এমপি পদ হারালেন পাপুল

আপডেট : ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১, ২৩:০৪

নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে কুয়েতের আদালতে দুই বছরের বেশি কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ায় সংসদ সদস্য পদ হারালেন কাজী শহিদ ইসলাম পাপুল। তিনি লক্ষ্মীপুর-২ আসন থেকে নির্বাচিত স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ছিলেন। সাংবিধানিক এখতিয়ার বলে জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী গতকাল সোমবার তার সংসদ সদস্য পদ বাতিলের সিদ্ধান্ত দেন। কুয়েতের আদালতে রায় ঘোষণার দিন (এ বছরের ২৮ জানুয়ারি) থেকে লক্ষ্মীপুর-২ আসনটি শূন্য ঘোষণা করে গতকালই সন্ধ্যায় গেজেট জারি করেছে সংসদ সচিবালয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে কোনো সংসদ সদস্যের বিদেশে আটক ও ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত হওয়া এবং এ কারণে কারো এমপি পদ হারানোর ঘটনা এটিই প্রথম।

সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব ড. জাফর আহমেদ খান স্বাক্ষরিত গেজেটে বলা হয়েছে, ‘কুয়েতের ফৌজদারি আদালতে ঘোষিত রায়ে নৈতিক স্খলনজনিত ফৌজদারি অপরাধে চার বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন লক্ষ্মীপুর-২ থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য কাজী শহিদ ইসলাম। এ কারণে বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য নন তিনি। সে কারণে সংবিধানের ৬৭(১(ঘ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রায় ঘোষণার তারিখ (গত ২৮ জানুয়ারি) থেকে তাঁর আসন শূন্য হয়েছে।’

সংবিধানের ৬৬(২)(ঘ) অনুচ্ছেদে ‘সংসদে নির্বাচিত হইবার যোগ্যতা ও অযোগ্যতা’ সম্পর্কে বলা আছে ‘কোনো ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হওয়ার এবং সংসদ সদস্য থাকার যোগ্য হবেন না, যদি তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে অন্যূন দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন।’ কিন্তু পাপুলকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে কুয়েতের আদালত, একই সঙ্গে তাকে অর্থদণ্ডও দেওয়া হয়েছে।

সংসদের কার্যপ্রণালি বিধির ১৭৮(৪) বিধি অনুযায়ী লক্ষ্মীপুর-২ আসন শূন্য সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রচার করেন সংসদ সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব। কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী আসন শূন্য হওয়া-সংক্রান্ত গেজেটের একটি কপি দণ্ডিত পাপুলের কাছে পাঠাবে সংসদ সচিবালয়। একই সঙ্গে গেজেটের কপিসহ নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) চিঠি দেবে সংসদ সচিবালয়।

সংবিধান অনুযায়ী পাপুলের আসন শূন্য ঘোষণার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে সেখানে নির্বাচনের ব্যবস্থা নেবে নির্বাচন কমিশন। আসন শূন্যসংক্রান্ত সংসদ সচিবালয়ের চিঠি ইসির সভায় উপস্থাপনের পর সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করে তপশিল ঘোণষণার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

মানব ও অর্থ পাচারের দায়ে কুয়েতের আদালতের রায়ে দণ্ডিত পাপুলের মামলার রায়ের কপিসহ যাবতীয় নথি গত ৪ ফেব্রুয়ারি হাতে পায় বাংলাদেশ সরকার। আরবি ও ইংরেজিতে লেখা ৬১ পৃষ্ঠার রায়ের কপি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের স্পিকারের দপ্তরে ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। রায় পর্যালোচনা শেষে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী গতকাল পাপুলের সংসদ সদস্য পদ বাতিলের সিদ্ধান্ত জানান। এরপর গেজেট প্রকাশ হয়। পাপুলের আসন শূন্য ঘোষণার পর স্পিকার ইত্তেফাককে বলেন, ‘সংবিধানের আলোকেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’

অর্থ ও মানব পাচারের মামলায় গত ২৮ জানুয়ারি পাপুলকে চার বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দিয়েছে কুয়েতের আদালত। পাশাপাশি তাকে ১৯ লাখ কুয়েতি রিয়াল বা ৫৩ কোটি ১৯ লাখ ৬২ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়েছে। গত বছরের ৬ জুন রাতে কুয়েতের বাসা থেকে আটক করা হয় পাপুলকে। আটকের সাড়ে সাত মাস আর বিচারপ্রক্রিয়া শুরুর সাড়ে তিন মাসের মাথায় দণ্ডিত হন তিনি।

পাচারের শিকার পাঁচ বাংলাদেশির অভিযোগের ভিত্তিতে গত জুনে গ্রেফতারের পর পাপুলের বিরুদ্ধে মানব পাচার, অর্থ পাচার ও ব্যাবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের শোষণের অভিযোগ আনা হয়। পরে তদন্ত করে পাপুলসহ নয় জনের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, মানবপাচার, ঘুষ লেনদেন ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ভঙ্গের অভিযোগ আনে কুয়েতের পাবলিক প্রসিকিউশন। অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর পাপুলের মামলায় আনুষ্ঠানিক বিচারকাজ শুরু হয়। ২৮ জানুয়ারি আদালত যে রায় ঘোষণা করে, তাতে পাপুলের কাজে সহায়তাকারী হিসেবে কুয়েতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক কর্মকর্তা মাজেন আল জারাহ এবং কুয়েতি দুই কর্মকর্তাকেও চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ঐ দুই কর্মকর্তা ছিলেন পাপুলের বিভিন্ন কাজের মধ্যস্থতাকারী এবং এজেন্ট। পাপুলসহ দণ্ডিত প্রত্যেককে অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত করে আদালত।

কুয়েতের আদালতে পাপুলের সাজা হওয়ার বিষয়টি গত ৪ ফেব্রুয়ারি চিঠি দিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে সেখানকার বাংলাদেশ দূতাবাস। চিঠির সঙ্গে আরবি ও ইংরেজিতে লেখা রায়ের অনুলিপি এবং এ সংক্রান্ত  পেপার কাটিংসহ যাবতীয় নথিও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে দূতাবাস। নথি পাওয়ার বিষয়টি জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন শুক্রবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘উনি (পাপুল) আমাদের কাছে কোনো আইনি সহায়তা চাননি। উনি ওখানে ব্যবসায়ী হিসেবে থাকেন। আমাদের কোনো লাল পাসপোর্ট নিয়ে তিনি যাননি। উনার নিজেরই প্রয়োজনীয় স্টাবলিশমেন্ট রয়েছে। উনি ওখানকার রেসিডেন্ট, ব্যবসায়ী ছিলেন।’

কুয়েতে মানব পাচার ও ভিসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল টাকার মালিক হন পাপুল। টাকার জোরে ২০১৮ সালে লক্ষ্মীপুর-২ আসন থেকে স্বতন্ত্র এমপি হন। নিজে এমপি হওয়ার পর টাকার প্রভাবে স্ত্রী সেলিনা ইসলামকেও সংসদের সংরক্ষিত আসনের সদস্য বানান পাপুল। কুয়েতে গ্রেফতার হওয়ার পর দেশেও জ্ঞাত-আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের পৃথক দুই মামলায় পাপুলসহ ছয় জনের ৬৭০টি ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ দিয়েছে ঢাকার আদালত। মানব ও অর্থ পাচারের অভিযোগে পাপুলসহ ছয় জনের বিরুদ্ধে গত বছরের ২২ ডিসেম্বর মামলা করে সিআইডি।