সৈয়দা সাহেরীন
বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিআইএলএস) হিসেবে দেশে প্রায় ৩০ লাখ ব্যক্তি গৃহকর্মীর কাজ করে। যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। অপেক্ষাকৃত দুর্বল হওয়ায় নির্যাতনের শিকার হন। কিন্তু এসব ঘটনা থেকে যায় আড়ালে। শুধু ভয়াবহ নির্যাতনের কিছু চিত্রই উঠে আসে গণমাধ্যমে। বিশ্লেকরা বলছেন, এসব নির্যাতনের ঘটনায় এখন পর্যন্ত কারও সাজা হয়নি। আর এ কারণেই দিন দিন বাড়ছে এ নির্যাতন।
বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিআইএলএস) হিসেবে গত ১০ বছরে ৯৭৫ জন গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছে। গত বছরে এ সংখ্যা ছিল ৮৭ জন। এদের ৬০ শতাংশই শিশু। চুক্তি ছাড়া গৃহশ্রমিক নিয়োগ, ন্যূনতম মজুরি না দেওয়া, অনিয়মিত মজুরি, অল্প মজুরিতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো, কথায় কথায় শারীরিক নির্যাতন, যৌন নির্যাতন, এমনকি হত্যার ঘটনাও ঘটছে। গত ১২ বছরে অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬শ’ গৃহকর্মীর। বিপুলসংখ্যক গৃহকর্মী আত্মহত্যা করেছে। সম্প্রতি গৃহকর্ত্রী বা পরিবারের সদস্যদের হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছে এদের বয়স আট থেকে ১১ বছর।
দাস প্রথার ইতিহাস প্রাচীন। দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলেও এর প্রচলন ছিল। বিশেষত গৃহদাস প্রথা। বর্তমানে দাস প্রথা বাহ্যিক কাঠামোতে বিদায় নিলেও গৃহদাস প্রথা আজ অবধি রয়ে গেছে। কারণ হাল আমলের গৃহকর্মীদের উপর নির্যাতনের নানা ধরন আর মাত্রা আমাদের সে অনুভূতিই দেয়। বাংলাদেশে গৃহকর্মীদের জন্যে কোনো আইন নেই, কিছু নীতিমালা আছে। যে নীতিমালায় বলা হয়েছে চৌদ্দ বছরের নিচে হলে সে শিশু বাসায় কাজ করতে পারবে না। অথচ খুঁজলে এমন বহু শিশু গৃহকর্মী পাওয়া যাবে যাদের বয়স চৌদ্দ পার হয়নি। সত্যিকার অর্থে গৃহকর্মীদের কোনো বয়স নেই। কখনো নিজের ছোট সন্তানকে সঙ্গ দেবে বলে তারই বয়সী কাউকে খুঁজে বের করা হয়। শহরের সকালের রাস্তায় এমন প্রায়ই দেখা যায় একটা শিশু স্কুলে যাচ্ছে, আর তার বই খাতা বয়ে বেড়াচ্ছে তার সমবয়সী কেউ। গৃহকর্মীর ক্ষেত্রে কম বয়সীদের উপরই সবার চাহিদা। কারণ এদের দিয়ে সব কাজ করানো যায়, যে কোনো কথা বলা যায়।
গৃহকর্মীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হয় নারী আর শিশুরা। বাংলাদেশে সাধারণত মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্তরা সবচেয়ে বেশি শিশু গৃহকর্মী বাসায় রাখে। কারণ এদের বেতন তুলনামূলক কম দিতে হয়। আর প্রকাশিত ঘটনাপ্রবাহের আলোকেও বলা যায়, এরাই সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হয়। নির্যাতনের সময় বয়সে শিশু বলে এদের প্রতিবাদ করার সাহস বা মানসিকতা থাকে না। আবার চাইলেই গৃহকর্তার গৃহ ত্যাগের ক্ষমতাও এদের নেই। ফলে নির্যাতনের সময় হয় মুখ বুঝে সয়ে যায়, নয়তো ফ্যাল ফ্যাল করে একটু কেঁদেই আবার কাজে হাত লাগাতে হয়। দেশের বাইরের নারী গৃহকর্মী নির্যাতনের কথা প্রায়ই সংবাদে আলোচিত হয়। নির্যাতিত হয়ে সর্বস্ব খুইয়ে দেশে ফিরে আসা নারীদের পরিসংখ্যানও কম নয়। দেশেও অনেক নারীকে মানসিক বা শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি কখনো কখনো ধর্ষণের মত ঘটনাও ঘটে। আমাদের দেশে পুরুষের সাথে নারীদের সংসারের দায়িত্ব নেওয়ার হার অনেক বেড়েছে। নারীরা এখন আগের চেয়ে বেশিসংখ্যক কর্মমুখী। ফলে অনেক নারীরই সংসারের যাবতীয় কাজের দায়িত্ব গৃহকর্মীর হাতে ছেড়ে দিতে হয়। তারাও আপনার ঘরেরই মানুষ।
