টঙ্গীর বৌবাজার এলাকায় রেলের জমি দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে স্থায়ী মার্কেট। প্রতিদিন এই রেলপথ ব্যবহার করে শতাধিক ট্রেন চলাচল করে এবং এই রেলক্রসিং দিয়ে প্রতিদিন যাতায়াত করে লক্ষাধিক মানুষ। অথচ এখানে লেভেল ক্রসিং বা প্রতিবন্ধকতা না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে রেলপথ পারাপার হন পথচারী।
প্রায়ই বৌবাজার এলাকায় রেলে কাটা পড়ে পথচারী নিহত হয়। রেলের দুইপাশ ও মাঝের অংশ দখল করে গড়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ বাজার। ঐখানকার ছোট-বড় প্রায় পাঁচ শতাধিক স্থায়ী-অস্থায়ী দোকান থেকে প্রতি মাসে কয়েক লাখ টাকা চাঁদা তুলছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র। বছরে এই চাঁদার পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা। এর একটি অংশ যাচ্ছে রেলওয়ে পুলিশের অসাধু কয়েক জন কর্মকর্তার পকেটে।
শুধুবাজার নয়, রেলওয়ের জায়গা দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে বস্তি, রিকশার গ্যারেজ ও স্থায়ী মার্কেট। কিছু কিছু জায়গায় টিনের ঘের দিয়ে স্থাপনা নির্মাণ করে দখল পাকাপোক্ত করেছে দখলকারীরা। দোকান ভাড়া দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে চক্রটি। জানা গেছে, বৌবাজার এলাকায় রেললাইনের মাঝে এবং দুইপার্শ্বে দোকানভাড়া নেওয়ার জন্য চক্রটিকে অগ্রিম বাবদ দিতে হয় সর্বনিম্ন ৩০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত। প্রতিদিন এসব দোকান ও বিট থেকে ১০০-২০০ টাকা চাঁদা তোলা হয়। এ ছাড়া বিদ্যুৎ বিল বাবদ লাইটপ্রতি নেওয়া হয় দৈনিক ৫০ থেকে ১০০ টাকা।
সূত্র জানায়, বৌ-বাজার এলাকার রেলের জায়গা থেকে প্রতিদিন একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তির নামে চাঁদা তোলা হয়। এরা হলেন—৪৫ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সদস্য সচিব গাজী সালাহউদ্দিন, যুগ্ম আহ্বায়ক কবির বেপারি, শহিদ গাজী, বিএনপি নেতা সুমন সরকার, আরফান ওরফে ফেন্সি আরফান, পালসার বাপ্পি, আরিফ, শাহাবউদ্দিন, মোমেন সরকার, হাবিবুর রহমান, আব্বাস, শামসুউদ্দিন, মোশারফ, জুলহাসখান, কাউসার ও রাশেদুল।
অবৈধভাবে গড়ে ওঠা এসব দোকান ও স্থাপনা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছেন এরা। স্থানীয় বাসিন্দা ও দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রেললাইনের পূর্ব-দক্ষিণ পাশ ঘেঁষে সরকার বাড়ি রোডে গড়ে উঠেছে প্রায় ৫০টি দোকান ও গোডাউন। সিরিয়ালের প্রথম ১০টি দোকান থেকে দৈনিক ২০০ থেকে ২৫০টাকা করে বিএনপি নেতা সুমন সরকারের নেতৃত্বে চাঁদা উঠানো হয়। অভিযোগ রয়েছে সুমন সরকারের মালিকানাধীন মরিয়ম সরকার মার্কেটের সামনের একটি বড় অংশ রেলের জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে।
