অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)
একুশ বাঙালির ভাষা শহিদ দিবস। ভাষার জন্য পৃথিবীতে রক্ত দেওয়ার মতো ত্যাগ স্বীকার করার ইতিহাস বাঙালি ছাড়া দ্বিতীয় কারো নেই। বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে একুশ এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। মায়ের ভাষায় কথা বলার দাবিতে রক্ত দিয়ে বাঙালি হয়ে উঠেছে সাড়া পৃথিবীতে ভাষার অধিকার আদায় আর ভাষা সংরক্ষণে হাজারও মানুষের যত সংগ্রাম তার মূর্ত প্রতীক। এর স্বীকৃতি এখন দেয় খোদ বিশ্বসভা। তবে আমাদের ইতিহাসে একুশের তাত্পর্য এর চেয়েও ঢের বেশি তাত্পর্যপূর্ণ। একটি স্বাধীন জাতি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধুর হাত ধরে বাঙালির যে দুর্গম পথ চলা, তার শুরুটা এই একুশেই। দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান নামক অকার্যকর রাষ্ট্রটির ৫৪ শতাংশের বেশি মানুুষের মাতৃভাষাকে অগ্রাহ্য করে মাত্র ৭ শতাংশ উর্দুভাষীর ভাষাকে বাংলার পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষায় পরিণত করার উদ্দেশ্য ছিল মূলত দুটি। একটি হচ্ছে সিংহভাগ জনগোষ্ঠীকে বিজাতীয় ভাষা আর সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হতে বাধ্য করা, যাতে তারা ক্রমেই প্রশাসনসহ সব ক্ষেত্রে আরো বেশি পিছিয়ে পড়ে। আর এর দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি ছিল বাঙালিকে তার সংস্কৃতি আর তার রবীন্দ্র-নজরুল ভুলিয়ে দেওয়া। কারণ, বাঙালির বাঙালিয়ানা একদিকে যেমন পশ্চিম পাকিস্তানিরা বুঝতে পারত না, তেমনি অন্যদিকে তারা একে হিন্দুয়ানি, ভারতঘেঁষা মনোবৃত্তি মনে করে ঘেন্না আর ভয়ের চোখেও দেখত।
’৫২-র একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার রাজপথে রক্তাত্ত প্রতিবাদের আগেও জিন্নাহর মুখের ওপরই প্রতিবাদ হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিশেষ সমাবর্তনে, যেখানে তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে তার ন্যক্কারজনক ঘোষণাটি দিয়েছিলেন। কিন্তু যেমনটি বলছিলাম, রক্তস্নাত একুশই বাঙালির স্বাধিকারের দাবিতে পথ চলার সূচনার প্রতীক। একুশকে কেন্দ্র করেই বাঙালির বাঙালিয়ানা আর বাংলাদেশ চর্চা। পাকিস্তানের অধীনে বাংলাদেশের ২৪টি বছরের অবরুদ্ধ সময়ে বাঙালির নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে একাত্তরের পথে যে প্রস্তুতি, তার প্রতি পদে পদে প্রেরণা জুগিয়েছে একুশ। বঙ্গবন্ধু আমাদের স্বাধীন এই বাসভূমির জন্য যে নামটি বেছে নিয়েছিলেন, বেছে নিয়েছিলেন যে জাতিয় সংগীত আর নির্ধারণ করে দিয়েছিলেন বাঙালিকে এক করার যে স্লোগানটি, তার সর্বত্রই ‘বাংলা’-‘বাংলাদেশ’, ‘আমার সোনার বাংলা...’, আর ‘জয় বাংলা’! সে কারণেই এ কথা বললে আদৌ অত্যুক্তি হয় না যে বাঙালির স্বাধীন রাষ্ট্র ভাবনার জন্ম একুশের ঔরসেই।
