চাকরি নিয়ে দেশ ছাড়ার আগে রোজিনার জীবনটা ছিল ফুরফুরে। দরিদ্র পরিবারে নিত্য অভাব-অনটন, দুঃখ-কষ্টের মধ্যে বড় হলেও তার মধ্যে এক ধরনের উচ্ছলতা ছিল। সবার সঙ্গে হেসে কথা বলত। সেই রোজিনা এখন হাসতে ভুলে গেছে। সব সময় কেমন চুপচাপ বেদনার্ত মুখে বসে থাকে। কারো সঙ্গে কথা বলে না খুব একটা। তার সঙ্গে সঙ্গে বাবা-মা, বোন দুটিও দুঃসহ এক জীবনের স্বাদ গ্রহণ করছে। লজ্জায়, অপমানে তারা ঘর থেকে বেরোতে পারে না। নানা জনে নানা কথা বলে। রোজিনাকে বিদেশে পাঠানোর সময় অনেক টাকা ধারকর্জ করলেও তা এখনো শোধ করতে পারেনি তার বাবা কাঞ্চন মৃধা। ভ্যানগাড়ি চালিয়ে যা আয় হতো সেটাও বন্ধ হয়ে গেছে রোজিনা বিদেশ থেকে ফিরে আসার পর। তার গাড়িতে গ্রামের কেউ চড়ে না এখন। কেউ ভাড়ার জন্য তাকে ডাকে না আর।
ঢাকা থেকে আসা পত্রিকার সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মী রোজিনাকে নানা প্রশ্ন করে। তাদের এত প্রশ্নের জবাব দিতে ইচ্ছে করে না তার। এত লাঞ্ছনা, গঞ্জনা আর অপমানের বোঝা নিয়ে কোনো মানুষ বাঁচে কিভাবে? রোজিনা ভাবে, এর চেয়ে কুকুর-বিড়ালগুলোর জীবন অনেক ভালো।
দশ দিন আগে রোজিনার কোলজুড়ে একটি ফুটফুটে বাচ্চা এসেছে। কন্যাসন্তান। এ বাড়ির কেউই বাচ্চাটার দিকে ফিরেও তাকায় না, আদর করে কোলে তুলে নেয়া তো দূরের কথা। বরং দূর থেকে রোজিনার নবজাতক কন্যাটিকে উদ্দেশ্য করে কটু কথা বলে, অভিশাপ দেয়।
রোজিনা ভাবে, বাচ্চার তো কোনো অপরাধ নেই। কিছু অমানুষের জান্তব লালসার ফসল এই সন্তানটি তো তার গর্ভের রক্ত শুষেই বড় হয়েছে। তার আজকের পরিণতির জন্য যারা দায়ী তাদের তো কোনো বিচার কিংবা শাস্তি হয়নি, বরং তাদের লালসার শিকার হওয়া বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অসহায় তরুণী রোজিনাকে চুরির অপরাধে মালিক বাড়ি থেকে বের করে পুলিশে দিয়েছে!
তার কোলের কন্যাশিশুটি একদিন বড় হবে।... এক অজানা আশঙ্কায় সারা শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে। রোজিনার কোলে কাঁথায় মোড়ানো মেয়েটা নড়েচড়ে ওঠে। তারপর কাঁদতে থাকে। হয়তো খিদে পেয়েছে, তাকে খেতে দেয়া দরকার। বাচ্চাটাকে বুকে চেপে ধরে সে।
