বিশ্বব্যাপী শান্তির জন্য হাহাকার

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০১৯, ২১:৩৯

শান্তির সুবিশাল ছায়াতলে বাস করিবার জন্য বিশ্বের শান্তিকামী মানুষের আজ আকুতির সীমা নাই। কিন্তু উন্নত, উন্নয়নশীল কিংবা অনুন্নত বিশ্বের কোনোখানেই মিলিতেছে না শান্তির সুবাতাস। শান্তি, শান্তি করিয়া মানুষ আজ কাঁদিয়া মরিতেছে। ফিলিস্তিন, সিরিয়া, দক্ষিণ সুদান, ইরাক, ইয়েমেন, আফগানিস্তান, ইউক্রেন প্রভৃতি দেশে অশান্তির উত্তাল তরঙ্গ খান খান করিয়া দিতেছে মানুষের শান্তির স্বপ্ন।  কিন্তু যাহাদের হাতে শান্তিগৃহের চাবি, তাহারা বড়ই নির্লিপ্ত। তাহারা হাসিতেছে শয়তানের অট্টহাসি। জাতিসংঘ পালন করিতেছে ঠুৃঁটো জগন্নাথের ভূমিকা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কী চমত্কারভাবে লিখিয়াছেন, ‘নাগিনীরা চারি দিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিঃশ্বাস, শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস!’ পৃথিবীর শান্তি বিনষ্টকারী নাগিনীদের মুখে তাই শান্তির বাণী শোভা পায় না।

তাহাদের এত আস্ফাালন কেন? তাহারা কেন একের পর এক সীমালঙ্ঘন করিতেছে? গত দুই দশকে পৃথিবীতে নানা অজুহাতে যুদ্ধ-বিগ্রহ সৃষ্টি করিয়া হত্যা করা হইয়াছে লক্ষ লক্ষ মানুষকে। ধ্বংস করিয়া দেওয়া হইয়াছে শহরের পর শহর, গ্রামের পর গ্রাম। সমাজ-সভ্যতা মিশাইয়া দেওয়া হইয়াছে ধুলার সহিত। বিভিন্ন জনপদে অবলম্বন করা হইয়াছে পোড়ানীতি। সাধারণ মানুষকে করা হইয়াছে ছিন্নমূল ও শরণার্থী। এমনকি যাহারা একসময় ছিল সচ্ছল, তাহাদের বানানো হইয়াছে পথের ভিখারি। তাহাদের শান্তির ঘুম হারাম করিয়া দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু এই করিয়া তাহারা নিজেরা কি শান্তিতে ঘুমাইতে পারিতেছেন? এমনকি কেহ কি আর শান্তিতে আছেন না থাকিতে পারিতেছেন? গোটা পৃথিবীটাকে একটা অগ্নিকুণ্ড বানাইয়া কেহ যদি ভাবে যে তাহারা ভালো থাকিবে, তাহলে তাহারা বসবাস করিতেছে বোকার স্বর্গে। এশিয়া, আফ্রিকা তো বটে খোদ ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলি কি আজ অশান্তির আগুন হইতে মুক্ত রহিয়াছে?  অন্যের ঘরে আগুন লাগাইবার পরিণতিতে তাহাদের ঘরেও কি আগুনের উত্তাপ আসিয়া লাগিতেছে না? সন্ত্রাসবাদ কি তাহাদেরও ক্ষতবিক্ষত করিতেছে না?

এইজন্য আমরা বরাবরই বলিয়া আসিতেছি যে, শক্তিশালী দেশগুলির উচিত আগে নিজেদের ঘর সামলানো। সাত সাগর তের নদী পার হইয়া আসিয়া অন্য দেশের ব্যাপারে তাহাদের নাক গলানো অনুচিত। বলপূর্বক বিভিন্ন তন্ত্র-মন্ত্রের আমদানি হইতেও তাহাদের বিরত থাকা বাঞ্ছনীয়। ‘সর্প হইয়া দংশন করো, ওঝা হইয়া ঝাড়ো’ নীতি অবলম্বন করিতে গিয়া তাহারা নিজেরাই নিজেদের অলক্ষে বিপদ ডাকিয়া আনিতেছেন। অথচ অন্যের ঘুম কাড়িয়া লইবার অধিকার কাহারও নাই। তাই তাহাদের প্রতি আমাদের বক্তব্য সুস্পষ্ট—আপনারা শান্তিতে ঘুমান, অন্যদেরও শান্তিতে ঘুমাইতে দিন। আপনারা সুখে থাকুন, অন্যদেরও সুখে থাকিতে দিন। এই নীতির বাস্তবায়ন ছাড়া পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হইবে বলিয়া মনে হয় না।

বিস্ময়কর ব্যাপার হইতেছে, বিশ্বব্যাপী এত অশান্তির মধ্যেও আমাদের প্রাণপ্রিয় বাংলাদেশে শান্তি ও স্থিতিশীলতার আবহ বিরাজ করিতেছে। আর্থ-সামাজিকসহ নানাভাবে উন্নতির দিকে অগ্রসর হইতেছে দেশ। আমরা আশ্চর্য হইব না যদি এই শান্তির বাতাবরণ সাময়িক হয়। তবে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করিলে এই কথা বুঝিতে আমাদের কোনো অসুবিধা হয় না যে, এই শান্তি সাময়িক নহে, বরং ইহা দীর্ঘসময়ের জন্য ও টেকসই নিঃসন্দেহে।