মা হ বু ব আ ল ম
মহাভারতের বিভিন্ন চরিত্র নিয়ে অনুরাগ ও ভালোবাসা কখনো সময়ের আবর্তনে পানসে হয়ে যায়নি। প্রবন্ধের তথ্য সমৃদ্ধতার খাতিরে বলতেই হচ্ছে বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের নাট্যমঞ্চে যে কয়টি নাটক এখনো জনপ্রিয়তার তুঙ্গে তার অন্যতম দেশ নাটকের প্রযোজনা নাট্যকার মাসুম রেজার মহাভারতের আশ্রয়ে রচিত ‘নিত্যপুরাণ’। সেখানে একলব্য বা দ্রৌপদী স্বপ্নের চরিত্র হয়ে ওঠে। শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও মহাভারতের চরিত্রগুলো এখনো অনেক চমকপ্রদ—সমসাময়িক। নিজ চরিত্রকে অনেক সময় সেইসব চরিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে নিতেও বেশ স্বাচ্ছন্দ্য হয়। মহাভারতের তেমনি এক চরিত্র শকুন্তলা। মহাভারতে শকুন্তলা ছোট্ট পরিসরে স্থান পেলেও নাটকের মাধ্যমে চরিত্রটা আসলে মহাকবি কালিদাসের সৃষ্টি। যাহোক, সেই আমল থেকে নানা হাত ঘুরে, নানা পথ পেরিয়ে, নানা ভাষা মাড়িয়ে শকুন্তলা বাংলায় এসে উপস্থিত হয় বাংলা গদ্যের জনক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কাছে। ঠাকুর পরিবারের অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিশু শকুন্তলাকে তুলে ধরেন এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও দু-চার কথা লিখেছেন তাকে নিয়ে। তার আগে শকুন্তলা বিদেশ-বিভুঁইয়ে কাটিয়েছে বেশি। এরপর বঙ্গদেশে বা বাংলা ভাষায় শকুন্তলাকে নিয়ে আর কাউকে মেতে উঠতে দেখা যায়নি। প্রাবন্ধিক অংশুমান ভৌমিকের পাঠ পরিশ্রম উপলব্ধি হয় তার বিভিন্ন তথ্য প্রদানে। প্রায় শত বর্ষ পেরিয়ে গেলে যিনি শকুন্তলাকে নতুন রূপে উপলব্ধি করলেন তিনি নাট্যাচার্য সেলিম আল দীন। তাঁর রচিত ও নির্দেশক নাসির উদ্দিন ইউসুফ নির্দেশিত শকুন্তলা হয়ে উঠল তখনকার বাংলাদেশের জনপ্রিয় একটি নাটক। ১৮৮ সন্ধ্যায় মঞ্চস্থ হলো নাটকটি। এই হলো মহাভারত থেকে নানা হাত বদলের মধ্যে দিয়ে বাংলায় সেলিম আল দীনের কাছে থিতু হওয়া শকুন্তলার গল্প। গত ১৮ জানুয়ারি বিকালে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির সেমিনার কক্ষে ঢাকা থিয়েটার আয়োজিত সেলিম আল দীন স্মরণে প্রবন্ধ পাঠ শেষে উপস্থাপক নাসির উদ্দিন ইউসুফ আনন্দে উচ্ছ্বসিত হন, কেননা এমন গুরুগম্ভীর বিষয়ের সেমিনারে তারুণ্যের উপস্থিতিই বেশি। আমরাও বেশ মনোসুখ অনুভব করলাম—এবার বুঝি মনের ভাব প্রকাশের সুযোগ মিলবে। কিন্তু বিধি বাম! আমাদের বয়জ্যৈষ্ঠরা আমাদের শ্রবণেন্দ্রীয় শক্তিশালী করে বাকযন্ত্রকে অচল করতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন হয় তো। আলোচনার সুযোগ যাদের মিলল তারা প্রত্যেকেই ন্যূনতম পঞ্চাশ পেরিয়ে। শকুন্তলার বঙ্গায়ন ও সেলিম সপর্যা নিয়ে আলোচনা সেকারণেই। যদিও সেলিম সপর্যার নামে কালিদাস বন্দনাতে মত্ততা লক্ষণীয় তবু ধরেই নিচ্ছি প্রয়োজনেই তা বেড়ে গেছে। গড়ের মাঠে কথা বলার সুযোগ না পেলে হয়তো পাড়ায় পাড়ায় চেঁচিয়েই বেড়াতে হয়! এবার প্রাবন্ধিক অংশুমান ভৌমিকের রচনার দু-একটা পয়েন্টে আলোচনা করে বিষয়গুলো যদি কিছুটা পরিষ্কার করা যায়। ধন্যবাদ অংশুমান ভৌমিককে সুন্দর একটি প্রবন্ধ উপস্থাপনের জন্য। প্রবন্ধের এক জায়গায় তিনি বলছেন— নাটক হিসেবে শকুন্তলার স্থানাঙ্ক সেলিম আল দীনের রচনাধারার এক অনিবার্য বাঁক। এখানে রচনাধারার ‘অনিবার্য বাঁক’ শব্দটা নিয়ে দ্বিমত পোষণ আবশ্যক মনে হচ্ছে, কেননা সেলিম আল দীনের এরপরের নাটক ‘কিত্তনখোলা’ এবং সর্বোপরি ‘কেরামতমঙ্গল’ বোধহয় সেই বাঁক অনিবার্যতা তৈরি করতে পেরেছে। সেখানে তাঁর নাট্যভাষা এবং রচনারীতি বাংলা নাট্যরীতিকেই উপস্থাপন করে। সেদিক থেকে শকুন্তলাকে সেলিমের নাট্য রচনাধারার প্রারম্ভ বললে ভুল বলা হবে বলে মনে হয় না। আবার নাট্যকার যেহেতু মহাভারতে পুনর্বার ফিরে না গিয়ে একেবারে নিজ ঘরে ঢুকে পড়েছেন; আবিষ্কারের চেষ্টা করেছেন হাজার বছরের ঐতিহ্য, তাই শকুন্তলা রচনা তাঁর নাট্যমানসের কৌতূহলী পদচারণাই মনে হয়।
