একটু ভালো জীবনযাপনের আশায়, পরিবারের সদস্যদের সুখে রাখতে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় বাংলাদেশ থেকে জীবিকার সন্ধানে পৃথিবীর উন্নত দেশে পাড়ি জমাচ্ছেন এদেশের বহু মানুষ। একটা সুন্দর জীবনের জন্য বিদেশে পাড়ি জমানোর এই যাত্রায় অনেকেই যাচ্ছেন বৈধ উপায়ে। তবে বৈধ উপায়ের চেয়ে অবৈধভাবে বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা ঝুঁকিতে ফেলছে মানবজীবন। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের আয় যে বিরাট ভূমিকা রাখছে, তা এই করোনাকালে প্রমাণ পাওয়া গেছে আবারও। স্মরণকালের সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছে এই করোনা মহামারির সময়ে। প্রবাসীরা উপার্জনের পুরোটাই অনেকাংশে পাঠিয়েছেন বাংলাদেশে। তবে রেমিট্যান্স হিসেবে পরিচিত এই অর্থের পেছনে এখন ছুটছেন অনেক বাংলাদেশি—কেউ বৈধ পথে, কেউবা অবৈধ পথে। যারা এই অবৈধ পথ বেছে নিচ্ছেন, তাদের এই যাত্রাপথ নিরাপদ হচ্ছে না। নিরাপদ হওয়ার কথাও নয়। বলতে গেলে প্রাণ হাতে করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেক বাংলাদেশি ছুটছেন ইউরোপের দেশে, যার প্রাথমিক গন্তব্য বাংলাদেশ থেকে শুরু হয় এবং মধ্যখানে যাত্রাবিরতি হয় লিবিয়ায়। সেখান থেকেই ইতালি, গ্রিস কিংবা লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল, মেক্সিকো হয়ে আমেরিকা অথবা ভূমধ্যসাগরের মরণবোটে করে অন্য কোনো দেশে। সহজ চোখে এই যাত্রাকে মরণযাত্রা হিসেবেই বিবেচনা করা হয়।
মানব পাচারের রুট
মানব পাচারের সিন্ডিকেট বাংলাদেশের সব পথেই অপতত্পরতা চালিয়ে যাচ্ছে। পাচারকারীরা বাংলাদেশের টেকনাফ হয়ে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ডে অবৈধ প্রবেশের একটি রুট প্রায়ই ব্যবহার করছে। পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ঝুঁকিপূর্ণভাবে সাগরপথে প্রায় ৫০ হাজার লোক মালয়েশিয়ায় পাচার হয়। কাউকে আবার থাইল্যান্ডের গহিন জঙ্গলে আটকে রাখার পর ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দেওয়ার ঘটনাও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে সাড়া ফেলেছে। বাংলাদেশ দিয়ে সমুদ্রপথে যারা মালয়েশিয়া বা থাইল্যান্ডে গেছে, তাদের বেশির ভাগই রোহিঙ্গা।
বৈশ্বিক চিত্র কী বলছে?
করোনা মহামারির সময়েও ইতালি ও লিবিয়ার অংশে ভূমধ্যসাগরে অভিবাসন-প্রত্যাশীদের উদ্ধারের ঘটনায় অনুমান করা যায় যে এর বিস্তার থেমে নেই। মানব পাচারের ঘটনা বিশ্ব জুড়ে কমার কোনো সম্ভাবনা কি আছে? মানব পাচার নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলোর তথ্য বলছে, শুধু বাংলাদেশই নয়, ঝুঁকিপূর্ণভাবে ভূমধ্যসাগর অতিক্রম করে প্রতি বছর হাজার হাজার আফ্রিকান অবৈধভাবে পাড়ি জমাচ্ছে ইউরোপে। আর প্রতারণার শিকার হয়ে ভূমধ্যসাগরের নীল জলে সলিলসমাধিও ঘটছে অনেকেরই। জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশন বলছে, প্রতি বছর প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ মানুষ বিভিন্নভাবে পাচারের শিকার হচ্ছে। মানব পাচারসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত ব্যক্তিরা সংকটকালে বেশি সক্রিয় থাকে। এবার করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ তাদের জন্য নতুন সুযোগ করে দিয়েছে। মহামারির কারণে সারা বিশ্বের অর্থনীতি পর্যুদস্ত। নিয়মিত অভিবাসনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে। এটাকে পুঁজি করে পাচারকারীরা ভূমধ্যসাগরে মানব পাচারে বেশ সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এখনই সময় তাদের থামানোর।
পাচার রোধে বাংলাদেশের অবস্থান কোথায়?
