পৃথিবীতে বাঙালিই একমাত্র জাতি, যারা ভাষার জন্য রক্ত দিয়েছে। তারুণ্যের অসীম সাহস ও রক্তের বিনিময়ে অর্জিত ভাষার ইতিহাস পৃথিবীতে বিরল। কিন্তু দিনদিন ভাষার ব্যবহার বিকৃত হওয়ার কারণে বাংলা হারাচ্ছে তার নিজস্ব মর্যাদা। ভাষার মাসে এ নিয়ে কী ভাবছেন তরুণরা। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলে জানাচ্ছেন জান্নাতুল ফেরদৌস...
বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত চাই
ভাষা আন্দোলনে বাঙালির আত্মত্যাগের চেতনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। প্রযুক্তির এ যুগে দেখা যায়, বাংলা ভাষার বানান কিংবা অর্থ বিকৃতভাবে ব্যবহার করা হয়। এমনকি বাংলা ভাষার সঙ্গে ইংরেজি ভাষা মিলিয়ে শব্দ নির্মাণ অহরহ ঘটছে। ভগ্ন থেকে ভগ্নিত বাংলা ভাষার করুণ রূপ কোনোভাবেই প্রত্যাশিত নয়। বর্তমানে একুশে চেতনা যেন কেবল ফেব্রুয়ারি মাসে খালি পায়ে প্রভাতফেরির সঙ্গে জেগে ওঠে আর ফেসবুক স্ট্যাটাসের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। যেখানে তরুণরা দেশের অগ্রপথিক, সেখানে সেই আলোকবর্তিকাদের ঠিক এখনি জেগে উঠতে হবে। বাংলা ভাষার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং শুধু ভাষার মাসে নয় সারা বছর এই চেতনায় বুক বেঁধে তরুণরা গর্জে উঠুক।
সাবিহা তাসমিম,
ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন সায়েন্সেস, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলা হোক দূষণমুক্ত
১৯৯৯ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি দেওয়ার মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে বাংলা ভাষার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু অধুনা বাংলাদেশে শুদ্ধ বাংলা ভাষার প্রয়োগ ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে বর্তমান প্রজন্মের কাছে। আজকাল বাংলা-ইংরেজির এক অদ্ভুত মিশ্রণে বাংলাকে দূষিত করা হচ্ছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠদানের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেওয়া হচ্ছে ইংরেজি ভাষাকে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একজন ছাত্র হিসেবে আমি যখন আমার বিষয়সংশ্লিষ্ট লেখাগুলো নিয়ে পড়তে চাই, সেগুলোর বেশির ভাগই ইংরেজিতে থাকে তাই অন্য ভাষার গুরুত্বপূর্ণ লেখাগুলো বেশি বেশি করে বাংলায় অনুবাদ হওয়া উচিত। স্বাধীন বাংলাদেশে এখনো আদালতের রায় ইংরেজিতে লেখা হয়। সারা বছর ‘বাংলা’ ঘরের এক কোনে পড়ে থাকে অযত্ন-অবহেলায়। এই ফেব্রুয়ারিতে আমাদের প্রত্যাশা হোক একটি দূষণমুক্ত বাংলা ভাষা পাওয়ার।
নাহিদ হাসান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সর্বত্র দাপ্তরিক ভাষা হোক বাংলা
আদালত থেকে এক আদেশ এসেছিল যে, এক মাসের মধ্যে দেশের সব সাইনবোর্ড, বিলবোর্ড, ব্যানার, গাড়ির নম্বর প্লেটসহ গণমাধ্যমে ইংরেজি বিজ্ঞাপন ও মিশ্র ভাষার ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। আদৌ কি সেই আইনের বাস্তবায়ন দেখতে পাচ্ছি? মিশ্র বা বিদেশি ভাষার যত্রতত্র ব্যবহার নজরে আসে এখনো। কাপড়ের দোকান থেকে শুরু করে মুদি দোকান বা বড় বিপণি কেন্দ্রে চোখ বুলালেই দেখা যায় বিদেশি ভাষায় নামকরণের ছড়াছড়ি। বিদেশি ভাষা ব্যবহারের এই মহোত্সব যেন সেসব দোকানকে উচ্চ শ্রেণিতে উন্নীত করে! এমন ধ্যানধারণা ও আইনের প্রয়োগহীনতা নতুন প্রজন্মকে ভুলপথে নিয়ে যাবে এটা বলার অপেক্ষা রাখে না। একুশের চেতনা, ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগের মূল্যায়ন দিনদিন অপমানিত হচ্ছে আমাদের কাজেকর্মে—এই বোধটা যত তাড়াতাড়ি আমাদের মধ্যে আসবে, সাংস্কৃতিক বন্ধ্যাত্ব তত তাড়াতাড়ি দূর হবে।
মো. মোহাইমিন হোসেন সোয়েব,
বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়
নিজস্ব মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হোক বাংলা
এখন শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে আর কেউ তাদের সন্তানদের উত্সাহ দেওয়ার উত্সাহটাও খুঁজে পায় না। ওমা, বাংলায় কেউ পড়ে নাকি! বাংলায় পড়ে ভাত পাবি? কথায় কথায় দু-চারটা ইংরেজি, হিন্দি না বললে সে আবার কিসের শিক্ষিত! এ ধরনের কথা অহরহ শোনা যায়। কিন্তু শেকড়ের সন্ধান আমাদের শেকড় থেকেই করতে হবে। শিক্ষিত, রুচিবোধসম্পন্ন, মেধাবী হওয়ার মানদণ্ড শুদ্ধ মাতৃভাষার পারদর্শিতায় ও তো করা যায়। আমরা বাঙালি বাংলায় কথা বলতে না পারলে এই পরিচয়টাও যে মিথ্যে। আমি, আপনি, আমরা মিলেই সমাজ। আমি, আমরা বাংলাকে সম্মান করলে ভালোবাসলে সমাজও বাংলাকে ভালোবাসবে, সম্মান করবে এবং বাংলা তার নিজস্ব মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হবে।
মরিয়ম আক্তার, ইংরেজি বিভাগ, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
