রাজনৈতিক মঞ্চে, টকশো-গোলটেবিল-সভা-সেমিনারে ভালো ভালো কথা বলা হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, প্রাজ্ঞ-গুণীজনরা নানা ধরনের কথা বলছেন। কি করণীয়, কেন করা প্রয়োজন, কেন করতে হবে-এসব বলা হচ্ছে । অনর্গল বলে যাচ্ছেন। দেখা যাচ্ছে বছরের পর বছর ধরে প্রায় একই কথা বলছেন তারা। কথার শব্দ-লয়-মাত্রা-প্রকরণ মাঝে-মধ্যে ওঠা-নামা করছে। তবে জনগণের ভেতর এইসব কথা বা আহবান বিশেষ আবেদন সৃষ্টি করতে পারছে- এমন আলামত দেখা যাচ্ছে না। এর মূল কারণ কি? দেশের ইতিহাসবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, চিন্তাবিদ ও গবেষকরা বলছেন, এর মূল কারণ সম্মোহনী নেতৃত্বের অভাব। অধিকাংশেরই সাংগঠনিক দক্ষতা, আকর্ষণীয় বাগ্মিতা নেই। হাল আমলে রাজনৈতিক দলগুলোতে ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্ব না থাকায় তাদের আন্দোলন-সংগ্রামে আর গণজাগরণ তৈরি হয় না। তাদের কথায় রাজপথে সৃষ্টি হয় না গণজোয়ার। তাই রাজনীতিতে বিশেষ করে বিরোধী দলের রাজনীতিতে সম্মোহনী নেতৃত্বের অভাবে রাজপথে আন্দোলন দানা বাধার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
অতীতে ফিরলে দেখা যায়-এ দেশের কালযাত্রায় প্রতিটি সন্ধিক্ষণে আন্দোলন-সংগ্রামের লড়াকু ইতিহাস উজ্জ্বল হয়ে আছে। অনন্য সাধারণ প্রতিভাধর নেতৃত্বের কারণে অনেক আন্দোলন রূপ নিয়েছে গণঅভ্যুত্থানে। রাজপথ জেগে উঠেছে উত্তাল জনস্রোতে। নেতৃত্ব কখনো কখনো হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালার মতো সম্মোহন তৈরি করেছে জনতার মাঝে। একাত্তরে বিশ্বকাঁপানো মুক্তিযুদ্ধে গোটা দেশ ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বে। তার আগে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ছেষট্টির ছয় দফা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে মানুষ মৃত্যুকে তুচ্ছ করে রাজপথে নেমেছে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার বিচারককেও জনরোষের মুখে পেছনের দরোজা দিয়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিলো। এসবই সম্ভব হয়েছিলো ক্যারিশম্যাটিক বা সম্মোহনী শক্তিধর নেতৃত্বের কারণে। কিন্তু পরিস্থিতি এখন ভিন্ন। সরকারবিরোধী শক্তির রাজপথের আন্দোলনে আপামর জনগণের তেমন সাড়া দেখা যায় না।
অভিজ্ঞজনরা বলছেন, সরকারি দল এবং প্রশাসন নানা অনিয়মে জড়িয়ে পড়লেও প্রতিবাদের জন্য বিরোধী শক্তির নেতা-কর্মীরা নামছে না। বিশ্লেষকরা অনেকে মনে করছেন, জনস্রোত রাস্তায় নামাতে না পারলে বিরোধী শক্তি তাদের দাবিগুলো পূরণ করতে পারবে না। সেক্ষেত্রে অভাবনীয় কিছুর প্রত্যাশা করা ছাড়া তাদের গত্যন্তর কী? এই প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করে ইত্তেফাকের সঙ্গে কথা বলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক ও বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নেহাল করিম।
সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, বিএনপির জনসমর্থন আছে। কিন্তু আন্দোলনে জনজোয়ার সৃষ্টি করার মতো নেতৃত্ব নেই। তাই তাদের পক্ষে জনজোয়ার বা জনস্রোত দেখা যাচ্ছে না। আনোয়ার হোসেন বলেন, বঙ্গবন্ধু ছিলেন সম্মোহনী নেতৃত্বের অধিকারী। তাঁকে জনগণ স্বতঃস্ফূর্ত উপাধি দিয়েছিল ‘বঙ্গবন্ধু’। তাঁর ক্যারিশমাটিক লিডারশিপ জনগণকে মোহিত করে রেখেছিল। ছয় দফা আন্দোলনে অন্যসব নেতাকে ছাড়িয়ে জনগণের মধ্যে পৌঁছান তিনি। মানুষের জন্য তার দরদ ছিল। আকর্ষণীয় বাগ্মিতা ও সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল। তার আহবানে একেবারে স্রোতের মতো মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়তো রাজপথে। বঙ্গবন্ধুর পরে সেই রকম নেতৃত্বের আবহ আর পাচ্ছি না।
আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেন, বর্তমানে কোন ইস্যুতে রাজপথে জনস্রোত নামছে না। তার অন্যতম কারণ হলো ক্যারিশম্যাটিক লিডারশিপের অভাব এবং জনগণের সর্বজনীন দাবিতে কোন কর্মসূচি নেই। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন অনন্য সাধারণ প্রতিভার অধিকারী। তার ছয় দফা ছিল সাত কোটি মানুষের প্রাণের দাবি। মানুষের বাঁচা-মরার দাবি। তার আহবানে স্রোতের মতো মানুষ নেমে এসেছিলো। সেই নেতৃত্ব এখন দুর্লভ।
অধ্যাপক ড. নেহাল করিম বলেন, বিএনপির দাবিগুলোর পক্ষে জনস্রোত না নামলে সামান্য আন্দোলনে তাদের দাবি আদায় সম্ভব নয়। সরকারবিরোধী পক্ষে এমন ক্যারিশম্যাটিক লিডারশিপ নেই যে যার কথায় জনজোয়ার-জনস্রোত রাজপথে নেমে পড়বে আর দাবি আদায় হয়ে যাবে। ৯ কলাম ২
