হারুকি মুরাকামি
ভাষান্তর : ফারুক মঈনউদ্দীন
জাপানি কথাসাহিত্যিক হারুকি মুরাকামির জন্ম জানুয়ারি ১৯৪৯। তিনি যে একজন সিরিয়াস ম্যারাথন দৌড়বিদ, একথা তাঁর অনেক পাঠকেরই হয়তো জানা নেই। তাঁর বয়স যখন ৩৩, তখন প্রথম দৌড়বিদ হিসেবে অবতীর্ণ হন তিনি। ততদিনে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর তিনটি গ্রন্থ। দৌড় বিষয়ে তাঁর স্মৃতিকথা ‘হোয়াট আই টক অ্যাবাউট হোয়েন আই টক অ্যাবাউট রানিং’-এর বাংলা অনুবাদ ‘দৌড় বিষয়ে যতকথা’
প্রতিটি সাক্ষাত্কারেই আমাকে জিগ্যেস করা হয় একজন ঔপন্যাসিকের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কোন গুণটি থাকতে হয়। এটা খুব স্পষ্ট : মেধা। কতখানি উদ্যম ও চেষ্টা লেখায় দেওয়া হচ্ছে, তাতে কিছু আসে যায় না, যদি কারও সাহিত্য-মেধা না থাকে তাহলে তাকে ঔপন্যাসিক হওয়ার চিন্তা ভুলে যেতে হবে। এটা থাকা প্রয়োজনীয় গুণের চেয়ে বরং অনেক দরকারি পূর্বশর্ত। যদি তেলই না থাকে, তাহলে সবচেয়ে ভালো গাড়িটিও তো চলবে না।
মেধার সমস্যাটা হচ্ছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে মেধার অধিকারী ব্যক্তিটি এটির পরিমাণ বা গুণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। হয়তো পরিমাণটা যথেষ্ট নয়, বাড়ানো দরকার, কিংবা এটিকে দীর্ঘমেয়াদি করতে মিতব্যয়ী হওয়া উচিত, কিন্তু কোনো ক্ষেত্রেই সবকিছু এত সহজে কাজ করে না। মেধার রয়েছে নিজস্ব মন, যখন সে চায় পানির মতো ভরে ওঠে, আর যখন শুকিয়ে যায়, ব্যস, শেষ। অবশ্যই বিশেষ কিছু কবি ও রক শিল্পী, যাঁদের প্রতিভা যশের দ্যুতি থেকে নিভে গিয়েছে—শুবার্ত১ বা মোত্সার্টের২ মতো মানুষ, যাঁদের অকালমৃত্যু তাঁদের কিংবদন্তিতে পরিণত করেছে—তাঁদের একটা নির্দিষ্ট আবেদন রয়েছে, অথচ আমাদের অধিকাংশই এই আদর্শ অনুসরণ করি না।
আমাকে যদি জিগ্যেস করা হয়, ঔপন্যাসিকের দ্বিতীয় প্রয়োজনীয় গুণটি কী, সেটিও সহজ : মনঃসংযোগ—একটা বিশেষ সময়ে যা কিছু অত্যাবশ্যক, তার ওপর সীমিত মেধার সবটুকু নিবদ্ধ করা। এটা ছাড়া সারবান কিছু সমাধা করা যায় না, কার্যকরভাবে মনঃসংযোগ করে অনিয়মিত মেধা, এমনকি ঘাটতিও পুষিয়ে নেওয়া যায়। আমি রোজ সকালে সাধারণত তিন থেকে চার ঘণ্টা মনোযোগ দিয়ে কাজ করি। লেখার টেবিলে বসে যা লিখছি, তার ওপর সম্পূর্ণভাবে মনঃসংযোগ করি আমি। অন্য কিছু দেখি না, অন্য কিছু নিয়েও ভাবি না। একজন ঔপন্যাসিক, যাঁর প্রচুর মেধা এবং মাথাভর্তি নতুন আইডিয়া আছে, তিনিও, ধরা যাক দাঁতের প্রচণ্ড ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছেন, তাহলে কিছু লিখতে পারবেন না। ব্যথা তাঁর মনোযোগকে রুদ্ধ করে দেয়। আমি যখন বলি মনঃসংযোগ ছাড়া কোনো কিছু সম্পন্ন করা যায় না, তখন এ কথাটাই বোঝাতে চাই।