মানব পাচার রোধে বাংলাদেশ সরকার ২০১২ সালে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন নামে একটি শক্তিশালী আইন প্রণয়ন করেছে। এই আইনে পাচারকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারণ করা হয়। এই আইনের অধীন কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে যে কোনো ব্যক্তি পুলিশ অথবা ট্রাইব্যুনালের কাছে অভিযোগ দায়ের করতে পারবেন। এ অপরাধ কমাতে সেই সঙ্গে দ্রুত বিচারের উদ্দেশ্যে সরকার যে কোনো জেলায় মানব পাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠন করতে পারবে। এছাড়া বাংলাদেশ সরকার ভারতের সঙ্গে মানব পাচার রোধে একটি সমঝোতা স্মারকেও স্বাক্ষর করেছে। সেই সঙ্গে মানব পাচার রোধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পালেরোমা চুক্তি নামে একটি আন্তর্জাতিক প্রটোকল প্রণয়ন করা হয়েছে। ১৩৩টি দেশ সেই প্রটোকলে স্বাক্ষর করেছে। এই প্রটোকলে মানব পাচার রোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মানব পাচারের সঙ্গে সম্পর্কিত অপরাধ প্রতিহত করা, অপরাধীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা এবং মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিদের সহায়তা করাই এই প্রটোকলের মূলনীতি। যদিও মানব পাচার রোধের জন্য আন্তর্জাতিক সমাজের পদক্ষেপ খুব একটা প্রত্যাশিত ফল পায়নি। মাফিয়া চক্রগুলো উত্স দেশ ও ট্রানজিটভুক্ত দেশের সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে এখনো এই অমানবিক ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে এবং হাজার হাজার কোটি ডলার অবৈধভাবে আয় করছে।
আলোচনায় লিবিয়া
লিবিয়া দিয়ে মানব পাচারে দেশি-বিদেশি শক্তিশালী গোষ্ঠী জড়িত। এদের খুঁটি এতটাই শক্তিশালী যে, ত্রিপোলিতে বাংলাদেশের কূটনীতিকদেরও হুমকি দিয়েছে তারা। মানব পাচারের এই চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিভিন্ন দেশ ও জাতিসংঘের মতো সংস্থাকে নিয়ে বাংলাদেশকে আরো বলিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে।
লিবিয়ার বিভিন্ন অংশে তো বটেই, মানব পাচারকারীর দালালেরা যেসব দেশ হয়ে অভিবাসন-প্রত্যাশীদের নিয়ে আসে, সেখানে বেশ সক্রিয় থাকে তারা। তাই এদের প্রতিহতের চেষ্টাটা সবাইকে মিলেই করতে হবে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ও স্থানীয় লোকজনকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। মানব পাচারের শিকার হওয়া লোকজনের কাছ থেকে পাচারকারী ও দালালদের পরিচয় জানার পর তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা, বিশেষ করে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা এবং যথাসম্ভব দ্রুত বিচার করে আইনের শাসন নিশ্চিত করা গেলে পাচারকারীরা হয়তো কিছুটা থামবে। এর সঙ্গে জনসচেতনতা তৈরি করতে পারলেই কার্যকর নিয়ন্ত্রণের দিকে আমরা এগিয়ে যাব।
n লেখক :সাবেক র্যাব কর্মকর্তা
