রহস্য গল্প

ডুবুরি

আপডেট : ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২০:৫২

কাউয়ার মোড়। নাম শুনে মনে হতে পারে স্থলভূমির কোনো মোড়ের নাম বুঝি। যেখানে এসে মিলিত হয়েছে তিন বা চার কিংবা তারও অধিক রাস্তা। যেখানে চা-স্টল আছে, দোকানপাট আছে, গভীর রাত অবধি লোকজনের আড্ডা আছে। কিন্তু বাস্তবে রাস্তা বা দোকানপাটের কোনো সম্পৃক্ততাই নেই এই মোড়ের সঙ্গে। সম্পৃক্ততা আছে পানির, সম্পৃক্ততা আছে বিলের। হাজির বিল এবং লাল শাপলার বিলের সংযোগস্থলে যে বাঁক, এলাকাবাসীর কাছে এই বাঁকটাই কাউয়ার মোড় নামে পরিচিত।

এলাকাবাসীর কাছে কাউয়ার মোড় এখন এক রহস্যের নাম, আতঙ্কের নাম। কারণ, প্রতি বর্ষার মৌসুমে এখানে পাঁচ থেকে সাতবার নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। এই আতঙ্ক, এই রহস্য চিন্তায় ফেলে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসনকে। তাই তারা নানাভাবে চেষ্টা করছে রহস্যের জট খুলতে। এই চেষ্টারই অংশ হিসেবে থানায় ডাকা হয় সোর্স কাঞ্চনকে। পুলিশ কর্মকর্তা আলী আশরাফের অনেক চাপাচাপি এবং ধমকাধমকির পর সে কেবল একটা নাম প্রকাশ করে—আবদুল লতিফ ভুঁইয়া। ব্যস, এইটুকুই। পর্যাপ্ত ধমকাধমকির পরও আর কোনো তথ্য বের করা সম্ভব হয় না তার মুখ থেকে।

আলী আশরাফ বিদায় করে দেন কাঞ্চনকে। আর ফোনে অধীনস্থদের আদেশ দেন লতিফ ভুঁইয়াকে খুঁজে বের করার জন্য। তারপর বিষয়টা নিয়ে গভীরভাবে ভাবার জন্য চোখ বন্ধ করতেই কারো পায়ের আওয়াজ শুনতে পান। চোখ খুলে দেখেন অপরিচিত একজন দাঁড়িয়ে আছে তার টেবিলের সামনে। মাথায় লম্বা চুল। গোঁফের আগা তলোয়ারের ডগার মতো বাঁকা। আগন্তুক চেয়ারে বসে রুমটা ভালো করে দেখেন। তারপর নিজের নাম বলেন। এবার চোখ কপালে উঠে যেতে চায় আলী আশরাফের। আগন্তুক বলে—এত তাজ্জব হওয়ার কিছু নাই স্যার। আমিই সেই লোক, আপনেরা যারে খুঁজবেন বইলা ঠিক করছেন। আবদুল লতিফ ভুঁইয়া। আপনের লোকজনে আমারে খুঁইজা পাইবো না। কারণ আমি...। যাক, আপনে ভালো আছেন তো?

আলী আশরাফের বিস্ময় কাটতে চায় না। তিনি নিজের ওপর জোর খাটান এবং চেহারা যতটা সম্ভব বিস্ময়মুক্ত করে লতিফ ভুঁইয়ার প্রশ্নের জবাব দেন। তারপর জিজ্ঞেস করেন—কাউয়ার মোড়ের ব্যাপারে আপনি কী জানেন?

—জায়াগাটা ভালা না। ভালা জায়গা হইলে কি আর এতবার নৌকাডুবি হয়?

—ভালো না বলতে?

