একুশের বিচার, একুশের পরিণাম

আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ১৯:৪২

আহমদ রফিক

ভাষা আন্দোলনের লক্ষ্য ছিল মূলত রাজনৈতিক, অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে পাকিস্তানে বাংলার প্রতিষ্ঠা। তাতে পাকিস্তানে বাঙালি জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক স্বার্থ রক্ষা পাবে—এমন ভাবনা থেকে আন্দোলনের সূত্রপাত। শুরুতে প্রবন্ধ রচনায় যুক্তিতর্কের মাধ্যমে দাবি প্রতিষ্ঠার প্রয়াস। এরপর বিক্ষোভ ও প্রতিবাদে নানা আয়তনিক সভা। সবশেষে সুনির্দিষ্ট ঘটনার ভিত্তিতে আন্দোলন-হরতাল, সভা-সমাবেশ ও মিছিলের মাধ্যমে। মিছিল গুরুত্বপূর্ণ, এই তাত্পর্যে যে মিছিলে উচ্চারিত স্লোগান সাধারণত আশপাশের মানুষজনের চিত্তে ও চিন্তায় ঢুকে পড়ে, তার মানসিক পরিবর্তন ঘটাতে সহায়ক হয়।

ভাষা আন্দোলনের প্রয়োজন অনিবার্য হয়ে ওঠে, যখন দেখা গেল মুসলিম লীগ ও পাকিস্তান সরকার উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাঙালির মাথায় চাপিয়ে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং তা কোনো যুক্তি না মেনে। উদ্দেশ্য, পূর্ব বাংলা ও বাঙালিকে শোষণ করে পশ্চিম পাকিস্তান তথা পাঞ্জাব ও সিন্ধুর সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা। চুলোয় যাক বিজাতীয় বাঙালি।

এ ব্যাপারে পাকিস্তানের স্থপতি মোহাম্মদ আলী জিন্নাহসহ প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান এবং মুসলিম লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতা সবারই এক রা। এমনকি বাঙালি মুসলিম লীগ নেতাদের ভূমিকাও ভিন্ন নয়। তারা পূর্ববঙ্গের স্বার্থ, বাঙালির আর্থসামাজিক স্বার্থ নিয়ে মাথা ঘামাতে নারাজ। তাদের একমাত্র লক্ষ্য ব্যক্তিস্বার্থ, আর সব ভেসে যাক।

এ অবস্থায় বাঙালি তরুণ তথা ছাত্রসমাজ আশ্চর্য এক সমাজচেতনা ও ভাষাচেতনার পরিচয় রেখেছিল রাষ্ট্রভাষা বাংলার প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত করতে আন্দোলনের সূচনা ঘটিয়ে। অবশ্য, তাতে কতটা ভাষা প্রেম, কতটা রাজনৈতিক স্বার্থ, কতটা জাতীয়তাবোধ উপস্থিত ছিল তা নিয়ে আজ নিশ্চিত করে কিছু বলা কঠিন। তাত্ক্ষণিক জরিপে হয়তো কিছু না কিছু আলামত পাওয়া যেত। কিছু হিসাব মিলত। কিন্তু তা করা হয়নি। তেমন চিন্তা কারো মাথায় ছিল না।

ভাষা আন্দোলন, বিশেষ করে ১৯৫২-র একুশকে ঘিরে যে পরিমাণ আবেগের প্রকাশ ঘটেছিল তার কতটা উল্লিখিত তিন উপকরণভিত্তিক সে মাত্রাও নির্ধারিত হয়নি, এ পর্যায়ে নির্ধারণ করা বেশ কঠিন। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক পর্যালোচনায় তা দরকার ছিল। ঐ অনুপাত জানা গেলে তা বাংলা ভাষার বর্তমান দুরবস্থার বিচার ব্যাখ্যায় পূর্বোক্ত তিন বিষয়ের দায়দায়িত্বের মাত্রা বোঝা যেত। এখন তা তাত্ত্বিক অনুমানসাপেক্ষ।

