দুর্নীতিবাজদের কোনো নীতি নেই। দফায় দফায় প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি করা হয়েছে, তবু ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ হচ্ছে না। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। গত ১৭ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় পরিদর্শনে গিয়ে সেখানকার কর্মচারীদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে দুর্নীতির ব্যাপারে জিরো টলারেন্স দেখাতে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। আক্ষেপ করে বলেছেন- ‘সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সরকার প্রদান করেছে, যেটা প্রয়োজন সেটাতো আমরা মেটাচ্ছি। তাহলে দুর্নীতি কেন হবে?’ এ জন্য সরকারি কর্মচারীদের মন-মানসিকতার পরিবর্তন করতে বলেছেন তিনি। দক্ষতা, সততা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ বিবেচনায় পদায়নসহ দুর্নীতি করলেই সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা গ্রহণে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। তার এরূপ নির্দেশে দুর্নীতি কমবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।
উল্লেখ্য, সেবা খাতে দুর্নীতি হয় বেশি। মানুষের অর্থ ব্যয়সহ ভোগান্তি হয়। এখনও বোধকরি ফায়ার সার্ভিস ছাড়া প্রতিটি সেবা খাতে সেবা পেতে হলে ঘুষ দিতে হয়। টিআইবির রিপোর্টে এদিক থেকে সবার শীর্ষে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে আছে যথাক্রমে পাসপোর্ট ও বিআরটিএ। তবে টাকার অঙ্কে সবচেয়ে বেশি ঘুষ নেয় বিআরটিএ। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে বিভিন্ন ধরনের সেবা পেতে বছরে ঘুষ দিতে হয় ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি। দেশের আইন-শৃঙ্খলা সংস্থা, পাসপোর্ট ও বিআরটিএ, ভূমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, পুলিশ স্টেশন, আদালত পাড়া থেকে শুরু করে সবখানেই অনেকটা রাখঢাক না করেই চলছে ঘুষ গ্রহণ । কাজের ব্যাপ্তি অনুসারে ঘুষের পরিমাণ নির্ধারিত কোনো কোনো দপ্তরে। সেবা প্রাপ্তি নাগরিক অধিকার। এ অধিকার অনেকটাই হরণ করা হচ্ছে। অথচ প্রধানমন্ত্রী কী চমত্কারভাবে বলেছেন, ‘সবাইকে অনুরোধ করব, একটা কথা মনে রাখতে হবে যে দেশটা আমাদের।’ দেশপ্রেম থাকলে কেউ এমন অনৈতিক কাজে লিপ্ত হতে পারেন না।
পৃথিবীর সব দেশেই কম-বেশি দুর্নীতি আছে, ঘুষের রেওয়াজ আছে। এই কথাটির আপেক্ষিক সত্যতা মেনে নিয়েও বলতে হয়, বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় দুর্নীতির ব্যাপকতাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এই দুর্নীতি জনগণের মনে ব্যাপক হতাশাবোধের জন্ম দিয়েছে। কেননা রাষ্ট্র ও সমাজ ব্যবস্থায় থাকা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের কার্যকর লক্ষ্য ও ভূমিকা পালন থেকে বিচ্যুত।
দুর্নীতি কেবল ওপর মহলে হয় তাও নয়, বরং দৈনন্দিন জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে জনগণকে দুর্নীতির প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে বাধ্য করা হয়। অনেক সময় জনগণকে মূল্য দিতে হয় সত্ থাকার জন্য। জনগণের কাছে এই ধারণা ক্রমেই দৃঢ় হয়েছে যে, সমাজে নীতিবান হয়ে থাকার মাঝে কোনো গৌরব নেই বরং আছে বহু ভোগান্তি। সমাজের সুশীল অংশেও ন্যায়-অন্যায়ের সংজ্ঞা পরিষ্কার নয়। অন্যদিকে বেআইনি পথে থাকার সুবিধা রয়েছে অনেক। জনগণের মনে এই ধারণা যত ক্রমবিকাশমান হচ্ছে, হতাশা ততো বৃদ্ধি পাচ্ছে, সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা সম্পর্কে বিরূপ ধারণা ততো বেশি বেড়ে যাচ্ছে।
বর্তমান সরকারের আমলে সাফল্যের অনেক নজির আছে তা অস্বীকার করার জো নেই। শত কিছুর পরও প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে গত কয়েক বছরে এক শ্রেণির মন্ত্রী-এমপি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দলীয় লোকজনের দুর্নীতির তালিকা কম নয়। এটা সরকারের ভালো অর্জনগুলোকে আড়াল করে দিচ্ছে। সমাজের প্রতিটি স্তরে ঘুষ-দুর্নীতি ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। এ ব্যাধি থেকে নিস্তার পাওয়ার পথ হচ্ছে সমাজ ও রাষ্ট্রের বেশকিছু ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কার সাধন করা এবং উন্নয়ন ঘটানো। এছাড়া দুর্নীতি করে যাতে কেউ পার না পায়।
n লেখক : গবেষক