—ভালা না বলতে খারাপ। খারাপ বলতে মন্দ।

আলী আশরাফ অনুরোধ করেন কোনো প্রকার চালাকি না করার জন্য। লতিফ ভুঁইয়া চায়ের কাপ হাতে নেয়। বলে—আইনের লোকের সাথে যেয় চালাকি করে, সে চালাক না। রামবলদ। আমার চালাকি করারও ইচ্ছা নাই, রামবলদ সাজারও ইচ্ছা নাই। আমি সবার মঙ্গল চাই। আপনেরও মঙ্গল চাই। আর মঙ্গল চাই বইলাই অনুরোধ করতাছি, কাউয়ার মোড়ের ব্যাপারে নাক গলাইয়েন না।

এবার আর নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন না আলী আশরাফ। ঠাস করে একটা থাপড়/// মারেন টেবিলে। বলেন—আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না, আপনার জন্য কী ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষা করছে। পাঁচ মিনিটের মধ্যে আপনি গাছে ঝুলে যাবেন।

—কিন্তু আমার কথা শেষ হইতে যদি পাঁচ মিনিটের বেশি সময় লাগে? না, মানে জানতে চাইছিলাম কথার মাঝখানেই আমারে গাছে ঝুলায়া ফালাইবেন নাকি।

আলী আশরাফ মেজাজের লাগাম টেনে ধরেন। তারপর টেবিলে কনুই গেড়ে বসে শীতল চোখে তাকান লতিফ ভুঁইয়ার দিকে। শীতল চোখকে আজ আর গরম হতে দেবেন না, এই প্রতিজ্ঞা নিয়েই তাকান। লতিফ ভুঁইয়া বলেন—আপনেরা কাউয়ার মোড়ে যতবার তদন্ত চালাইছেন, উপরে উপরেই চালাইছেন। যদি ভিতরে ঢুকতেন, তাইলে কবেই আসল রহইস্য বাইর হয়া যাইত। কাজে ফাঁকিবাজি করবেন আপনেরা, আর মিজাজ দেখাইবেন আমার লগে, এইটা  কিন্তু ঠিক না।

টেনে ধরে রাখা আলী আশরাফের মেজাজের লাগাম ফসকে যেতে চায়। তার হাত নিশপিশ করতে থাকে। লতিফ ভুঁইয়া বলে—বুঝতে পারতেছি স্যার, আমারে আপনের পিডাইতে মন চাইতাছে। আইচ্ছা, পিডাইয়েন। আগে কথা শেষ করি। এই যে আমি কইলাম ভিতরে ঢোকার কথা, কিসের ভিতরে ঢোকার কথা কইছি জানেন? পানির ভিতরে। আপনেরা কি কোনোদিন কাউয়ার মোড়ের পানিতে ডুব দিয়া দেখছেন ভিতরে কী অবস্থা? স্বাভাবিক অবস্থা, নাকি খারাপ অবস্থা? অবশ্যই খারাপ অবস্থা থাকার কথা। নইলে কয়দিন পরে পরে নৌকা ডুববো ক্যান?

আলী আশরাফের হাতের নিশপিশানি থেমে যায়। তিনি লতিফ ভুঁইয়াকে প্রশ্ন করতে চান। কিন্তু কী প্রশ্ন করবেন, বুঝে উঠতে পারেন না। তাই কেবল ঠোঁট কামড়াতে থাকেন। লতিফ ভুঁইয়া বলে—আপনের সোর্স আপনেরে বলছে কি না জানি না। আমি কিন্তু একটা কাজ করি। আর কাজটা করি খুব গোপনে। যেই কারণে বেশি মানুষে জানে না। যেমন আপনেও জানেন না। কিন্তু না জানলে তো চলবো না। এই জন্য এখন জানবেন। জানাইতেই আসছি। আসলে আমি অইন্য ধরনের একটা কাজ করি। ডুবুরির কাজ।