ভাষা আন্দোলনের ব্যাপক সামাজিক অভিঘাত এবং জাতীয়তাবাদী চেতনার আবেগসংবলিত লড়াই শেষে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশে নানা রাজনৈতিক ঘটনার উেক্ষপে শেষ পর্যন্ত দেখা গেল জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ স্তরে বাংলা ভাষা অনুপস্থিত বা সেখান থেকে সে ক্রমে সরে যাচ্ছে। যেমন উচ্চশিক্ষায় ও উচ্চ আদালতে বাংলা অনুপস্থিত, তেমনি একই ঘটনা জীবিকার নানাদিকে। কিছু সান্ত্বনা পুরস্কার অবশ্য বাংলার জন্য রয়েছে। যেমন মাধ্যমিক শিক্ষায় দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত বাংলা মাধ্যম, সচিবালয়ে, নুি আদালতে বাংলার ব্যবহার ইত্যাদি। আন্তর্জাতিক দরবারে বিশেষত জাতিসংঘে বাংলাদেশ প্রধানের বাংলায় ভাষণ উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

এ তো গেল রাজনৈতিক-রাজনৈতিক দিককার বিচেনায় বাংলা ভাষাবিষয়ক পরিস্থিতি। কিন্তু ভাষা প্রেম? বাংলা ভাষার প্রতি মমত্ববোধ? মাতৃভাষা হিসেবে কতটা আমাদের মধ্যে উপস্থিত তা কি আমরা ভেবে দেখেছি? স্বাধীন বাংলাদেশে আমাদের মাতৃভাষা প্রেম ও মমত্ববোধ সমাজ ও রাজনৈতিক পরিচালকদের চেতনায় শ্রেণিস্বার্থের কাছে মার খাচ্ছে বিশেষ করে সর্বজনীন স্বার্থ, নুিবর্গীয় স্বার্থের প্রয়োজন মেটানোর প্রশ্নে। সেখানে শ্রেণিস্বার্থেরই প্রাধান্য।

অন্যদিকে দীর্ঘ ঔপনিবেশিক শাসনে রাজভাষা ও রাজভাষিক সংস্কৃতির প্রভাবে শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষিত এলিট শ্রেণি প্রথমোক্তকে ধারণ ও লালন করে চলেছে। বাংলা ভাষা ও বঙ্গীয় সংস্কৃতির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় অনেক দূরে থেকে যাচ্ছে। শিক্ষা ও জীবিকার ক্ষেত্রে পুরোপুরি রাজভাষা ও রাজসংস্কৃতি আমাদের নিয়ন্ত্রণ করছে—উচ্চ আদালতের সংস্কৃতি, নিয়মনীতি, আচার-আচরণ বড় উদাহরণ। সেখানে ঔপনিবেশিকতার ভূত জেঁকে বসে আছে।

আশ্চর্য যে, বিশ শতক থেকে সমাজে আধুনিকতার টানে কিছুটা পরিবর্তন ঘটলেও শিক্ষিত বাঙালি, এলিট বাঙালি পূর্বোক্ত ঔপনিবেশিক সংস্কৃতি থেকে মুক্ত হতে পারেনি, যদিও ১৯৪৭-এর আগস্টে একবার ভূরাজনৈতিক বিচারে আমরা মুক্তি তথা স্বাধীনতা লাভ করেছি। দ্বিতীয় বার ১৯৭১-এ ষোলোই ডিসেম্বরে নয়া ঔপনিবেশিকতার শাসন-শোষণ থেকে মুক্ত হয়ে ভূরাজনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করেছি।

 

যা অর্জিত হয়েছে তা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত, এলিট উচ্চ মধ্যবিত্তের শ্রেণিস্বার্থের স্বাধীনতা, বিশেষত অর্থনৈতিক সামাজিক বিচারে। সর্বজনীন অর্থনৈতিক মুক্তি মেলেনি বলে শ্রেণিবৈষম্যের বড় একটা পরিবর্তন ঘটেনি। শ্রেণিশোষণ হ্রাস পাওয়া দূরে থাক, তা আরো বেড়েছে বলে মনে হয়। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, অর্থনৈতিক উন্নয়ন রাষ্ট্রিক স্তরে যা অর্জিত হচ্ছে তার প্রায় সবটাই সুবিধাবাদী ও সুবিধাভোগী শ্রেণিরই কাজে লাগছে, তাদের সমৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। অতি সামান্য নুিবর্গীয়দের ভোগে লাগছে।

