ইট, রুনার জীবন ও আইন উপেক্ষা

আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২২:০৪

পিরোজপুরের ইন্দুরকানী হইতে বাইশ বত্সরের তরুণী রুনা আক্তার ঢাকা আসিয়াছিলেন একটুখানি নিশ্চিত জীবনের আশায়। কাজও জুটাইয়া লইয়াছিলেন একটি তৈরি পোশাক কারখানায়। স্বামী ও সন্তান লইয়া কোনো এক ভাবে চলিয়া যাইতেছিল জীবন। কিন্তু বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো হঠাত্ একটি ইট আসিয়া রুনার জীবনপ্রদীপ এক ফুত্কারে নিভাইয়া দেয়। মা-হারা হইয়া যায় তাহার ছোট্ট শিশুটি। ঘটনাটি গত সোমবার সকালে রাজধানীর যাত্রাবাড়ী থানাধীন মমিনবাগে ঘটে। সেইখানে একটি নির্মাণাধীন ভবনের নিচের রাস্তা দিয়া হাঁটিয়া যাইবার সময় রুনার মাথায় ইট ভাঙিয়া পড়ে।

কতখানি অসচেতন এবং উদাসীন হইলে নির্মাণাধীন ভবনের ইট নিচে পড়িতে পারে, তাহা অচিন্তনীয়। ইহা তো এক ধরনের হত্যাও বটে। একটি নির্মাণাধীন ভবনের নিচে যদি পথ চলাচলের রাস্তা থাকে, তাহা হইলে যাবতীয় সুরক্ষাব্যবস্থা না লইয়া সেই ভবন নির্মাণ করিবার অর্থ হইল, দুই একটি মানুষ যে কোনো সময় দুর্ঘটনার শিকার হইয়া মৃত্যুবরণ করিবে। নির্মাণাধীন ভবনের ইট মাথায় পড়িয়া গত ১০ বত্সরে কতসংখ্যক পথচারী নিহত হইয়াছেন, তাহা অনুসন্ধান করিতে গিয়া দেখা গেল, ইহার সংখ্যা শত ছুঁইবে। অর্থাত্ এই শতপ্রাণ নিহত হইয়াছে একেবারেই মিছামিছি, কিছু বুঝিবার আগেই তাহাদের মাথায় যেন আস্ত আকাশ ভাঙিয়া পড়িয়াছে। এইভাবে হঠাত্ মৃত্যু মানিয়া লওয়া যায় না। মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যুর অধিকার এইভাবে পদে পদে দলিত হওয়াটা যাহার পর নাই দুঃখজনক। রাজধানী ঢাকার জনঘনত্ব বিশ্বে সর্বাধিক। বেশির ভাগ রাস্তাঘাটে মানুষজন পিপীলিকার মতো কিলবিল করে। সুতরাং একটুখানি অসচেতনতায় কিংবা ভুলে নির্মাণাধীন যে কোনো ভবন হইতে একটি ইট খসিয়া পড়িলে তাহা যে কোনো পথচারীর মাথায় পড়াটাই স্বাভাবিক। ইহা নির্মাণাধীন ভবনের কর্তৃপক্ষও খুব ভালো করিয়া জানেন। তাহার পরও তাহারা কী করিয়া নিয়মমাফিক সুরক্ষাব্যবস্থায় গলদ রাখেন? এই তো মাত্র কয়েক সপ্তাহ পূর্বেই সরকার এই ব্যাপারে নূতন বিধিমালা তৈরি করিয়াছে। সংশোধিত বিধিমালায় বলা হইয়াছে, নির্মাণস্থানে যথাযথ অস্থায়ী ছাউনি বা বেষ্টনী স্থাপনসহ নির্মাণাধীন ভবন ঢাকিয়া রাখিতে হইবে। নির্মাণসামগ্রী, যথা—ইট, মাটি, বালি, রড, সিমেন্ট খোলা রাখা যাইবে না। বিধিমালায় আরো বলা হইয়াছে, নির্মাণ, পুনর্নির্মাণ বা মেরামতস্থলের আশপাশে দিনে কমপক্ষে দুই বার পানি ছিটাইতে হইবে এবং পারিপার্শ্বিক পরিচ্ছন্নতাসহ যথাযথ বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করিতে হইবে। আর এই বিধিমালা না মানিলে সর্বোচ্চ এক বত্সরের কারাদণ্ড বা ১ লক্ষ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড দেওয়া হইবে; একই অপরাধ দ্বিতীয় বার করিলে সাজা হইবে দ্বিগুণ। এমন শাস্তির বিধান রাখিয়া ‘পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭’ সংশোধন করিয়া সম্প্রতি সরকার গেজেটও প্রকাশ করিয়াছে।

বিধিমালার কিছু নিয়ম তো আগেও ছিল, নূতন করিয়া না হয় সংশোধন করা হইল, কিন্তু নির্মাণাধীন অবকাঠামোর কর্তৃপক্ষ তাহা যথাযথভাবে মানিয়া চলিতেছে কি না, সেই বিষয়টি কি রুনার মতো কাহারো মৃত্যুর মাধ্যমে জানিতে হইবে? কেবল তো মৃত্যুই নহে, নির্মাণকাজ চলিবার সময়ে বাতাসে ভাসমান ধূলিকণার (পিএম ১০) পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে দেখা যায়। একটি গবেষণায় জানা গিয়াছে, ঢাকার বাতাসে দূষিত বস্তুকণার পরিমাণ সহনীয় মাত্রার চাইতে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি। ইহার অন্যতম কারণ নির্মাণসামগ্রীর সুরক্ষাব্যবস্থা মানিয়া না চলা। এই জন্য বায়ুদূষণে ঢাকা পৃথিবীতে দ্বিতীয় স্থানে রহিয়াছে। বায়ুদূষণে সরাসরি মৃত্যু ঘটে না বলিয়া আমরা কি তাহার গুরুত্ব কম অনুধাবন করিতে পারি? মৃত্যু বায়ুদূষণে হোক অথবা মাথায় ইট পড়িয়া হোক—আমরা চাই না রুনাদের সংখ্যা আর একটিও বাড়ুক।