ফ্যাশনপ্রেমী উদ্যোক্তার গল্প

আপডেট : ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২০:০৮

শ্রাবণী চক্রবর্তী পলি। শিক্ষকতা পেশায় ছিলেন দীর্ঘদিন। সেই পেশা ছেড়ে বর্তমানে ফ্যাশন উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করছেন। সীমান্ত সম্ভার শপিং সেন্টারে গড়েছেন ‘শ্রাবণী’স কালেকশন্স’। সেখানে রয়েছে শাড়ি, সালোয়ার-কামিজসহ অর্নামেন্টের বিপুল সমাহার। ফ্যাশনপ্রেমী এই মানুষটির গল্প তুলে ধরছেন শাহিনুর আলম কলি ও ছবি তুলেছেন আদিব আহমেদ

স্কুলে পড়ার সময় ফ্যাশনের প্রতি আগ্রহটা তৈরি হয়েছিল তার। বাবার চাকরির সুবাদে অনেক জায়গায় থাকার সৌভাগ্য হয়েছে। একসময় ঢাকায় এসে ভর্তি হন আজিমপুরে লেডিস ক্লাবের অন্তর্ভুক্ত শিশু বিদ্যালয়ে। সেখানে দুই বছর পড়ার পর ভর্তি হন আজিমপুরের অগ্রণী বালিকা বিদ্যালয়ে। ওই সময় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ মেয়েদের তৈরি জিনিস নিয়ে মীনা বাজারের আয়োজন করতো। নতুন কিছু তৈরির প্রতি সব সময় একটা ঝোঁক ছিল শ্রাবণীর। আজিমপুরের লেডিস ক্লাব থেকে  হ্যান্ড পেইন্ট, বাটিক ও বিভিন্ন হস্তশিল্প সম্পর্কে শিখেছিলেন। শার্টিনের ফিতা দিয়ে সুন্দর সুন্দর চুলের রিবন, জন্মদিনে কাগজের রঙবেরঙের টুপি ও ফুল তৈরি করে মীনা বাজারে বিক্রি করতে নিলে তার সব পণ্যই বিক্রি হয়ে যায়। এতে উত্সাহ বেড়ে যায়। এরপর এসএসসি পাস করে ইডেন কলেজে ভর্তি হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স করার পর শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নেন। সেখানে সততার সঙ্গে ৩০ বছর কাটানোর পর দু’বছর আগে তার স্বামী হঠাত্ করেই সীমান্ত সম্ভারে একটি দোকান নিলেন। আসলে তার উদ্দেশ্য ছিল ভাড়া দেওয়ার। কিন্তু ব্যবসায় সম্পর্কে শ্রাবণীর ঝোঁক থাকায় নিজেই ব্যবসা শুরু করলেন। তাছাড়া দেশীয় পোশাকের ব্যাপক চাহিদা ও সম্ভাবনা তাকে অনুপ্রাণিত করেছে দেশীয় ফ্যাশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে। তাই আগ্রহ নিয়ে ‘শ্রাবণী’স কালেকশন্স’ নামে একটি আউটলেট করলেন। স্বামীর সম্পূর্ণ সহযোগিতা ছিল বলেই এতদূর আসতে পেরেছেন। নারী উদ্যোক্তাদের পরিবার থেকে হয়তো প্রথমে কিছুটা চাপ থাকতে পারে। কিন্তু শ্রাবণীর ক্ষেত্রে তেমনটি হয়নি। তার এই সাফল্যের জন্যই এখন পরিবার থেকে বেশ সহযোগীতা এবং উত্সাহ পাচ্ছেন।

তবে একজন নারীর উদ্যোক্তা হয়ে উঠার গল্পটা অনেক কঠিন বলে জানালেন শ্রাবণী চক্রবর্তী পলি। তার ভাষ্যে,  ‘শ্রাবণী’স কালেকশন্স’র যাত্রা শুরু হয় ২০১৮ সালে। এক্ষেত্রে বলতে হচ্ছে, উদ্যোক্তার জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং বিষয় হচ্ছে ক্রেতাসাধারণের পছন্দ বুঝতে পারা। যে মানুষটি উদ্যোক্তা হতে চান তিনি এমনিতেই চ্যালেঞ্জ নেওয়ার মানসিকতাসম্পন্ন। কিন্তু তারপরও অনেক সময়ে অপ্রত্যাশিত ধাক্কা চলে আসে। সফল উদ্যোক্তা হতে চাইলে সেসব মোকাবেলার জন্য অবশ্যই প্রস্তুত থাকতে হবে। উদ্যোক্তা হতে হলে সঠিক কারণ জানা ও বোঝার প্রয়োজন আছে। সমস্যার বিষয়টি উদ্যোক্তাভেদে একেক রকম। তবে কমন সমস্যা হচ্ছে ফোকাস হারিয়ে ফেলা। তারপর অনলাইনের লোভনীয় আকর্ষণে এধরনের কাজগুলো এখন অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং। করোনার প্রভাবে মানুষের অস্থিরতা বৃদ্ধির কারণে অনেকেই নৈতিক সততা হারিয়ে ফেলছেন। এমতাবস্থায় কথা আর কাজে মিল না থাকা— একটা বড় চ্যালেঞ্জিং বিষয় একজন উদ্যোক্তার চলার পথে।’

ফ্যাশন উদ্যোক্তা হিসেবে ক্রেতার জন্য ভাবনা প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ক্রেতারা সব সময় গুণগত মান ও ভালো ডিজাইন চায়। আমাদের দেশে অনেক বিক্রেতাই ক্রেতার সঙ্গে খুব একটা ভালো ব্যবহার করেন না। তারা ভুলে যান—একজন ক্রেতা শুধু পণ্যের গ্রাহক নন বরং অনেক ক্রেতার সমাহার। কারণ একজন সন্তুষ্ট ক্রেতার রেফারেন্স পণ্যের বিক্রি বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। কারণ একজন ক্রেতা আরও ২০ জন ক্রেতা তৈরি করেন। তাদের সঙ্গে ভালো ও আন্তরিক ব্যবহার এবং সুন্দর বাচনভঙ্গি ক্রেতার আস্থা অর্জনে সহায়ক। মনে রাখা চাই, গ্রাহক চাহিদার প্রতি সম্মান দেখানো এবং ভালো মানের পণ্য সরবরাহ করাটা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। নিম্নমানের পণ্য বাজারজাত করে হয়তো সাময়িকভাবে লাভবান হওয়া যায়, কিন্তু এতে স্থায়ী ক্ষতি হয়। যে কারণে আমরা আসল পণ্য ছাড়া অন্যকিছু বিক্রি করি না। আবার, ক্রেতামাত্রই মানুষ এবং তাই তাদের আবেগ-অনুভূতিগুলো যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে দেখি।’