জাহিদ কাজী
শতাব্দীর নাতি, যুগের ছেলে বছরের ছিল ছয় সন্তান। গ্রীষ্ম-বর্ষা-শরত্-হেমন্ত-শীত ও বসন্ত। তার মধ্যে বর্ষা ও বসন্ত ছিল মেয়ে। তাদের প্রত্যেকের উপাধি ছিল ঋতু।
বছরের বয়স হয়ে যাচ্ছে বলে তিনি একবার ছয় ঋতুকে ডেকে রাজ্য পরিচালনার ভার দিতে চাইলেন। ছয় ঋতুকেই তিনি ভীষণ ভালোবাসেন। কিন্তু প্রথম হেমন্তকেই রাজ্য পরিচালনার ভার দিতে চাইলেন রাজা বছর। এ ঘোষণা মেনে নিতে পারল না উগ্র-স্বভাবের গ্রীষ্ম। হইচই করে নাস্তানাবুদ করল সভা। বর্ষা তো কেঁদে-কেটে অস্থির। তাকে কেন প্রথম রাজ্যশাসনের ভার দেয়া হলো না, সেজন্য।
অবশেষে উগ্র গ্রীষ্ম জোর খাটিয়ে প্রথমবার রাজ্য শাসনের ভার নিজের হাতে নিল। ঘোরা দাবড়িয়ে রাজ্যের সবাইকে জানাল, দু-মাসের জন্য সে এ রাজ্যের রাজা হয়েছে। কেউ তার অবাধ্য হলে কালবৈশাখী ঝড় দিয়ে সব তছনছ করে দেবে।
রাজ্যময় শোরগোল উঠল—গ্রীষ্ম রাজা অত্যাচারী হবে বটে। এমন কথা শুনে গ্রীষ্ম ঠিকঠিকই কালবৈশাখীকে পাঠিয়ে দিয়ে তাদের তছনছ করে দিলো। লণ্ডভণ্ড করে দিলো।
এমন কাণ্ড দেখে অন্যরা বেশ ব্যথিত। কাঁদুনে বর্ষা, গ্রীষ্মের দরবারে এসে কান্না করল। গ্রীষ্ম রাগী হলেও বোনের এমন কান্না সইতে না পেরে বর্ষার কাছে তার ক্ষমতা হস্তান্তর করল। বর্ষারানি কেঁদেকেটে হলেও নতুন করে রাজ্য পরিচালনার ভার নিল। কিন্তু সে আবেগের বশবর্তী হয়ে এমন কাঁদল যে রাজ্যে বন্যা হয়ে গেল। তার কান্নার কারণে কেউ ঠিকমতো কাজকর্ম করতে পারল না। এই ব্যর্থতার দায় নিয়ে সে শরতের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করল।
বর্ষার বৃষ্টি-বন্যায় রাজ্য যেন ধুয়েমুছে পরিষ্কার হলো। শরতের সময়টা ছিমছাম গোছাল হলো। বর্ষারানির রেখে যাওয়া ক্ষতিগ্রস্ত রাজ্য বিদ্যা-বুদ্ধি দিয়ে কিছুটা হলেও উন্নতি করল শরত্। পুরোদমে রাজ্য পরিচালনা করতে থাকল। কোন দিক দিয়ে যে নির্ধারিত সময় চলে গেল তা যেন টেরই পেল না। হেমন্ত একদিন তার সামনে যখন খাড়া হলো তখন শরতের মনে হলো এখন দায়িত্ব হস্তান্তরের পালা এসেছে। শরত্ তা-ই করল।
হেমন্ত একটু আনন্দ-উত্সবপ্রিয়। তার সময়ে রাজ্যে ফসল ফলে। ঘরে ঘরে নবান্নের উত্সব পড়ে যায়। নতুন ফসল বোনা হয়।
আনন্দে আনন্দে সময়টা যে কোনদিক দিয়ে যায় তা যেন বুঝতেই পারে না হেমন্ত। দরজায় এসে কড়া নাড়ে শীত। এভাবে আনন্দে-আহ্লাদে রাজ্য চালালে কিছুদিনের মধ্যেই দেউলিয়া হতে হবে বলে সতর্কবার্তা পাঠায় সে। আগাম নির্বাচনের জন্য রাজা বছরের কাছে প্রস্তাবনা পেশ করে ঠাণ্ডা মাথার কূটবুদ্ধিসম্পন্ন এই ঋতু।
হেমন্তের মতিগতি দেখে আগেভাগেই সিংহাসন দখল করে নেয় শীত। একরোখা শীতের শাসন মেনে নিতে চায় না প্রজারা। কষ্ট বেড়ে যায় তাদের। নির্ধারিত সময় পার হলেও জোর করে ক্ষমতায় থাকতে চায় শীত। বসন্তকে আসতে দিতে চায় না।
কিন্তু বিচারক কোকিলের ঘোষণায় সিংহাসন ছাড়তে অনেকটা বাধ্য হয় শীত। সিংহাসনে আরোহণ করে বসন্ত। তার সময় শীতের ঠাণ্ডা থেকে প্রজাকে বাঁচাতে সে রোদের ব্যবস্থা করে। রাজ্যময় ফোটে ফুল আর ফুল। গাছ পুরনো পাতা ছেড়ে নেয় নতুন পাতা। এককথায় নতুন করে সাজে প্রকৃতি। নতুন করে সাজে তার রাজ্য। তবে শেষের দিকে প্রচণ্ড দাবদাহে প্রজারা অতিষ্ঠ। মাঠ ফেটে চৌচির হয়।
এসব দেখে গ্রীষ্ম আবারও কালবৈশাখীকে পাঠিয়ে জোর করে সিংহাসন দখল করে ক্ষমতায় বসে।