বছর ঘুরে বছরের শুরুতেই বছর বছর ফিরে আসে একুশে ফেব্রুয়ারি। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো...’ কণ্ঠে আর একুশের চেতনাকে হূদয়ে ধারণ করে সারা দেশে শহিদ মিনারে লম্বা মিছিলে ভাষাশহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায় পুরো জাতি। জানিয়েছে এবারও। করোনা থামাতে পারেনি আমাদের শহিদ মিনারে যাত্রা। একুশের শেকড় বাঙালির চেতনার গভীরে প্রোথিত। তার পরও কেন যেন মনে হয়, আমরা কেন যেন একুশের চেতনাকে পুরোপুরি আত্মস্থ করে উঠতে পরিনি। হয়তো পেরেছেন কেউ কেউ, কিন্তু পাশাপাশি পারেননি অনেকেই। পারলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বলতে হতো না ‘ব্যবসা নয়, সেবার জন্যই ক্ষমতায় দল’। আর আজ থেকে প্রায় পাঁচটি দশক আগে বঙ্গবন্ধুকেও এ দেশের ধোপ-দুরস্ত সম্প্রদায়কে তাদের দায়িত্বটুকু দফায় দফায় মনে করিয়ে দিতে হতো না।
একুশের চেতনায় বাঙালিয়ানাকে ধারণ করে যে রাষ্ট্রটির জন্ম, তার স্বপ্নদ্রষ্টা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু। তার এই স্বপ্নের বাস্তবায়নও তিনি ঠিক ঠিক করেছিলেন তার জীবদ্দশাতেই এ জাতিকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র উপহার দিয়ে। অসম্ভব এ কাজকে তিনি সম্ভব করেছিলেন পাশ্চাত্য আর দূরপ্রাচ্যের চোখরাঙানির পরোয়া না করে আর মধ্যপ্রাচ্যকে নাখোশ করে। এর খেসারত তাকে দিতে হয়েছিল সপরিবারে স্বাধীন দেশে রক্ত দিয়ে। বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত দ্বিতীয় বিপ্লবের কান্ডারি আজ তার কন্যা আমাদের শ্রদ্ধেয় বড় আপা। পথভ্রষ্ট, দিকদর্শনহীন একটি জাতিকে আবারও সঠিক পথে ফিরিয়ে আনায় তার এই যে রাত-দিন অবিরাম খেটে চলা, এর জন্য তাকেও মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে কমপক্ষে ১৯টি বার, কখনো কোটালীপাড়ায় তো কখনো বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউতে আবার কখনো চট্টগ্রামে তো কখনো সাতক্ষীরায়। তার পরও পিছপা হননি তিনি কখনোই, ঠিক যেমনটি কখনোই হননি তার পরম শ্রদ্ধেয় পিতাও। আজ আমরা যে যে পরিচয়ে আর পেশাতেই থাকি না কেন, আমরা প্রত্যেকেই এই একজন মহীয়সী নারীর অজস পূণ্যগাথা, নির্ঘুম রাত আর অজস ত্যাগের বেনিফিশিয়ারি, আমরা বেনিফিশিয়ারি ’৭৫-এর ১৫ই আগস্ট ধানমন্ডি বত্রিশের সিঁড়ি বেয়ে গড়িয়ে পড়া বঙ্গবন্ধুর পবিত্র রক্তধারার।
ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ শহিদ মিনারে সপরিবারে ফুল দেওয়ার রেয়াজ আমার পরিবারে দীর্ঘদিনের। প্রতিবার যখন একুশে শহিদ মিনারে যাই, এই কথাগুলো মনে করি আর তারপর বছর জুড়ে তালিম কত দূর করতে পারি জানি না, তবে চেষ্টাটুকু থাকে। চেষ্টাটুকু থাক সবার, এবারের একুশে এটাই আবারও প্রত্যাশা।
u লেখক : চেয়ারম্যান, লিভার বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় ও সদস্যসচিব,
সম্প্রীতি বাংলাদেশ।