আলী আশরাফের চোখের আকার বড় হয়ে যায়। তিনি বিস্ময়কর বস্তু দেখার মতো লতিফ ভুঁইয়াকে দেখেন। বিশেষ করে তার ভুঁড়িটা। লতিফ ভুঁইয়া একগাল হেসে বলে—আমি কিন্তু বুইঝা ফালাইছি আপনে কী চিন্তা করতাছেন। আপনে চিন্তা করতাছেন এত বড় ভুঁড়ি নিয়া এই লোক ক্যামনে পানির নিচে যায়, ক্যামনে ডুবুরির কাজ করে। শোনেন, যারা জান-গতরের দিক দিয়া হালকা-পাতলা, তারা যদি ডুবুরির কাজ করে, তাইলে একটা সমস্যা হয়। খালি পানির উপরে ভাইস্যা ওডে। পাতলা জিনিস না? ভাইস্যা তো উঠবোই। আমার ভুঁড়ি বড়, আমার শইলও ভারী। এই জন্য আমি একবার পানির নিচে ডুব দিলে আর ভাসার নাম মুখে নেই না।

গর্জন করতে ইচ্ছে হচ্ছে আলী আশরাফের। এদিকে বেড়ে যাচ্ছে হাতের নিশপিশানিও। তবু তিনি চোখ বোজেন। কিছুক্ষণ বসে থাকেন অন্ধের মতো। তারপর চোখ খুলে নরম গলায় অনুরোধ করেন অপ্রয়োজনীয় কথা না বলে কাজের কথা বলার জন্য। লতিফ ভুঁইয়া বলে—আমি এখন পর্যন্ত যা বলছি, সবগুলা কথাই দরকারি। সময়মতো সেইটা বুঝতে পারবেন। যা বলতেছিলাম। আমি কিন্তু নদীতে ডুবুরির কাজ করি না। করি সমুদ্রে। কিন্তু যখন কেউ খুব জোর-জবরদস্তি করে, অনুরোধ করে, তখন আর ‘না’ করতে পারি না। নদীতেও নাইমা পড়ি।

—মনে করেন আমি আপনাকে জোর-জবরদস্তি করছি। অনুরোধ করছি। অতএব দয়া করে বলেন কাউয়ার মোড়ের নৌকাডুবির সঙ্গে আপনার কী সম্পর্ক। দয়া করে বলেন, প্লিজ। মানুষের কিন্তু ধৈর্যের একটা লিমিট আছে। এছাড়া সময়েরও দাম আছে। আপনি আমার এতটা সময় নষ্ট করতে পারেন না। প্লিজ বলেন।

লতিফ ভুঁইয়া কাশি দিয়ে গলায় জমে থাকা কফ পরিষ্কার করে নিয়ে বলে—কোনো ঘটনার সাথে একজনের সম্পর্ক থাকতে পারে দুইভাবে। সরাসরি সম্পর্ক, আর হইল ঘোরাইন্না প্যাঁচাইন্যা সম্পর্ক। কাউয়ার মোড়ের নৌকাডুবির সাথে আমার যেই সম্পর্কটা আছে, সেইটা ঘোরাইন্না প্যাঁচাইন্যা না। সরাসরি। এখন তো জিগাইবেন সরাসরি বলতে কেমন সরাসরি। হ, জিগাইতেই পারেন। আপনের জায়গায় আমি হইলে আমিও জিগাইতাম।

আলী আশরাফের মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হয় না। তিনি আসলে চাচ্ছেন না কিছু বলে লতিফ ভুঁইয়ার কথায় ব্যাঘাত ঘটাতে কিংবা তাকে আবারও অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বলার সুযোগ করে দিতে। তার চাওয়া, সে ঝটপট কথা শেষ করুক। লতিফ ভুঁইয়া হাস্যোজ্জ্বল মুখে আলী আশরাফের দিকে তাকিয়ে বলে—একটা বিষয় তো মনে হয় আপনে খিয়াল করছেন। কোনো জায়গায় নৌকাডুবি হওয়ার পরে সেইখানে ডুবুরি নামাইলে নৌকায় যত মালামাল ছিল, মোটামুটি সবগুলাই পাওয়া যায়। কিন্তু কাউয়ার মোড়ের নৌকাডুবিগুলা ব্যতিক্রম। এইখানে ডুবুরি নামায়া কোনোদিনই কোনো মাল উদ্ধার করা যায় নাই। কারণ কী?

