রাজু আহমেদ
হিজড়া, ট্রান্সজেন্ডার অথবা তৃতীয় লিঙ্গ শব্দটি মাথায় আসলে প্রথমেই যে ধারণা চলে আসে তা হলো- অস্বাভাবিক অঙ্গভঙ্গি দেখিয়ে টাকা আদায়, অপ্রস্তুতভাবেই গায়ে হাত দিয়ে কথা বলা অথবা যে কোনো সময় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলা ইত্যাদি।
আপনি হয়তো বৃহন্নলাদেরকেই দায়ী করবেন এমন অপ্রীতিকর পরিস্থিতির জন্য। কিন্তু গভীরভাবে চিন্তা করে দেখুন আমরাই দায়ী এমন পরিস্থিতির জন্য, আমাদের সমাজই দায়ী এমন অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য।
আমরা প্রায়ই রাস্তা-ঘাটে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের মুখোমুখি হই। আমরা তাদের এড়িয়ে চলার চেষ্টা করি। আমরা কখনোই চিন্তা করি না তারা কেন এমন কাজ করছে। আমরা কখনোই ভাবি না যে সমস্যাটা তাদের নয়, বরং আমাদেরই। আমাদের জন্যই তারা আজ বাধ্য হয়েই বিরক্ত করছে।
হিজরা সমপ্রদায় বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর একটি অংশ হওয়া সত্ত্বেও অতি প্রাচীনকাল থেকেই তারা অবহেলিত, বঞ্চিত, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত। সরকারের সমাজকল্যাণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ১০ হাজার কিন্তু হিজরাদের নিয়ে কাজ করে এমন সংগঠনের দেওয়া তথ্য মতে, প্রায় ১৫ হাজার বা তারও বেশি। আমাদের সমাজ এদেরকে সহজে গ্রহণ করে না। এদের সামাজিকভাবে গ্রহণ না করার কারণেই চিকিত্সা, শিক্ষা, কর্মসংস্থানসহ নানা স্থানে বিভিন্নভাবে বিড়ম্বনার মুখে পড়তে হয় তাদের।
পৃথিবীতে তারা হিজড়া হয়েই জন্মগ্রহণ করে না। তাদের আচরণ ও দৈহিক গঠনে পরিবর্তন আসার আগ পর্যন্ত তাদের স্বর্গীয় দিন কাটে মা-বাবার ভালোবাসায়, ভাই-বোনের সোহাগ, আদর আর খুনসুটি এবং কম বয়সেই গড়ে ওঠা কিছু সম্পর্কের মায়াজালে। কিন্তু একটা সময় আসে যখন বোঝা যায় যে তারা আমাদের থেকে একটু আলাদা, তখনই তাদের প্রতি পরিবারের সদস্যদের একটা ভিন্নরকম ধারণা চলে আসে। তাদের আবেগগুলোকে আর আগের মতো মূল্যায়ন করা হয় না, তারা পায় না কোনো ভালোবাসা, আদর কিংবা সোহাগ। পায় না কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ, সমাজ তাদেরকে স্বাভাবিক চোখে দেখে না, নিজ পরিবারেই তারা নিজ অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। বাধ্য হয় নিজের মতো সমজাতীয় মানুষদের সন্ধানে যেখানে কেউ আর তাকে অবহেলা করবে না!
বিশ্বের অনেক দেশেই হিজড়ারা স্বাভাবিক জীবন-যাপন করছে। অন্যের করুণার উপর নির্ভর করে তাদের জীবন চলে না। কিংবা তারা প্রাত্যহিক জীবনের প্রয়োজন মেটানোর জন্য অন্যদের বিরক্ত করে না। কারণ, তারা আত্মনির্ভরশীল, তারা শিক্ষিত, তারা চাকরিজীবী, তারা রাজনীতিবিদ, তারা ব্যবসায়ী। আর আমাদের দেশে? তারা অবহেলার পাত্র, অবজ্ঞার পাত্র, রাস্তাঘাটে বিরক্ত করা জনগোষ্ঠী। বেশি দূরে যেতে হবে না। এইতো পাকিস্তানেই হিজড়াদের মধ্য থেকে নির্বাচিত এমপি রয়েছে, আপনি কানাডায় যান সেখানে তৃতীয় লিঙ্গের অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কাজ করছে। দিব্যি চলে যাচ্ছে তাদের জীবন। কিন্তু আমাদের দেশে কেন নয়। কারণ, আমরা তাদের সুযোগ দিচ্ছি না, তাদের নার্সিং করছি না, তাদের যোগ্যতাকে মূল্যায়ন করছি না, কোনো প্রতিষ্ঠান নেই তাদের নিয়ে কাজ করার, তাদের অধিকার নিয়ে কথা বলার, তাদের প্রত্যাশাগুলো সরকারকে জানানোর।
যদি আমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসি, তাদের প্রতি আমাদের বিরূপ দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করি তাহলেই সম্ভব তাদের জীবনকে পরিবর্তন করা। তাদের জীবনকে স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসা। এক্ষেত্রে, সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। তাদেরকে বিশেষ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে তাদের জীবনমানকে উন্নত করতে হবে। তাদেরকে শিক্ষা, সামাজিক মর্যাদা, কর্মসংস্থানের সুযোগ প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে। তাদের যেন আর রাতের অন্ধকারে অশ্রু ঝরাতে না হয়, তাদের যেন আর কারোর তিরস্কারের পাত্র হতে না হয়, তারা যেন নিজ নিজ পরিবারেই বসবাস করতে পারে সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন সংগঠনকেও এগিয়ে আসতে হবে তাদের জীবনমানকে উন্নত করার প্রত্যয় নিয়ে। সাধারণ জনগণের মাঝে প্রচারণা চালাতে হবে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নিয়ে, তাদের অধিকার নিয়ে, সামাজিক মর্যাদা নিয়ে। সর্বোপরি, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে, তবেই তাদের জীবন বদলে যাবে।
তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের শিক্ষা, সামাজিক মর্যাদা, কর্মসংস্থান এবং বিশেষ সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে সমাজের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিতকরণ এখন সময়ের দাবি। প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। দৃষ্টিভঙ্গি বদলান, ওদের জীবন বদলে যাবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
