এলডিসি থেকে উত্তরণ

রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখতে উদ্যোগ জরুরি

আপডেট : ২৯ জানুয়ারি ২০২১, ২১:১৭

ইত্তেফাক রিপোর্ট

 

আগামী মাসে বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ ইস্যুতে পর্যালোচনায় বসবে জাতিসংঘের এ সংক্রান্ত কমিটি, যা সিডিসি নামে পরিচিত। এলডিসি থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতির জন্য প্রধান তিনটি ধাপ বাংলাদেশ অর্জন করেছে। ফলে বাংলাদেশ আশা করছে, চলতি ফেব্রুয়ারি মাসের পর্যালোচনায় এক্ষেত্রে ইতিবাচক সাড়া মিলবে। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা আসবে তিন বছর পরে। অর্থাত্ ২০২৪ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে এলডিসি থেকে বেরিয়ে যাবে বাংলাদেশ।

ইস্যুটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। কেউ কেউ বর্তমান বাস্তবতায় বাংলাদেশের এলডিসিতে থেকে যাওয়াকেই সঠিক মনে করছেন। তবে সরকারের এ বিষয়ে অবস্থান হচ্ছে, এলডিসি থেকে বেরিয়ে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি। এতে প্রাথমিকভাবে কিছুটা ধাক্কা আসলেও উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেশের জন্য বড় অর্জন বলে মনে করছেন অনেকেই। অবশ্য এলডিসি থেকে উত্তরণ হলেও বাংলাদেশকে দেওয়া বিদ্যমান সুবিধা আরো দুই বছর বাড়ানোর বিষয়ে ইতিমধ্যে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় অনুরোধ জানিয়েছে বলে জানা গেছে।

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার সুবিধা কিংবা চ্যালেঞ্জ কী? স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নীতি অনুযায়ী, বেশির ভাগ উন্নত দেশে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায়। বাংলাদেশের বড় রপ্তানি বাজার ইউরোপের ২৮টি দেশ ছাড়াও কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ বহু দেশে এ সুবিধা পেয়ে আসছে বাংলাদেশ। এমনকি চীন, জাপান, ভারতের বাজারেও বিপুলসংখ্যক পণ্য রপ্তানিতে এ সুবিধা পাচ্ছে। কিন্তু স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর ২০২৪ সাল থেকেই বাংলাদেশি পণ্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোতে প্রবেশকালে শুল্ক দিতে হবে। কোনো কোনো দেশে এটি ১৫ শতাংশ কিংবা তারও বেশি। ইউরোপের দেশগুলোতে এই হার হবে সাড়ে ৯ শতাংশ। যদিও ঐসব দেশে আরো তিন বছর অর্থাত্ ২০২৭ সাল পর্যন্ত এ সুবিধা ভোগ করতে পারবে বাংলাদেশ। বাংলাদেশ থেকে যারা বর্তমানে ১০০ ইউরো মূল্যে কোনো পণ্য কিনতে পারছেন, শুল্ক পরিশোধ করতে হলে তা ১০৯ ইউরোর ওপরে দাম পড়বে। ইউরোপের বাইরে অন্যান্য দেশের এই হার আরো বেশি হতে পারে। এতে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে বাংলাদেশ। অন্যদিকে ইউরোপের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির কারণে একই সময়ে বাংলাদেশের বড় প্রতিযোগী ভিয়েতনাম ধাপে ধাপে শুল্কমুক্ত সুবিধায় ইউরোপের বাজারে প্রবেশ করতে পারবে। এর ফলে বাংলাদেশের রপ্তানিতে বড় ধাক্কা লাগতে পারে আশঙ্কা কারো কারো। এছাড়া বাংলাদেশ এখন রপ্তানিকারকদের নগদ সহায়তাসহ যেসব সুবিধা দিচ্ছে, উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেলে তাতেও বিধিনিষেধ আসতে পারে। আবার এখন যেভাবে উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তা পাওয়া যাচ্ছে, তাও কমে যাবে।

অন্যদিকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেলে বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে আস্থা বাড়বে। সব মিলিয়ে প্রাথমিক ধাক্কা লাগলেও সম্ভাবনাও বিশাল। তবে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর এ শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখার উপায় রয়েছে বাংলাদেশের হাতে। দ্বিপাক্ষিক ও আঞ্চলিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) কিংবা অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তির (পিটিএ) মাধ্যমে বাংলাদেশ এ সুবিধা পেতে পারে। সেক্ষেত্রে ঐসব দেশের পণ্য আমদানিতেও বাংলাদেশকে একই সুবিধা দিতে হবে। ফলে এতে রাজস্বে প্রভাব পড়বে। তবে আমদানিতে শুল্ক আদায় দীর্ঘ মেয়াদে টেকসই কোনো পদ্ধতি নয়। ডব্লিউটিওর নীতিমালা হচ্ছে, ধীরে ধীরে এ ব্যবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশও এ বিষয়টি এখন উপলব্ধি করছে। এজন্য বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এফটিএ ও পিটিএ করার বিষয়ে ব্যাপক তোড়জোড় শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে সম্প্রতি প্রথমবারের মতো দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভুটানের সঙ্গে পিটিএ স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। আরো প্রায় ১০টি দেশের সঙ্গে নিকট ভবিষ্যতে এ ধরনের চুক্তি হতে বলে জানা গেছে। এটি সঠিকভাবে করা গেলে এক্ষেত্রে এলডিসি থেকে উত্তরণের ধাক্কা সফলভাবে সামলানো সম্ভব হবে।