মনঃসংযোগের পর একজন ঔপন্যাসিকের জন্য চূড়ান্তভাবে সবচেয়ে দরকারি জিনিসটা হচ্ছে সহিষ্ণুতা। দৈনিক তিন থেকে চার ঘণ্টা লিখে এক সপ্তাহ পর যদি পরিশ্রান্ত হয়ে যায় কেউ, তার পক্ষে বড় কোনো লেখা সম্ভব হবে না। একজন ফিকশন লেখক—অন্তত যিনি উপন্যাস লিখতে চান—তাঁর জন্য দরকার প্রতিদিন ছয় মাস কিংবা এক বছর বা দুই বছর ধরে প্রতিদিন নিজ শক্তিকে সংহত করা। এটাকে শ্বাসপ্রশ্বাসের সাথে তুলনা করা যায়। মনঃসংযোগ যদি শ্বাস ধরে রাখার মতো হয়, তাহলে সহিষ্ণুতা হচ্ছে ফুসফুসে বাতাস ধরে রেখে ধীরে নিঃশব্দে শ্বাস ফেলার মতো। যদি দুটোর মধ্যে ভারসাম্য রাখা না যায়, তাহলে দীর্ঘ সময় ধরে পেশাদারিত্বের সাথে উপন্যাস লেখা কঠিন। শ্বাস ধরে রেখে নিশ্বাস নেওয়ার মতো ব্যাপার এটা।
সৌভাগ্যক্রমে এই দুই শাখা—মনঃসংযোগ ও সহিষ্ণুতা—মেধা থেকে আলাদা, যেহেতু এগুলো অনুশীলনের মাধ্যমে পাওয়া কিংবা চোখা করা যায় না। এগুলো শেখা ও অনুশীলন করা যায় প্রতিদিন লেখার টেবিলে বসে নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর মনঃসংযোগ করে। এটা একটু আগে লেখা পেশির অনুশীলনের মতো। নিজের লক্ষ্যবস্তুকে নিরবচ্ছিন্নভাবে সারা শরীরে সঞ্চালিত করতে হয় এবং প্রতিদিন লেখার জন্য হাতে যে কাজ আছে, তাতে মনঃসংযোগ করে প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো আত্মস্থ করার বিষয়টা নিশ্চিত করতে হয়। যা করার সক্ষমতা আছে, তার সীমাকে ক্রমে বাড়াতে হয়। এভাবে একেবারে অলক্ষেই ঊর্ধ্বসীমাটা বাড়বে। প্রতিদিন দৌড়ালে যে প্রক্রিয়ায় পেশি শক্তিশালী হয় এবং একজন দৌড়বিদের দৈহিক গঠন উন্নত হয়, এটাও ঠিক তেমনই। কিছু একটা উদ্দীপনা যোগ করে সেটাকে ধরে রাখতে হবে এবং তার পুনরাবৃত্তি করতে হবে। এই প্রক্রিয়ায় অবশ্যই ধৈর্য থাকতে হবে, আর আমি নিশ্চয়তা দিতে পারি, এতে ফল আসবেই।
একটা ব্যক্তিগত চিঠিতে রহস্যগল্প লেখক রেমন্ড শ্যান্ডলার৩ একবার স্বীকার করেছিলেন যে তিনি যদি কিছু না-ও লেখেন, তবু প্রতিদিন অন্তত একবার টেবিলে বসে মনঃসংযোগ করেন। তাঁর এটা করার কারণ আমি জানি। একজন পেশাদার লেখকের যে শারীরিক সক্ষমতা দরকার, নীরবে নিজের ইচ্ছাশক্তিকে সবল করে সেটা এভাবেই আয়ত্ত করতেন শ্যান্ডলার। এই ধরনের প্রাত্যহিক অনুশীলন তাঁর কাছে অপরিহার্য ছিল।
আমার কাছে উপন্যাস লেখা মূলত একধরনের শারীরিক শ্রম। লেখাটা মানসিক শ্রম হলেও একটা আস্ত বই লিখে শেষ করা শারীরিক শ্রমের কাছাকাছি। এটাতে ভারোত্তোলন, দ্রুত দৌড় কিংবা উল্লম্ফন অন্তর্ভুক্ত নয়। অধিকাংশ মানুষ কেবল লেখার ওপরের বাস্তবতাটা দেখতে পায় এবং ভাবে লেখকেরা তাঁদের লেখার ঘরে বসে নীরব বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে জড়িত থাকেন। কারও যদি একটা কফির পেয়ালা তোলার মতো শক্তি থাকে, মানুষ ভাবে তিনি উপন্যাসও লিখতে পারেন। কিন্তু কাজটা করার জন্য হাতে নিলে সহসাই দেখা যায় যেমনটি মনে হয় এটা তেমন শান্তিপূর্ণ কাজ নয়। লেখার টেবিলে বসা, লেজার রশ্মির মতো মনঃসংযোগ করা, একটা শূন্য দিগন্ত থেকে কোনো কিছু কল্পনা করে তুলে আনা, একটা কাহিনি নির্মাণ করা, একটার পর একটা সঠিক শব্দ বাছাই করা, গল্পের পুরো প্রবাহকে নিজপথে ধরে রাখা—এই পুরো প্রক্রিয়াটায় এমন দীর্ঘ সময় ও শক্তির প্রয়োজন হয়, যা অধিকাংশ লোক কল্পনাও করতে পারে না। এ কাজে হয়তো এদিক-সেদিক শরীর নাড়াতে হয় না, কিন্তু ভেতরে ভেতরে কঠোর গতিশীল পরিশ্রম করতে হয়। চিন্তা করার সময় সবাই তাদের মনকে ব্যবহার করে। কিন্তু একজন লেখক বর্ণনাভঙ্গি নামের একটা ভূষণ ধারণ করেন, চিন্তা করেন তাঁর সমগ্র সত্তা দিয়ে। ঔপন্যাসিকের জন্য এই প্রক্রিয়ায় তাঁর সম্পূর্ণ শারীরিক সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে হয়, যা প্রায়ই অতিপ্রয়োগের পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
