হাতে লেখা পত্রিকার একাল-সেকাল

আপডেট : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ০৯:০২

এই স্মার্ট ফোনের যুগে যেখানে ছাপাখানাই কদর হারাতে বসেছে সেখানে এখনো হাতে লেখা পত্রিকা টিকে আছে। সংবাদপত্র, সাহিত্য পত্রিকা এবং স্কুলে দেয়াল পত্রিকার আদলে আজও এই ঐতিহ্যকে ধরে রাখা হয়েছে। শুনলে অবিশ্বাস্যই মনে হয়। স্কুলে স্কুলে শিক্ষার্থীদের কাছে দেয়াল পত্রিকার কদর রয়েছে। সৃজনশীল শিক্ষার্থীরা মনের আনন্দে নিজেদের গল্প, কবিতা ও ভাবনার কথা বর্ণিল উপস্থাপনায় তুলে ধরেন সবার সামনে। হাতে লেখা এই দেয়াল পত্রিকাই অনেক বড় লেখক, সাহিত্যিক ও চিন্তকের জন্ম দিয়েছে।

বাংলা ভাষার একাধিক বিখ্যাত সাহিত্যিক হাতে লেখা পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সুকুমার রায় ১৯০৬ সালে একটি হাতে লেখা পত্রিকা বের করেছিলেন। এর মলাট, ছবি এবং বেশির ভাগ লেখাই ছিল তার নিজের। পত্রিকাটির নামটাও ছিল খুব মজার ‘সাড়ে বত্রিশ ভাজা’। কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য কমলা বিদ্যামন্দিরে প্রাথমিকে পড়ার সময় ‘সঞ্চয়’ নামের একটি হাতে লেখা পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন। পরে দেশবন্ধু হাইস্কুলে ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় অরুণচল বসুর সঙ্গে যুগ্মভাবে সম্পাদনা করে ‘সপ্তমিকা’ নামে একটি হাতে লেখা পত্রিকা বের করেছিলেন।

স্বনামধন্য কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন জানান, স্কুলে পড়ার সময় দেয়াল পত্রিকা আমার জীবনে একটা প্রভাব ফেলেছিল। বগুড়ায় ভি এম গার্লস স্কুলে যখন পড়ি তখন পরপর দুই বছর আমরা স্কুলের বন্ধুরা মিলে দেয়াল পত্রিকা বের করেছিলাম। এটা বলছি আমার ক্লাস সিক্স ও সেভেনে পড়বার সময়ের কথা। কী উত্তেজনা সেটা প্রকাশ করা নিয়ে। আর্ট পেপারে সুন্দর করে লেখা, এরপর তা রঙিন করে এঁকে উপস্থাপন করা ভিন্ন রকম আনন্দ এনে দিয়েছিল জীবনে।

সেলিনা হোসেন বলেন, আমাদের শিশুদের সৃজনশীলতার প্রকাশ ঘটে দেয়াল পত্রিকায়। আমি যখন শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান ছিলাম তখন দেয়াল পত্রিকা প্রতিযোগিতার আয়োজন করেছিলাম। আমার ধারণা ছিল রাজধানীর ছেলেমেয়েরা সুযোগ-সুবিধা বেশি পায়, তারা ভালো করবে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে সাতক্ষীরার একটি স্কুলে শিক্ষার্থীরা প্রথম হয়েছিল। কী অসাধারণ যে ছিল তাদের লেখা ও উপস্থাপনা তা বলে বোঝানোর নয়।

