আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ভাইকে নিয়ে নতুন করে কোনোকিছু লেখার নেই। সারাদেশের মানুষ তার সম্পর্কে জানেন। আমি নিজেকে অনেক সৌভাগ্যবান মনে করছি, কারণ বুলবুল ভাই আমার একাধারে বড় ভাই, বন্ধু ও অভিভাবক ছিলেন। আমি তুই করে বলতাম, বুলবুল ভাইও বলতাম। আমার সবকিছুতেই তিনি অধিকার খাটানোর অধিকার রাখতেন। বিশাল বড়মাপের মানুষ ছিলেন তিনি। অভিমানও করতেন ভীষণ। আসলে বড়মাপের মানুষরা একটু বেশিই অভিমানী হয়।
১৯৮০ সাল থেকে বুলবুল ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয়। তিনি তখন গান করতেন, কিন্তু তার বিখ্যাত গানগুলো তিনি তখনো গাননি। সেই তখন থেকেই গান, গান আর গান করেই জীবনটা পার করলেন। জীবনের প্রথমদিকে বেহালা, গিটার বাজাতেন, মাঝ বয়সে এসে সেগুলোকেই আবার নতুন করে শেখার জন্য কি প্রচেষ্টাই না ছিল তার! তখনকার সময়ে নিজের পকেটের টাকা খরচ করে কে দেশের গান গাইতো। কিন্তু বুলবুল ভাই অসংখ্য দেশের গান গেয়েছেন। স্বাধীনতার পরবর্তীকালে যত দেশের গান হয়েছে, বুলবুল ভাইয়ের গানগুলোই দর্শকনন্দিত হয়েছে। সেই তখনকার গাওয়া দেশাত্মবোধক গানগুলো এখনো চিরতরুণ। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ছুঁয়ে গেছে তার গান। ‘আমি তোমার আগে যদি পৃথিবী ছেড়ে যাই, সাদা শাড়ি পরো না’ গানটির কথা কী রোমান্টিক! আবার তিনি কৃষ্ণকে বলছেন, ‘কৃষ্ণ তোর বাঁশিটা দে না আমারে ধার। এ পরাণে রাঁধা ছিল। আগে অনেক চাইতো আমায়, এখন চায় না আর’! ‘ধার’, ‘আর’—কী যে অন্ত্যমিল, অভিব্যক্তি!
তার লেখনির মাঝে এতটা ব্যতিক্রমী বাহাদুরি ছিল, আমি এমনটা আর কোথাও দেখিনি। তার গানের প্রতিটি লাইন তিনি কতটা সোহাগ ও দরদ দিয়ে লিখতেন, গানগুলো কতটা যত্ন নিয়ে গাইতেন, কত পরিশ্রম করে কম্পোজিশন করতেন সেটা নিজ চোখে না দেখলে হয়তো বোঝা সম্ভব নয়। তার কাজের বহিঃপ্রকাশই ছিল অন্যরকম। তিনি তার জীবনটা গানকেই দিয়েছেন। তিনি কখনো নিজের ও পরিবারের চিন্তা করেননি। তার ধ্যান-জ্ঞান সবই ছিল সঙ্গীতকে ঘিরে। তার চলে যাওয়ায় সঙ্গীতে যে ক্ষতি হয়েছে, তা কখনো পূরণ করা সম্ভব না। আমার বাসা যখন আজিমপুরে ছিল বুলবুল ভাইয়ের সাথে প্রায়ই দেখা হতো। একসঙ্গে কত আড্ডা, কত কাপ চা, কত গান আর গবেষণা... সে দিনগুলোর কথা মনে পড়লে চোখের কোণে এখনো টুপ করে জল জমা হয়ে যায়। উনি যখন গান শুরু করেন তখন পারিশ্রামিক ছিল ১৫০ থেকে ২০০ টাকা। টাকার কথা কখনো চিন্তা করেননি তিনি। বরং নিজের পকেটের টাকা খরচ করে গান করেছেন। আমি বলবো তিনি সেই আশির দশক থেকে শুরু করে মধ্য প্রজন্মের শেষ সৈনিক। আর একজন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল কবে জন্ম নেবে তা কি আমরা জানি? আমার তো মনে হয় না। আজ এতটা বছর পার হয়ে গেল, ওনার মতো তো একজনও পাইনি যার গানে এতটা মায়া আছে। তার মতো বা তার চেয়ে ভালো গানের কথা, সুর দিতে পেরেছেন এমন তো কাউকে দেখিনি। মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান, সঙ্গীত ক্ষেত্রে তার এতটা সেক্রিফাইস... যে কারণে পুরো দেশ ঋণী, সঙ্গীত জগত্ ঋণী। আসলে এত বড়মাপের মানুষের সাথে আমি অনেক অনুষ্ঠানে বাজিয়েছি গেয়েছি। এটা আমার জীবনের অনেক বড় প্রাপ্তি। বুলবুল ভাই সব জায়গায় নিজের রাজত্বটা ধরে রাখবেন আজীবন। দেশের গান কিংবা চলচ্চিত্রের গান বলুন, তার গানে প্রেম, বিরহ, কটাক্ষ, অনুরাগ, দেশপ্রেম, শিশুর সারল্য, সামাজিক নাটকীয়তা, বিদ্রোহ, চাহিবা মাত্রই পাওয়া যেত। আসলে আমরা সঙ্গীতের মহাবীরকে হারালাম। সঙ্গীতের মহাজনের বিদায়। যে ক্ষতি কখনো পূরণ হওয়ার নয়। আমার কথাগুলো গতানুগতিক, কিন্তু এটাই সত্যি। আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলরা হাজার বছরে একবারই জন্ম নেয়...।
লেখক:সঙ্গীতশিল্পী ও আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলে ঘনিষ্ঠ সহোদর
