যুক্তরাষ্ট্রে পরিবর্তন, পাকিস্তানের অস্বস্তি

আপডেট : ২৭ জানুয়ারি ২০২১, ২২:০৯

পাকিস্তান জন্মলাভের পর তাদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনকারী প্রথম দেশটির নাম ছিল যুক্তরাষ্ট্র। সে সময়ে স্নায়ুযুদ্ধে নিয়োজিত ছিল যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়ন। ভারত তখন সোভিয়েত ইউনিয়নের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। তাই পাকিস্তানকে পাশে পেতে মরিয়া ছিল ওয়াশিংটন। ১৯৪৯ সালে ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু আমেরিকা সফরে গিয়ে তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যানকে সুস্পষ্ট একটি বার্তা দিয়েছিলেন, ‘স্নায়ুযুদ্ধে কোনো পক্ষে না গিয়ে নিরপেক্ষ থাকবে নয়াদিল্লি’। আর এ বার্তাই যুক্তরাষ্ট্রকে পাকিস্তানের দিকে আরো ঝুঁকে পড়তে সাহায্য করে। বিপরীতে ভারত-রাশিয়ার বন্ধুত্বের পথও সহজ হয়। পঞ্চাশের দশকে সোভিয়েতের ওপর নজর রাখতে আমেরিকাকে পেশোয়ার বিমানঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল পাকিস্তান। শুধু তা-ই নয়, পাকিস্তান মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের প্রথম চীন সফরে মধ্যস্থতা করেছিল। এসবের বিনিময়ে পাকিস্তানের সখ্য গড়ে ওঠে আমেরিকার সঙ্গে; পাকিস্তান লাভ করে লাখ লাখ ডলারের মার্কিন সামরিক সহায়তা। কিন্তু আশির দশকে এসে হোয়াইট হাউজের হুঁশ ফেরে। পাকিস্তানকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য দেওয়া স্থগিত করে মার্কিন কংগ্রেস। যুক্তরাষ্ট্র শর্ত রাখে, পাকিস্তানকে দেওয়া সাহায্যের অর্থ ইসলামাবাদ তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে ব্যবহার করছে না—এটা আগে নিশ্চিত করতে হবে। তা না করা পর্যন্ত সাহায্য স্থগিত থাকবে। ১৯৯২ সালে পাকিস্তানে নিযুক্ত মার্কিন দূত নিকোলাস প্ল্যাট সরাসরি বলেছিলেন, পাকিস্তান রাষ্ট্রীয়ভাবে সন্ত্রাসবাদের পৃষ্ঠপোষকতা করে। মার্কিন মুলুক সেই প্রথম আঙুল তোলে পাকিস্তানের দিকে।

কিন্তু নাইন-ইলেভেনের পর দুই দেশের সম্পর্ক নতুন মোড় নেয়। সন্ত্রাসবাদবিরোধী লড়াইয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত মিত্র হিসেবে পাকিস্তানকে কাছে টানে যুক্তরাষ্ট্র। এ সময় ইসলামাবাদের ওপর থেকে সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয় আমেরিকা। ১০০ কোটি ডলারের ঋণ মওকুফ করে দেয়। আমেরিকার ইঙ্গিতে ২০০৪ সালের মধ্যে সামরিক জোট ন্যাটোর নতুন বন্ধু হিসেবে অস্ত্র কেনার সুযোগ পায় পাকিস্তান। কিন্তু আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার শুরু হলে পাকিস্তান নিয়ে সুর বদলাতে থাকে আমেরিকা। পাকিস্তানের প্রতি বুশ ও ওবামা প্রশাসনের বিরক্তি প্রকাশিত হয়। অভিযোগ ওঠে, সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ের জন্য প্রাপ্ত সাহায্য পাকিস্তান সন্ত্রাসের কাজেই বেশি ব্যবহার করে। আমেরিকা ২০১১ সালে পাকিস্তানকে দেওয়া ৮০ কোটি ডলারের সামরিক সাহায্য স্থগিত করে। ট্রাম্প ক্ষমতায় এসে বুশ-ওবামা প্রশাসনের অবস্থানকে আরো কঠোর করেন। ট্রাম্প সরাসরি বলেন, ‘পাকিস্তানকে আমরা যখন শত শত কোটি ডলার সাহায্য দিচ্ছি, তখন দেশটি জঙ্গিদের নিরাপদ ঘাঁটিতে পরিণত হচ্ছে। আমরা আবার সেই জঙ্গিদের বিরুদ্ধেই লড়াই করছি।’ 

পাকিস্তান থেকে আমেরিকার মুখ ফিরিয়ে নেওয়া শুরু হয় ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের শাসনের সময়ই। তারপর বুশ প্রশাসনও তা বজায় রাখে। বারাক ওবামা তা আর এক ধাপ বাড়িয়ে দেন। ওবামার আমলে ভারত-মার্কিন বেসামরিক পরমাণু চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তির রূপকার ছিলেন সে সময়ের মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। সেই বাইডেন এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। একনাগাড়ে বাইডেন ৩৬ বছর মার্কিন সিনেটর ছিলেন। বারাক ওবামার সঙ্গে রানিংমেট ছিলেন আট বছর। বাইডেন ২০০৭ সালে পাকিস্তানকে সম্ভাব্য সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছিলেন। ২০০৮ সালে বাইডেন বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশে যদি কোনো হামলা হয়, তাহলে তা হবে আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকে।’ ২০১১ সালে তিনি পাকিস্তান সফরে এসে বলেছিলেন, ‘আমরা চাই একটি শক্তিশালী, স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক পাকিস্তান, যে নিজে শান্তিতে থাকবে এবং ভারতসহ প্রতিবেশীদের শান্তিতে রাখবে। আমরা আপনাদের স্বার্থেই শুধু নয়, আমাদের নিজেদের স্বার্থেও তা কামনা করি।’