কথা না বাড়িয়ে কারণটা বলে ফেলার নির্দেশ দেন আলী আশরাফ। কিন্তু লতিফ ভুঁইয়া স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, আজ আর সে কিছুই বলবে না। পরে বলবে। সেটা আগামীকালও হতে পারে, পরশু কিংবা তার পরেরদিনও হতে পারে। আলী আশরাফের ইচ্ছে হয় দরজা আটকে দিতে। যাতে লতিফ ভুঁইয়া বের হতে না পারে। কিন্তু তিনি নিজের চেয়ার ছাড়েন না। কারণ তার মনে এই ভাবনা চলে আসে—আটকে রাখলেই যে সব কথা বের করা যাবে, তা না। এছাড়া যে লোকটা স্বেচ্ছায় থানায় আসতে পেরেছে, সে সবকিছু বললেও স্বেচ্ছায়ই বলবে। গায়ের জোরে কথা আদায় করতে গেলে হিতে বিপরীত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।

লতিফ ভুঁইয়া চলে যায়। আর আলী আশরাফ সিগারেট ধরান। কিছুক্ষণের মধ্যেই ধোঁয়ায় ভরে ফেলেন পুরো রুম। ফ্যানের বাতাসে রুম জুড়ে ধোঁয়া ঘোরে আর তার মাথা জুড়ে ঘোরে চিন্তা। কাউয়ার মোড়কেন্দ্রিক হরেক চিন্তা। পরদিন খুব সকাল সকাল থানায় আসেন তিনি। কিন্তু রুমে ঢুকতে পারেন না। জরুরি ফোন পেয়ে ফোর্সসহ তড়িত্ রওনা হয়ে যান কাউয়ার মোড়ের উদ্দেশে। কাউয়ার মোড়ে তখন শত শত মানুষের ভিড়। এই ভিড়ের ভেতর ঢুকতেই চোখ ভয়ার্ত হয়ে ওঠে আলী আশরাফের। তিনি পলকহীন তাকিয়ে থাকেন আলকাতরার মতো কালো পানিতে ভাসতে থাকা সোর্স কাঞ্চনের লাশের দিকে।

লাশ থানায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেই হন্যে হয়ে লতিফ ভুঁইয়ার বাড়ির দিকে ছোটেন আলী আশরাফ। অনেক কষ্টে যখন তিনি বাড়িটা খুঁজে পান, তখন পড়ন্ত দুপুর। তাকে দেখে ছিপছিপে গড়নের একটা ছেলে এগিয়ে আসে। বয়স চৌদ্দ-পনের। আলী আশরাফের প্রশ্নের মুখে ছেলেটা জানায়, সে লতিফ ভুঁইয়ার নাতি। তিনি জিজ্ঞেস করেন তার দাদা কোথায়। ছেলেটা যেন প্রশ্নটা বুঝতে পারে না। সে তাকিয়ে থাকে ড্যাবড্যাব করে। আলী আশরাফ ধমক দেন। ঝাঁঝালো গলায় সন্ধান চান লতিফ ভুঁইয়ার।

এবার ছেলেটা আলী আশরাফকে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে গিয়ে দাঁড়ায় একটা পুরনো বাঁধানো কবরের পাশে। তারপর আঙুল তাক করে এপিটাফের দিকে। যেখানে লেখা— ‘মৃতের নাম : ডুবুরি আবদুল লতিফ ভুঁইয়া। মৃত্যু : ২২ জুন, ১৯৮২’। বিস্ময়ে যেন চিত্কার করে উঠতে চান আলী আশরাফ। কিন্তু ছেলেটার জন্য পারেন না। কারণ, সে তাকিয়ে আছে আগের মতোই ড্যাবড্যাব করে। আলী আশরাফ আবার চোখ ফেরান এপিটাফের দিকে। তিনি বুঝতে পারেন না, মৃত্যু-তারিখটা কেন তার কাছে পরিচিত মনে হচ্ছে।

থানায় ছোটেন আলী আশরাফ। আর ফাইল ঘেঁটে আবিষ্কার করেন, কাউয়ার মোড়ে সর্বপ্রথম নৌকাডুবি হয়েছিল ১৯৮২ সালের ২২ জুন।