পরিস্থিতি বিচারে তাই বলতে হয়, ভাষা আন্দোলনে স্বদেশপ্রেম, ভাষাপ্রেমের উপকরণ যতটা ছিল তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল প্রচ্ছন্ন শ্রেণিস্বার্থের বিষয়টি, যদিও তা তরুণ ছাত্রসমাজে নয়, ছিল জাতীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক চেতনায়। আর জাতীয়তাবোধে এই শ্রেণিচরিত্রটিই সমাজ ও রাজনীতিতে বরাবর প্রাধান্য পেয়েছে যদিও লড়াইয়ের ময়দানে যোগ দিয়েছে জাতীয়তার জাদুকরি টানে সর্বশ্রেণির মানুষ, নুিবর্গীয়রা তো বটেই।

শেষোক্তগণের এ ভূমিকা যতটা না ভাষাপ্রেম থেকে তার চেয়ে অনেক বেশি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক চেতনার টানে বিভ্রান্ত হয়ে। তার শ্রেণিস্বার্থের চেতনা চাপা পড়েছে বা হার মেনেছে প্রবল জাতীয়তাবাদী চেতনার শক্তিমান টানে। স্বভাবতই শ্রেণিস্বার্থকে নিয়ন্ত্রক ভূমিকা পালন করতে দেখা গেছে এবং এখনো দেখা যাচ্ছে। মাতৃভাষাপ্রেম তুলনামূলক বিচারে অনেক পিছিয়ে রয়েছে।

আর সে কারণে স্বাধীন দেশে তত্ত্বগত বিচারে যা কিছু বলা হোক না কেন, বাস্তব ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিকতার প্রভাবে সৃষ্ট রাজভাষিক ও শ্রেণিস্বার্থভিত্তিক শক্তিরই প্রবল প্রাধান্য সর্বত্র দৃশ্যমান। মাতৃভাষা সেখানে পিছুটানের শিকার। লড়াইয়ের সময় তাকে সামনে রাখার প্রয়োজন ছিল, সে প্রয়োজন ফুরাতে তাকে পিছে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। ভাষিক আবেগ আসলেই ছিল শ্রেণির অর্থনৈতিক স্বার্থের আবেগ।

এ বাস্তবতারই প্রকাশ ঘটছে স্বাধীন বাংলাদেশে সামাজিক-রাজনৈতিক অঙ্গনে। সেটা মূলত মধ্যবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত এলিট শ্রেণির দাক্ষিণ্যে, তার প্রভাব কিছুটা হলেও পড়ছে নুিমধ্যবিত্ত শ্রেণিতেও। তাই দেখা যাচ্ছে মাতৃভাষা শেখার ক্ষেত্রে অবহেলা, অবহেলা ব্যবহারিক ক্ষেত্রে। নির্ভুল শেখা বা নির্ভুল বলা, লেখা ও ভাষিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে উদাসীনতা বা অনীহা যেন জলচল হয়ে গেছে।

রাজধানীতে রাস্তার দুপাশে সাইনবোর্ডে, বিলবোর্ডে ও বিজ্ঞাপনে ইংরেজির ব্যাপক দাপট, পাশে ম্রিয়মাণ বাংলা কখনো অশুদ্ধ বানানে আ্ত্তপ্রকাশ করছে অন্তর্নিহিত দীনতায়। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকের প্রতি ব্যঙ্গ ছুড়ে দিয়েই বোধ হয় নামকরণে শোভা যাচ্ছে রাজভাষার মহিমা। সে নামকরণ যেমন আবাসনে, তার চেয়ে অনেক বেশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে, এমনকি ব্যক্তিক ক্ষেত্রেও, আর ব্যাপক মাত্রায় বিপণিবিতানে।