মার্কিন কংগ্রেস আজ বিশ্বাস করে, পাকিস্তানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জঙ্গিরাই আফগানিস্তান ও জম্মু-কাশ্মীরে নাশকতামূলক তত্পরতায় লিপ্ত। পৃথিবীর অনেক দেশই বিশ্বাস করে, পাকিস্তানের সরকারি কোষাগার থেকে পেনশন দিয়ে জঙ্গিদের পোষা হয়। গত ৭০ বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে পাকিস্তান থেকে হিন্দু, খ্রিষ্টান, শিখ এবং অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্র্রদায়ের অস্তিত্ব মুছে ফেলা হয়েছে। আমেরিকার চাপে ইতিমধ্যে ফিনান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্কফোর্স (এফএটিএফ) ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পাকিস্তানকে ‘ধূসর তালিকা’তে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই ধূসর তালিকায় পাকিস্তান যত দিন থাকবে, তত দিন আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর সাহায্য থেকে পাকিস্তান বঞ্চিত থাকবে।

চীনের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক ভালো। ভারতকে টেক্কা দেওয়া তাদের জন্য সহজ হয়, কেননা চীন তাদের পাশে দাঁড়ায়। কিন্তু চীনের সঙ্গে অতি সখ্য আবার তাদের প্রতি আমেরিকানদের চোখ ফিরিয়ে নিতে পারে—এ আশঙ্কাও তাদের রয়েছে। তাই ইমরান প্রশাসন ভীষণভাবে অস্বস্তিতে দিন কাটাচ্ছে বর্তমানে। ইতিমধ্যে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইমরান খান ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের জঙ্গিবিরোধী এবং ইসলামবিরোধী অবস্থান নিয়ে সোচ্চার বিরোধিতা করেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট ও পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট দুজনেই তির্যকভাবে আক্রমণ করেন ফ্রান্সকে। ফ্রান্সের তৈরি তিনটি সাবমেরিন আছে পাকিস্তানে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে ফ্রান্সের কাছে এ সাবমেরিনগুলোর পানির নিচে বেশিক্ষণ থাকার ক্ষমতা বৃদ্ধির পদ্ধতি উন্নত করার অনুরোধ করা হয়েছিল। কিন্তু ফ্রান্স তা নাকচ করে দেয়। ফ্রান্সের তৈরি রাফায়েল জঙ্গি বিমান কিনেছে কাতার। ফ্রান্স কাতারকে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে, রাফায়েল দেখভাল করার জন্য পাকিস্তানি কোনো টেকনিশিয়ান নিয়োগ দেওয়া যাবে না। এর পর থেকে ফ্রান্সে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করলে কোনো পাকিস্তানিকে ফ্রান্স আশ্রয়ও দিচ্ছে না।

চারদিক থেকে কোণঠাসা হয়ে আছে পাকিস্তান। ভারত দাবি করে আসছে— জঙ্গিবাদের আশ্রয়কেন্দ্র পাকিস্তান। ফ্রান্স, জার্মানিসহ ইউরোপের দেশগুলোও পাকিস্তানের জঙ্গি সম্পৃক্ততা নিয়ে আশঙ্কায় আছে। ঠিক এ সময়েই মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়ে এসেছেন জো বাইডেন। তাই পাকিস্তানের ইমরান প্রশাসনের চোখে স্পষ্টতই হতাশার আভাস দেখা যাচ্ছে। পাকিস্তান সরকার জঙ্গি সংগঠন ‘লস্কর-ই-তইবা’র অপারেশন কমান্ডার জাকিউর রহমান লকভিকে গত ২৬ ডিসেম্বর ২০২০ গ্রেপ্তার করেছে। পাঞ্জাব প্রদেশ পুলিশের জঙ্গিবিরোধী শাখা জানিয়েছে, মুম্বাই হামলার অন্যতম আসামি এই জঙ্গি নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ইতিমধ্যে জাতিসংঘ লকভিকে ‘ভয়ংকর সন্ত্রাসবাদী’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ভারতের মুম্বাই হামলায় ১৬৬ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। এরই মধ্যে পাকিস্তানের আদালত লকভিকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেছে। ইতিমধ্যে ন্যাটোবহির্ভূত মিত্র দেশের তালিকা থেকে পাকিস্তানকে সরাতে বিল পেশ হয়েছে মার্কিন কংগ্রেসে। সন্ত্রাস দমনে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করায় এফএটিএফের ধূসর থেকে কালো তালিকাতেও যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে পাকিস্তানের। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, পাকিস্তান আন্তর্জাতিক চাপে পড়েই লকভিকে গ্রেপ্তার এবং শাস্তি প্রদান করতে বাধ্য হয়েছে। এরই মধ্যে জইশ প্রধান মাসুদ আজহারের বিরুদ্ধেও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে পাকিস্তান সরকার। মার্কিন প্রশাসনের পরিবর্তন পাকিস্তানের জন্য বাড়তি চাপ বলেই মনে হচ্ছে। বাইডেন প্রশাসন পাকিস্তানের জন্য অস্বস্তির নতুন বার্তা নিয়ে এসেছে বলেই মনে হচ্ছে।

n লেখক :সাবেক সেনাকর্মকর্তা