একুশ আমাদের গর্ব। একুশ আমাদের অহংকার। যা আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রধান বিষয়। এ অর্জন পৃথিবীর মানচিত্রে বাংলাদেশকে যেমন গৌরবময় ভূমিকায় প্রতিষ্ঠিত করেছে, তেমনিভাবে পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার সঙ্গে বাংলাভাষাও তার নিজস্ব মহিমায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। মহান একুশকে সামনে রেখে আমাদের দেশীয় ফ্যাশন হাউজগুলো প্রতিবারের মতো এবারও সেজেছে নানা বৈচিত্র্যময় পোশাকে। করোনার কারণে এ বছর সীমিত পরিসরে একুশ উদ্যাপিত হবে। একুশের পোশাক নিয়ে লিখেছেন নওশীন শর্মিলী
একুশে ফেব্রুয়ারি বাঙালি জাতির এক গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস। তাই তো ফেব্রুয়ারি ভাষার মাস হিসাবে সমগ্র বিশ্বে পরিচিত। এই মাসে চেতনায় এবং শ্রদ্ধায় অবনত হয় সমগ্র জাতি ও বিশ্বের অন্যান্য রাষ্ট্রসমূহ এবং ভাষাপ্রেমীরা। বাংলাদেশে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের যে ধারাবাহিকতার পুনর্বিন্যাস, পুননির্মাণ এবং অনুশীলন ইত্যাদি প্রক্রিয়ার চলমানতা রয়েছে, সেই প্রেক্ষিতে ৫২’র ভাষা আন্দোলনের পটভূমি প্রতিদিন, প্রতিবছর ক্রমশই আলোকিত হয়ে উঠছে। লক্ষণীয় যে, এই ফেব্রুয়ারি মাসে পুরো বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিপণন ও ঐতিহ্য বিকাশে দেশীয় ফ্যাশন হাউজ ও প্রতিষ্ঠানসমূহ একুশের বিষয়বস্তুনির্ভর আমাদের চেতনা জাগানিয়া পোশাক-আশাক ও ফ্যাশন সামগ্রী তৈরি করে যাচ্ছেন মূলত আমাদের জাতীয় চেতনায় বারবার বিকাশের তাগিদে। যা বিগত বছরগুলোতে জনসাধারণের পৃষ্ঠপোষকতায় ও মিডিয়ার সহযোগিতায় দিন দিন সমৃদ্ধতর হচ্ছে। সাদা এবং কালো রঙের সমন্বয়ে তৈরি পোশাক ও অন্যান্য সামগ্রী সংগ্রহের ক্ষেত্রেও থাকে ক্রেতাদের একটি বিয়োগাত্মক দিনের স্মরণগাঁথা। তাই বিয়োগ-ব্যথার বেদনার্ত রঙ কালোই মূলত সবক্ষেত্রে প্রাধান্য পেয়ে থাকে। পোশাকে ও অন্যান্য সামগ্রীতে বর্ণমালা, শহীদ মিনার, একুশের পঙিক্তমালা, শহীদদের প্রতিকৃতিও থাকে বিভিন্ন সামগ্রী অবয়বজুড়ে। এ ছাড়া থাকে বাঙালির চেতনাবাহী বিবিধ বিষয়; যা আমাদের শহীদদের আত্মত্যাগের স্মৃতিকে চোখের সামনে ফুটিয়ে তোলে। ভাষার প্রতি বাঙালির যে টান ও মমত্ববোধ—এই টান ও মমত্ববোধ যেমন উত্্কীর্ণ হয় লেখায়, রেখায় এবং দৈনন্দিন জীবন যাপনে, তেমনি ফ্যাশনের ভুবনেও একুশের মর্মার্থকে শ্রদ্ধার সঙ্গে ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস থাকে প্রতিবছর, প্রতিনিয়ত গহীন ভালোবাসায়। ভাষার মাস যখন বছর ঘুরে আবেগতাড়িত বাঙালির প্রাঙ্গণে এসে ছায়া ফেলে, ঠিক তার সঙ্গে এসে পাশে দাঁড়ায় ঋতুরাজ বসন্ত। একদিকে শোকার্ত অতীতের শোকগাঁথার গল্পবুননের গুণগুলো বুকের স্পন্দনে তিরতির করে কাঁপতে থাকে। একইভাবে রঙিন বসন্তের ফাগুন হাওয়ার দোলায়ও দুলে ওঠে বাঙালির হূদয়। অনুভূতিতে জেগে ওঠে এক অন্যরকম আবেশ। একদিকে একুশের আবেগমথিত প্রহরের করুণ সুরেলা আবহ ‘রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’র প্রাণাবেগকে করে তোলে বিধৃত আর বেদনাপ্লুত। শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি, চিত্রকলা, ফ্যাশন তথা শিল্পের প্রতিটি শাখায় রয়েছে একুশে ফেব্রুয়ারির দারুণ প্রভাব রয়েছে। যে প্রভাবের স্পর্শে আলোকিত হয়ে উঠেছে বাংলা কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটকসহ নানা অঙ্গন। সর্বোপরি প্রতিবছর বাংলা একাডেমি আয়োজন করে ১ ফেব্রুয়ারি থেকে মাসব্যাপী বইমেলার। তবে করোনার কারণে এ বছর বইমেলা আগামী ১৮ মার্চ থেকে শুরু হবে। বইমেলা আজ বাঙালির প্রাণের মেলারূপে প্রতিটি বাঙালির মনে জায়গা করে নিয়েছে। পাশাপাশি একুশের চেতনাকে ধারণ করে সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও চলে নানা আয়োজন। একুশের চেতনার ধারা শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির বুকে যে সুপ্রবাহ সৃষ্টি করেছে তাতে সমপ্রতি একুশের চেতনার ছোঁয়া লেগেছে দেশের ফ্যাশন ট্রেন্ডেও। বাঙালির দৈনন্দিন জীবনে পোশাক একটি অপরিহার্য অনুষঙ্গ। যে অনুষঙ্গের গহীনে এখন চলছে দেশীয় মোটিফে করা আধুনিকবোধের প্রকাশ। বিভিন্ন উত্সবের পাশাপাশি নগরবাসীরা একুশের চেতনায় উজ্জ্বীবিত হয়ে পোশাকের প্রতিও তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন প্রদানের মধ্যদিয়ে শহীদ দিবসের মর্মগাঁথাকে প্রতিবছরের ফেব্রুয়ারিতে শরীরে জড়িয়ে নেন গভীর ভালোবাসায়। দেশীয় ফেব্রিকে তৈরি একুশের পোশাক বিভিন্ন ফ্যাশন হাউজের আউটলেট থেকে সংগ্রহের উদ্যোগ শুরু হয় ফেব্রুয়ারির গোড়া থেকে। রাজধানীর শতাধিক ফ্যাশন হাউজ নাগরিক জীবনের পরম এই অনুষঙ্গকে অত্যন্ত নান্দনিকরূপে উপস্থাপনের লক্ষ্যে গ্রহণ করে বিপুল আয়োজন। এই আয়োজনে থাকে পাঞ্জাবি, শার্ট, ফতুয়া, শাড়ি, থ্রি-পিস, টি-শার্ট, পট, শো-পিস, টিপট, মগসহ নানা সামগ্রী। টি-শার্টের ছোট্ট এক চিলতে জমিনে যে কত আবেগ আর অনুভূতি এক হয়ে মিশে যেতে পারে তা যেন সময়ের প্রতিটি পরতে পরতে একটু একটু করে উন্মোচিত হচ্ছে আমাদের সামনে। আর তাই একুশের চেতনাকে ধারণ করে থাকা টি-শার্টগুলোতে যেমন দেখা মেলে চিরাচরিত বর্ণমালার সুনিপুণ কোনো বিন্যাস, তেমনি এই সীমিত ক্যানভাসেই অপরিসীম আবেদন নিয়ে উঠে আসে দেশের প্রতি ভালোবাসার নানা গল্প। একুশের আয়োজনে একদিকে একুশের শহীদ বেদীতে গাঁদা কিংবা গোলাপের শ্রদ্ধার্ঘ আর অন্যদিকে একুশের চেতনায় সামিল হওয়া কোনো তরুণীর মাথায় শোভা পাওয়া গাঁদার মালা যেন একুশের ছন্দটাকেই নিয়ে আসে সকলের মাঝে। সেই সাথে ছোট-বড় সকলের গালে রংতুলির ছোঁয়ায় জন্ম নেওয়া বর্ণমালা আর একুশের মিনারও যেন সবাইকে মনে করিয়ে দেয়—আজ একুশে ফেব্রুয়ারি। আজকের দিনটি শোককে শক্তিতে পরিণত করে ভাষার জন্য ভালোবাসা প্রকাশের দিন।
কনসেপ্ট, ড্রেস ডিজাইন ও স্টাইলিং বিপ্লব সাহা
মডেল দোয়েল ও টিয়া
মেকআপ অ্যান্ড হেয়ারস্টাইল রিজভী হোসেন
ছবি অনিক চন্দ্র ও ফাহিম হোসেন