তাই একালে জুয়েল, লিটন, রিটন, জর্জ, রিপন যেমন বহুলদৃষ্ট নাম, তার চেয়েও মহামারির ব্যাপকতায় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ইংরেজি নাম, (কখনো তা অভিনব) রাজধানী ঢাকার মর্যাদা রক্ষা করে চলেছে, বিশেষ করে ব্রিটিশ ভাইসরয় ও উচ্চবর্গীয় কর্মকর্তাদের নামাঙ্কিত রাস্তায়। বেইলি রোডের সাম্প্রতিক বিপণিবিতানগুলোর নামতালিকা থেকেই তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আধুনিকতার ঝিলিমিলি প্রকাশ পায় ‘স্টারডাস্ট’ বা ‘হ্যালো মম’-এর মতো নামের বাহারে। অবশ্য পূর্ব ঐতিহ্যমাফিক শাড়ির দোকানগুলোতে বাংলা নাম এখনো চোখে পড়ে, তবে তা কতদিন টিকে থাকবে বলা কঠিন।

একুশে চেতনার সাম্প্রতিক বিচার ব্যাখ্যায় যে পরিণাম দেখা যাচ্ছে তা শুধু দুঃখজনকই নয়, বাঙালি চৈতন্যের পক্ষে মর্মবেদনারও বটে। বিশেষ করে পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে দৃশ্যমান বাঙালিয়ানার আবেগ বিচারে। সেটা লড়াইয়ের দানা এবং বহু বাহুল্য সমাজে তা ছিল এক ধরনের উপরতলীয় আবেগ।

লড়াইয়ে শ্রেণিস্বার্থের লক্ষ্য অর্জিত হওয়ার পর স্বাধীন বাংলাদেশে ঔপনিবেশিকতার দাস মানসিকতা রাজভাষা ও রাজসংস্কৃতিকে ঘিরে প্রকাশ পেয়েছে এবং ক্রমশ তা শক্তিমান হয়ে উঠছে। যেমন শিক্ষাক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষায়তনে তেমনি জীবিকায় ও জীবনাচরণে।

অতীত রাজানুরাগী মানসিকতার হীনম্মন্যতা দু-দুটো স্বাধীনতার (১৯৪৭ ও ১৯৭১) ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন সত্ত্বেও চেতনার গভীর থেকে পুরোপুরি দূর হয়নি বলে স্বাধীন বাঙালি সমাজ এখনো ঔপনিবেশিকতার ভৌতিক পথ ধরে হাঁটছে। মনে হচ্ছে এ পথেই আমাদের ভবিষ্যত্ নির্ধারিত। আমাদের ভাষিক জাতীয়তাবোধ এক্ষেত্রে পরাজিত।

তাই শ্রেণিস্বার্থের টানে ভাষিক ও জাতীয়তাবাদী লড়াইয়ের সময় যেসব স্লোগান ও অঙ্গীকার তার সবই অতীত হয়ে গেছে। শুধু সংবিধানে টিকে রাষ্ট্রভাষা বাংলা সেখানে মাথায় চেপে বসে আছে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও ধর্মীয় চেতনা দুই সমরনায়কের কল্যাণে। কিন্তু গণতন্ত্রী-জাতীয়তাবাদী রাজনীতি এক্ষেত্রে একই পথে চলমান, তাই মাতৃভাষা সমাজে তার যোগমর্যাদা, অঙ্গীকৃত মর্যাদা পাচ্ছে না। কারণ একটাই, শাসকশ্রেণিতে জোরালো সদিচ্ছার অভাব এবং শক্তিমান আমলাতন্ত্রের আধিপত্য।

একটা কথা খুব চালু—বিশ্বায়নের প্রভাব। ­ইউরোপীয় জাতিরাষ্ট্রগুলো তো ইইউ বা বিশ্বায়নের টানে তাদের মাতৃভাষা ও ভাষিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন ঘটাচ্ছেন। ওদের অনুসারী আমরা তা ঘটাব। এ পরিবর্তনের জোরে কিন্তু আমাদের সমাজে অবস্থিত পরিবর্তন ঘটছে। নিঃসঙ্গ পরিবার আ্ত্তকেন্দ্রিক পরিবার কেউ কারো খোঁজ রাখে না। আ্ত্তস্বার্থে লীন মানবিক বোধের অভাব—এটাই  সমাজের জন্য পরিবারের সর্বনাশা পরিণাম ডেকে আনছে। আধুনিকতা নিয়েই দেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির পরিশীলিত অনুসরণে। আমরা প্রকৃত মানবিক সমাজ ও ভাষিক জাতিরাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারি। একুশের চেতনা তেমন দিকনির্দেশই করে।

 

u লেখক : ভাষা সৈনিক।