সরকার বাড়ি রোডের বাকি দোকান ও গোডাউনগুলো থেকে চাঁদা তোলেন আরফান ওরফে ফেন্সি আরফান ও পালসার বাপ্পি। পূর্ব-উত্তর পাশের প্রায় ১০টি দোকান থেকে আওয়ামী লীগ নেতা গাজী সালাউদ্দিনের নামে চাঁদা উঠানো হয়। গাজী সালাউদ্দিনও রেলের কিছু অংশ দখল করে তিনতলা মার্কেট নির্মাণ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
দুই রেললাইনের মাঝের প্রায় ৫০টি কাঁচাবাজারের দোকান থেকে টাকা আদায় করেন আওয়ামী লীগ নেতা কবির বেপারি, গাজী সালাউদ্দিন, শহিদ গাজী ও লাইনম্যান রাশেদুল। রেললাইনের দক্ষিণ-পশ্চিম পাশের পাঁচটি রিকশার গ্যারেজ থেকে মাসিক এবং অর্ধশতাধিক দোকান থেকে দৈনিক ১০০-১৫০ টাকা করে আরিফ, আকরাম, মোমেন সরকার, শাহাবউদ্দিনের নামে চাঁদা তোলা হয়।
রেললাইনের উত্তর-পশ্চিম পাশের প্রায় শতাধিক কাঁচাবাজার দোকানির কাছ থেকে দৈনিক ১০০ টাকা চাঁদা তোলা হয় হাবিবুর রহমান, আব্বাস ও শামসুদ্দিনের নামে। ভাঙ্গারি পট্টি থেকে চাঁদা তোলেন মোশারফ। এসব দোকানদারদের থানা পুলিশের কোনো ঝামেলা হলে সমাধান করেন দোকান মালিক সমিতির সভাপতি কাউসার। গরু হাট এলাকায় জাকিরের নেতৃত্বে রেলের জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে বস্তি। মধুমিতা রেললাইনের পশ্চিম পাশে গড়ে তোলা হয়েছে অন্তত ১০টি দোকান, গোডাউন ও বালুমহাল। এসব দোকান থেকে স্থানীয় বাড়িওয়ালা মালিক সমিতি এবং আওয়ামী লীগ নেতা এম এম নাসিরের নামে চাঁদা তোলা হয়। এ ছাড়া টঙ্গী রেল জংশনের প্রবেশ মুখে রেলের জায়গায় গড়ে তোলা হয়েছে চোরাই জুতার বাজার।
থানা পুলিশ বাজারটি রেলওয়ে পুলিশের আওতাধীন হওয়ায় কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারছে না। এ ছাড়াও বনমালা এলাকায় রেললাইনের পাশে গড়ে তোলা হয়েছে ২০টি দোকান। এসব দোকান থেকে চাঁদা তোলেন আমিনুল ইসলাম ও ফরহাদ মোল্লা নামে দুই জন। এসব অবৈধ স্থাপনা ও দোকান থেকে এককালীন জামানতও নেওয়া হয়। দীর্ঘ ১০ বছর যাবত রেলের এসব জায়গা অবৈধভাবে দখলে রেখে ব্যবসা করছেন দখলদাররা। অথচ এসব বন্ধে রেলকর্তৃপক্ষের নেই কোনো নজরদারি।
তবে রেলকর্তৃপক্ষের দাবি, স্থানীয় এবং দলীয় প্রভাবশালীরা জড়িত থাকায় দোকানঘর উচ্ছেদ করা সম্ভব হয় না। দখলদাররা বলছেন, কর্তৃপক্ষ চাইলে সরে যাবেন তারা। চাঁদা আদায়কারী কয়েক জনের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, এই জমি পূর্বে তাদেরই ছিল। রেল অধিগ্রহণ করে নেওয়ার পর জায়গা খালি পড়ে থাকায় তারা দোকান নির্মাণ করেছেন। এছাড়া রাতের পাহারা বাবদ কিছু টাকা উঠানো হয়। স্থায়ী বাসিন্দা তাহমিনা হোসেন বলেন, ‘কয়েক হাজার অবৈধ স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে রেলের জায়গা দখল করে। এগুলো উচ্ছেদ করে রেল চলাচল নিরাপদ করা হোক।’
ইত্তেফাক/এসআই