দেয়াল পত্রিকার রঙিন ভুবন: অনেকেই দেয়াল পত্রিকাকে বলে থাকেন দেয়াল ভাঙার পত্রিকা। শিশু-কিশোরদের স্বপ্ন, কল্পনা মিশে থাকে দেয়াল পত্রিকার আল্পনায়, শব্দের ভাঁজে। প্রচলিত গতানুগতিক ধারার বাইরে নিজের ইচ্ছে মতো লেখার স্বাধীনতা দেয় এই দেয়াল পত্রিকা। স্কুলে স্কুলে দেয়াল পত্রিকা বের করার চল রয়েছে। মোটা রঙিন কাগজে রঙিন কলম দিয়ে হাতে লেখা হয় অণুগল্প, কবিতা, জোকস, ইতিহাস ও ভ্রমণ কাহিনী। এছাড়াও মনীষীদের বাণী, নিবন্ধ ও গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ যেমন, কোনো ছাত্র বা বিদ্যালয়ের কৃতিত্ব প্রভৃতি উঠে আসে দেয়াল পত্রিকার গায়ে। আর থাকে ছবি। ভালো আঁকিয়েদের দিয়ে সেসব আঁকানো হয়। যারা অনেক আগে স্কুলের গণ্ডি পেরিয়ে এসেছেন তারা মনে করেন দেয়াল পত্রিকার সেই আগের কদর নেই। কিন্তু শিশু-কিশোরদের কাছে এর আবেদন ফুরিয়ে যায়নি।

আমাদের দেশে দেয়াল পত্রিকা নতুন নয়, এর ইতিহাস অনেক পুরাতন। দেয়াল পত্রিকা যেন দেশের সাহিত্য অঙ্গনে চারাগাছের মতো। যেখানে ভবিষ্যতের সাহিত্যিকরা তাদের স্বপ্নের দেখা পায়। আমাদের দেশের অনেক খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিকের লেখালেখির হাতেখড়ি এই দেয়াল পত্রিকার মাধ্যমে। তাই দেয়াল পত্রিকা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম বিষয়।

আগেকার দিনে দেয়াল পত্রিকার প্রচলন ছিল সব জায়গায়। স্কুলে স্কুলে তো বটেই পাড়ার সংগঠনগুলোও বছরে নির্দিষ্ট সময়ে দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করত। ত্রৈমাসিক, ষাণ্মাসিক বা বছরে একবার বের হতো এসব দেয়াল পত্রিকা। শিশু-কিশোররাই হয় দেয়াল পত্রিকার সম্পাদক, প্রকাশক এবং লেখক। তবে স্কুলের শিক্ষক কিংবা ক্লাবের বড়রা ছোটদের কাজের দেখাশোনা করেন। দেয়াল পত্রিকার নির্দিষ্ট বিষয় থাকে না। এর শরীরে স্থান পায় রকমারি, বিচিত্র সব বিষয়। তবে কোনো বিশেষ দিনকে সামনে রেখে করা হলে সে বিষয়েই সবাই লিখে থাকে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের দেখা চারপাশের বিষয়কে তুলে ধরার সুযোগ পায়। যখন নিজের চারপাশের বিষয় নিয়ে লিখতে শুরু করে তখন তাদের দেখার চোখও বদলে যায়। পরিণত হতে থাকে।

দেয়াল পত্রিকার আবেদন যে শিশু-কিশোরদের মাঝে এখনো খুব জোরালো তা বোঝা যায় আইন ও সালিশ কেন্দ্রের দেয়াল পত্রিকা নিয়ে উৎসবের আয়োজন দেখে। এছাড়া বাংলাদেশ শিশু একাডেমিও দেয়াল পত্রিকা প্রতিযোগিতার আয়োজন করে আসছে। এর বাইরে দেশের বিভিন্ন জেলায় দেয়াল পত্রিকা প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়ে থাকে। ২০০৮ সালে যেখানে ৩০টি স্কুলের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে নিয়ে উৎসবের শুরু হয়েছিল। ২০১৭ সালে এসে সেখানে শতাধিক স্কুলের অংশগ্রহণ দেখা যায়। দেশের নানা প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা তাদের দেয়াল পত্রিকা নিয়ে হাজির হয়।

