গত শতাব্দের নব্বই দশকে শিশুদের শৈশব ছিল স্মৃতিগন্ধে ভরপুর। রোদে ঘুরে বেড়ানো, পানিতে সাঁতার কাটা, গাছে চড়া, বড়শি দিয়ে মাছ ধরা—এসব ছিল তখনকার শিশুদের নিত্যদিনের কাজ। তখনকার শৈশবে দুরন্তপনা ছিল। শিশুরা ছিল পাখির মতো স্বাধীন, কিন্তু বর্তমান সময়ে শিশুরা ঘরে আবদ্ধ, প্রকৃতির কাছে যাওয়ার সুযোগ কম। বর্তমান শিশুদের সিংহভাগ সময় দখল করে নিয়েছে স্মার্টফোন। কর্মব্যস্ত অভিভাবকেরা বাচ্চাকে শান্ত রাখার জন্য তার হাতে স্মার্টফোন বা ট্যাব ধরিয়ে দেন। গান, কার্টুন বা ভিডিও গেম চালিয়ে দিয়ে তাকে শান্ত রাখা হয়। এ ডিভাইসগুলো নিয়মিত ব্যবহারে ক্রমশ এগুলোর প্রতি শিশুরা আসক্ত হয়ে যাচ্ছে।
বিশ্বে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী প্রতি ৩ জনে ১ জন শিশু। প্রতিদিন সংখ্যাটা প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার, যার অর্থ প্রতি হাফ সেকেন্ডে একজন শিশু ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। এই পরিসংখ্যান বলে দিচ্ছে স্মার্টফোনের ওপর শিশুদের নির্ভরশীলতা। ফলে ক্রমাগত তারা ভয়াবহ বিপদের দিকে ধাবিত হচ্ছে। স্মার্টফোন আসক্তি শিশুর মানসিক বিকাশে অন্যতম প্রতিবন্ধক, কিন্তু বেশিরভাগ বাবা-মা এ সম্পর্কে অবগত নন।
শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে শারীরিক ও মানসিক সুস্বাস্থ্য উভয় নিশ্চিত করা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের দেশের বাবা-মায়েরা শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করে শুধু দৈহিক স্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দেন। শিশুর মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা জানার জন্য শিশুর মেজাজ, আবেগ এবং আচরণের প্রতি গভীর মনোযোগ দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি মোবাইল কল যখন দুই মিনিট স্থায়ী হয় তখন তা শিশুদের মস্তিষ্কের হাইপার অ্যাক্টিভিটি সৃষ্টি করে, যা পরবর্তী এক ঘণ্টা পর্যন্ত তাদের মস্তিষ্কে বিরাজ করে। যার ফলে শিশুর স্নায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়, রক্তের চাপ বাড়ে, এমনকি নিয়মিত ঘুমের ব্যাঘাতও ঘটায়। এটা শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশকে ব্যাহত করে। ভিডিও গেমের আসক্তিতে শিশুদের মেধা বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নাসরিন ওয়াদুদ বলেন, ‘প্রতিনিয়ত এসব ভিডিও গেম খেললে শরীরে এক ধরনের হরমোন নিঃসরণ হয়। এতে শিশু সবকিছু নিয়েই উত্তেজিত হয়ে পড়ে। বাবা-মায়ের অবাধ্য হয় যায়।’ তাই শিশুর মানসিক বিকাশে স্মার্টফোনের আসক্তি থেকে শিশুকে মুক্ত করা অতীব জরুরি।
চলমান এই পরিস্থিতিতে শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে অভিভাবকদের সচেতন হওয়া অত্যাবশ্যক। অভিভাবকদের সন্তানকে সময় দিতে হবে। প্রকৃতির সান্নিধ্যে আশার সুযোগ করে দিতে হবে শিশুকে। পারিবারিক ও সামাজিক সংযোগ বাড়লে শিশুদের ইলেকট্রনিক মাধ্যমে আসক্তি অনেকটাই হ্রাস পাবে। যন্ত্রিকতার বাধা পেরিয়ে প্রাণোচ্ছল, দুরন্ত শৈশবে ফিরে যাক শিশুরা—সেটাই কাম্য।
মো. জওয়াদুল করিম
শিক্ষার্থী, মনোবিজ্ঞান বিভাগ,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গোপালগঞ্জ
