পৃথিবী জুড়ে যোগাযোগ প্রযুক্তিতে লক্ষণীয় পরিবর্তন এবং এর ফলাফল সবারই বোধগম্য হচ্ছে। এই পরিবর্তন সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলেছে নতুন ধারণা তৈরি ও তার প্রয়োগের ক্ষেত্রগুলোতে। করোনাকালে কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হওয়াতে অনেকেই নতুন করে ভাবতে শুরু করেছে ব্যক্তিগত সম্পদের যুক্তিযুক্ত ব্যবহার এবং তার থেকে উপার্জনের উপায়। এতে খারাপ সময়েও নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা যেমন দেখা যাচ্ছে তেমন ব্যবসায়ের নতুন নতুন ধারণাও সামনে আসছে।
ব্যবসায় বা ব্যবসায় উদ্যোগে প্রতিবন্ধকতা থাকবে, সেটা মেনেই এখনকার সময়ের উদ্যোক্তাদের দেখা যাচ্ছে ই-বিজনেস বা ই-কমার্সের দিকে ঝুঁকে পড়ছেন; কেউ কেউ ভালো করছেন কেউ কেউ বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে পিছিয়েও পড়ছেন। তবে আশার কথা হচ্ছে, সাম্প্রতি ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী জানা যায়, বাংলাদেশে ই-কমার্সের বাজারের আকার বর্তমানে ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি। জনসংখ্যার পরিমাণ এবং বাজারের আকারটি বিবেচনায় নিলে এটা হতে পারে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য একটি বিশাল সম্ভাবনা।
তবে এখানে বিবেচনায় রাখাটা সমীচীন হবে, তরুণ উদ্যোক্তাদের সবাই এই নতুন তৈরি হওয়া বাজারের সুবিধা পুরোপুরিভাবে নিতে পারছেন কি না। দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের উদ্যোক্তাদের এই ব্যবস্থায় যথাযথভাবে অন্তর্ভুক্ত করা গেলে স্থানীয় অর্থনীতি এবং জীবনযাত্রার মানে আসতে পারে ইতিবাচক পরিবর্তন এবং এই বিকেন্দ্রীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঘটবে সুষম উন্নয়ন। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, প্রান্তিক পর্যায়ে একজন উদ্যোক্তা কতটা নমনীয়তার সঙ্গে বিভিন্ন সমস্যার মোকাবিলা করে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন। যোগাযোগপ্রযুক্তি হাতের নাগালে থাকলেও প্রান্তিক পর্যায়ে নতুন ধারণা নিয়ে কাজ করাটা অপেক্ষাকৃত কঠিন হয়ে পড়ে, বিশেষ করে সেটা উত্পাদনসংক্রান্ত উদ্যোগ হলে।
তবে সমসাময়িককালে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে আঞ্চলিক উদ্যোগের সমস্যাগুলো সমাধানের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধারণা আলোচিত হতে দেখা যাচ্ছে, যার মধ্যে ‘কালচারাল এন্ট্রাপ্রেনিওরশিপ’ বা সাংস্কৃতিক উদ্যোগ অন্যতম। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এর কিছুটা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও রয়েছে দারুণ সম্ভাবনাও।
ইউনাইটেড নেশন শিল্পকলা বলতে যে বিষয়গুলোকে তালিকাভুক্ত করেছে তার অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রয়েছে আমাদের দেশের প্রান্তিক মানুষের চমত্কার দখল এবং হার্ভার্ড ইনোভেশন ল্যাব জানাচ্ছে শিল্পকলার এই বিশেষ উপাদনগুলোকে আবর্তন করেই সামনে এগোবে সাংস্কৃতিক উদ্যোগের ধারণা। এই তালিকায় থাকা উল্লেখযোগ্য ধারাগুলো হলো বুনন, নকশা, রন্ধনশিল্প, মৃিশল্প, লোকসংগীত, লোকনাট্য বা এক কথায় বলা যেতে পারে, লোকজ সংস্কৃতির উপাদানসমূহ আবার ক্ষেত্রবিশেষে ভিজুয়াল আর্ট, মর্ডান পারফর্মিং আর্ট বা ভিডিওগ্রাফিও সাংস্কৃতিক উদ্যোগের বড় প্ল্যাটফরম হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমানে এগুলো নিয়ে কাজ হলেও এটিকে ব্যবসায় উদ্যোগের পর্যায়ে নিতে বা ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে পেতে আমাদের আরো অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হবে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করা কারিগর ও শিল্পীরা দ্রুত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ের পটপরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে না পারার কারণে সময়ের থেকে পিছিয়ে পড়েছেন এবং তার ধারাবাহিকতায় আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে পেশা পরিবর্তনের প্রবণতা শুরু হয়েছে বেশ আগেই। আশঙ্কার কথা হলো দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা এই নৈপুণ্য এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে হস্তান্তরও করা হচ্ছে না। যার ফলে একটা সম্ভাবনাময় উদ্যোগের ধারণা প্রায় আড়ালে চলে যাচ্ছে, যাকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে সাংস্কৃতিক উদ্যোগ।
বাংলাদেশে সাংস্কৃতিক উদ্যোগের উপাদানগুলোতে বিশেষ নৈপুণ্য আছে, এমন ব্যক্তিদের যোগাযোগদক্ষতা, বাজারজাতকরণের প্রাথমিক ধারণা এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতা যদি উন্নয়ন করা যায়, তাহলে এটি হতে পারে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়ের ক্ষেত্রে অন্যতম ধারা। এছাড়া রাষ্ট্রীয়ভাবে বা যে কোনো বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে এই উদ্যোগ থেকে উত্পাদিত পণ্য বা সেবা সমন্বিতভাবে পরিবেশন, প্রদর্শন বা বিক্রয়ের জন্য বিশেষ কেন্দ্র করা সম্ভব হলে সেখানে উদ্যোক্তারা সরাসরি অন্তর্ভুক্ত হতে পারত এবং তাতে তাদের উপার্জন হওয়ার সম্ভাবনা যেমন বাড়ত একই সঙ্গে পেশাগত মর্যাদাটাও তৈরি হতো।
যেহেতু সাংস্কৃতিক উদ্যোগ থেকে উত্পাদিত পণ্য বা সেবার ভোক্তা বিশেষ রুচির, কাজেই সেটা বিক্ষিপ্ত না হয়ে সমন্বিত হলে সহজেই একজন ভোক্তা তার পছন্দের জিনিসটি খুঁজে নিতে পারবেন। উল্লেখ্য, এ ধরনের উদ্যোগ ই-কমার্স বা ই-বিজনেস-কেন্দ্রিক করা সম্ভব হলে নতুন ভোক্তাও তৈরি হবে।
যেহেতু সংস্কৃতিজাত পণ্য বা সেবা থেকেই সাংস্কৃতিক উদ্যোগের ধারণাটি এসেছে। অতএব বলাই যায়, এর সঙ্গে আমরা একটি স্থানের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতিকে জুড়ে দিতে পারি। আর সঠিকভাবে এই ধারণাকে লালন করা গেলে বাংলাদেশ হয়ে উঠতে পারে এর তীর্থস্থান। যেখানে সংস্কৃতি আর অর্থনীতির মেলবন্ধন ঘটিয়ে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি যেমন আনা সম্ভব, আবার নিজেদের সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখাটাও সম্ভব হবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।
n লেখক : প্রভাষক, ব্যবসায় প্রশাসন অনুষদ, রবীন্দ্র মৈত্রী বিশ্ববিদ্যালয়
