয়ানার আদেশ পেয়ে তা তামিলের জন্য যায় সুধারামপুর থানার পুলিশ। কিন্তু ঠিকানা ভুল থাকায় প্রকৃত আসামিকে খুঁজে না পেয়ে মামলার অন্যতম সাক্ষী নোয়াখালী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মাহমুদ রিয়াদের সঙ্গে কথা বলে আদালতে প্রতিবেদন দেন এএসআই মো. হাবিবুর রহমান। ঐ প্রতিবেদনে বলা হয়, সরেজমিন তদন্তকালে আসামির ঠিকানায় না পেয়ে মামলার দুই নম্বর সাক্ষীর সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, আসামি মো. কামরুল ইসলামের ঠিকানায় গ্রাম হিসেবে ‘পূর্ব রাজারামপুরের’ বিষয়টি সঠিক নয়। আসামির প্রকৃত ঠিকানা হচ্ছে পশ্চিম রাজারামপুর, আবুল খায়ের দারোগা বাড়ি, ৫ নং ওয়ার্ড, হরিনারায়ণপুর বাজারের পূর্ব পার্শ্বে। ঐ ঠিকানায় গিয়ে জানা যায়, আসামি বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তার নিজস্ব কোনো অস্থাবর সম্পত্তি না থাকায় ক্রোক করা সম্ভব হলো না। ২০১৪ সালের ৭ এপ্রিল এই প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করে পুলিশ। এরপর সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে পূর্ব রাজারামপুরের নিরপরাধ কামরুলকে তিনটি ধারায় পাঁচ বছর করে ১৫ বছরের জেল দেন নোয়াখালীর বিশেষ জজ শিরীন কবিতা আখতার। একই সঙ্গে তাকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। ২০১৪ সালের ২৬ নভেম্বর দেওয়া ঐ রায়ের পর আসামিকে গ্রেপ্তারের জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানার আদেশ যায়। ঐ পরোয়ানার ভিত্তিতে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে কামরুলকে গ্রেপ্তারে তার বাড়িতে যায় পুলিশ। কিন্তু তাকে না পেয়ে চলে আসে। এরই মধ্যে নিরপরাধ কামরুল ২০০৬ সালে এসএসসি পাশ করে নোয়াখালীর চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এমএলএসএসের চাকরি নেন। পরে ভুল বিচারের হাত থেকে বাঁচতে হাইকোর্টে রিট করেন তিনি।

নিরপরাধ কামরুলের স্কুলও ছিল ভিন্ন

রিটে বলা হয়, অপরাধ সংঘটনের সময় নিরপরাধ কামরুলের বয়স ছিল ৮ বছর। তার জন্ম ১৯৯০ সালে। আর প্রকৃত আসামির বয়স ছিল ২০ বছর। প্রকৃত আসামি ও নিরপরাধ ব্যক্তি দুজনের নাম কামরুল হলেও তারা ভিন্ন ব্যক্তি। তাদের পিতার নাম এক হলেও মাতার নাম আলাদা। প্রকৃত আসামি পশ্চিম রাজারামপুরের কামরুলকে বাঁচাতেই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পূর্ব রাজারামপুরের কামরুলকে অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেয় দুদক। রিটকারী কামরুল নোয়াখালীর হরিনারায়ণপুর স্কুল থেকে এসএসসি পাশ করেন, যা মামলার নথিতে রয়েছে। শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট গত অক্টোবর মাসে নিরপরাধ কামরুলকে গ্রেপ্তার বা হয়রানি না করতে পুলিশকে নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে দুদককে এ দুই ব্যক্তির বিষয়ে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। দুদক হাইকোর্টে প্রতিবেদন দিয়ে বলে, রিটকারী কামরুল তার আবেদনে নিজেকে নিরপরাধ হিসেবে যে বক্তব্য তুলে ধরেছেন তা সঠিক।

রিটকারী আইনজীবী মিনহাজুল হক চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, দুদক ও বিচারক কেউ দায় এড়াতে পারেন না। হুলিয়া ও ক্রোকি পরোয়ানায় পুলিশ সঠিক তথ্য তুলে ধরলেও বিচারক সেটা আমলে নেননি। ভুল তদন্ত ও বিচারে একজন নিরপরাধ ব্যক্তির জেল—এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।

দুদকের কৌঁসুলি খুরশীদ আলম খান বলেন, প্রকৃত আসামি কামরুল দণ্ডিত কামরুল নন। দণ্ডিত ব্যক্তি কখনো জেল খাটেনি। আমরা আদালতে ক্ষমা চেয়ে বলেছি, ভুল হয়েছে।