হাতে লেখা পত্রিকা: তবে অবাক হতে হয়, দেয়াল পত্রিকার ধারণা নিয়ে বিশ্বে এখনো হাতে লেখা পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ভারতের চেন্নাই থেকে ‘দ্য মুসলমান’ (the musalman) নামের উর্দু সান্ধ্য দৈনিকটি ৯৪ বছর পেরিয়ে এসেছে। আর ছয় বছরের মধ্যে শতবর্ষে পা রাখবে পত্রিকাটি। ১৯২৭ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় পত্রিকাটি। পৃথিবীতে সবচেয়ে পুরোনো হাতে লেখা পত্রিকা এটি। এমনকি এটিই বিশ্বে একমাত্র সচল হাতে লেখা পত্রিকা। বর্তমানে এর গ্রাহকসংখ্যা ২২ হাজার। সকাল থেকেই শুরু হয় পত্রিকাটির নিউজ লেখার কাজ। তিন জন শিল্পী চার পাতার পত্রিকাটি লেখেন। পরে সেটা ছাপানো হয়। ঐতিহ্যের স্মারক হিসেবে অসাধারণ লেখনশৈলীর পত্রিকাটি প্রকাশ করে যাচ্ছেন সাইয়েদ পরিবার। এর প্রথম সম্পাদক ছিলেন সাইয়েদ আজাতুল্লাহ। তার মৃত্যুর পর ছেলে সাইয়েদ ফাজালুল্লাহ সম্পাদক হন। ২০০৮ সালে তিনি মারা গেলে ছেলে সাইয়েদ আরিফুল্লাহ সম্পাদক হন। চার পাতার এই পত্রিকার দাম ৭৫ পয়সা।

নিয়মিত দৈনিক পত্রিকা না হলেও হাতে লেখা দুয়েকটি বাংলা পত্রিকা এখনো প্রকাশিত হয়। পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানের রায়নার আনগুমা গ্রামে প্রায় ৬০ বছর ধরে নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছে ‘প্রভাত’ নামের পত্রিকাটি। প্রভাত সংঘের উদ্যোগে প্রকাশিত এ পত্রিকায় আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো বিখ্যাত লেখকরাও লিখেছেন। প্রতি বছর লক্ষ্মীপূজার দিন সকালবেলা গ্রামবাসীর সামনে প্রকাশ করা হয় পত্রিকাটি। প্রায় ২০০ পৃষ্ঠার এই পত্রিকার পাতাগুলো রঙিন। আর্ট পেপার কেটে তা করা হয়। গ্রামবাসী সংঘের কার্যালয়ে গিয়ে তা পড়তে পারেন।

এদিকে আমাদের কলাপাড়া (পটুয়াখালী) প্রতিনিধি মহসিন পারভেজ জানান, বাংলাদেশেও পটুয়াখালী থেকে বের হচ্ছে এমনই এক পত্রিকা। কলাপাড়া উপজেলার নীলগঞ্জ ইউনিয়নের সোনাতলা নামের গ্রামে ‘আন্ধারমানিক’ নামের পত্রিকাটি বের হয়। পত্রিকাটির সম্পাদক মো. হাসান পারভেজ। পত্রিকাটিতে স্থানীয় সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরা হয়। ২০১৯ সালে এটি প্রথম প্রকাশিত হয়।

হাতে লেখা বই: এর পাশাপাশি হাতে লেখা পত্রিকার মতো হাতে লেখা বইয়েরও খোঁজ মেলে। প্রাচীন আমলে পাথরে খোদাই করে লেখা কিংবা তারপরে প্যাপিরাসে হাতে লেখা বইয়ের সন্ধান মেলে। পুঁথিও ছিল হাতে লেখা বই। হাতে লেখা কোরআন শরিফের খবর তো অনেক রয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাতে লেখা কোরআন শরিফটি রয়েছে আফগানিস্তানে। তবে বাংলাদেশের হাতে লেখা কোরআন শরিফটিও কম বড় নয়। একসময় এটিকে এশিয়ার সবচেয়ে বড় কোরআন শরিফ হিসেবে ধরা হতো। ৬১ কেজি ওজনের হাতে লেখা কোরআনটি আট বছরে (১৯৮১-৮৯) লিখেছিলেন রাজশাহীর গোদাগাড়ি থানার বামনাহাল গ্রামের মোহাম্মদ হামিদুজ্জামান। ১ হাজার ১০০ পৃষ্ঠার এ কোরআন শরিফটির দৈর্ঘ্য ২ ফুট ৫ ইঞ্চি ও প্রস্থ ১ ফুট ১১ ইঞ্চি। উচ্চতা ৯ ইঞ্চি। এটি রয়েছে বায়তুল মোকাররম মসজিদ সংলগ্ন ইসলামিক ফাউন্ডেশনের লাইব্রেরির প্রদর্শনী কক্ষে।

ইত্তেফাক/এমআর