পরিশ্রমে কার্পণ্য না করার মতো মেধাসম্পন্ন লেখকেরা অবচেতনেই এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যান, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এ ব্যাপারে বিস্মৃতও থাকেন তাঁরা। বিশেষ করে যখন তাঁরা তরুণ থাকেন, যত দিন তাঁদের একটা নির্দিষ্ট মাত্রার মেধা থাকে, তাঁদের পক্ষে উপন্যাস লেখা তেমন কঠিন কাজ নয়। তাঁরা সকল ধরণের বাধাকে অতিক্রম করতে পারেন। তরুণ হওয়া মানে কারও সারা শরীর একটা স্বাভাবিক প্রাণশক্তিতে ভরপুর থাকা। কেন্দ্রীভূত করার ক্ষমতা ও সহ্যক্ষমতা যখনই প্রয়োজন এসে যায়, এসব নিজে থেকে চাইতে হয় না। কেউ যদি তরুণ ও মেধাসম্পন্ন হয়, সেটা হয় দুটো ডানা থাকার মতো।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে যৌবন নিভে যেতে থাকলে এ-জাতীয় মুক্তাবয়বের শক্তি তার স্বাভাবিক তেজ ও ঔজ্জ্বল্য হারিয়ে ফেলে। একটা নির্দিষ্ট বয়স পার হওয়ার পর, আগে যেসব কাজ সহজে করা যেত, সেসব আর তত সহজ থাকে না—ঠিক যেমন সময়ের সাথে বেসবলের একজন ফাস্ট বোলারের গতি ফসকে যেতে শুরু করে। অবশ্যই, মানুষ যখন পরিপক্ক হয়, তখন তার পক্ষে স্বাভাবিক মেধার পড়তিটাকে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। ঠিক যেমন একজন ফাস্ট বোলার স্লো পিচের ওপর ভরসা করে নিজেকে দক্ষতর বোলারে রূপান্তরিত করেন। তবে তারও রয়েছে সীমা এবং সেখানে আবশ্যিকভাবেই একটা ক্ষতিবোধ থাকে।
অন্যদিকে যেসব লেখক মেধার তেমন আশীর্বাদপুষ্ট নন—যাঁরা সবে একটা প্রয়োজনীয় মানে ওঠার পথে—তাঁদের নিজ প্রয়াসে শক্তি গড়ে তুলতে হয়। বিষয়ের ওপর কেন্দ্রীভূত করার ক্ষমতা এবং সহ্যক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নিজেকে প্রশিক্ষিত করতে হয় তাঁদের। কিছুমাত্রায় এই সব গুণকে তাঁদের মেধার স্থলাভিষিক্ত করতে হয়। তাঁরা যখন বেশ আয়াসে এসব করেন, তখন তাঁরা আসলে তাঁদের ভেতর লুক্বায়িত মেধাকে আবিষ্কার করেন। পায়ের কাছে শাবল দিয়ে গর্ত খুঁড়ে তাঁরা ঘর্মাক্ত হয়ে পড়েন, তারপর আচমকা পেয়ে যান একটা গভীর গোপন জলের ধারা। এটা ভাগ্যের ব্যাপার, কিন্তু এই সৌভাগ্য সম্ভব হয় তাঁদের অনুশীলনের কারণে, যা তাঁদের খুঁড়ে যাওয়ার শক্তি জোগায়। আমার ধারণা, দেরিতে প্রস্ফুটিত লেখকদের সবাই এই একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছেন।
স্বভাবতই দুনিয়ায় এমন লোক আছেন (নিশ্চিতভাবে হাতে গোনা), যাঁরা প্রচুর মেধা নিয়ে সুখী, যা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কখনোই ম্লান হয় না, যাঁদের লেখা সব সময়ই সর্বোচ্চ মানের হয়। এই সৌভাগ্যবানদের যে জলধারা তা কখনোই শুকিয়ে যায় না, কতবার এখান থেকে জল তোলা হলো, তাতে কিছুই আসে যায় না। সাহিত্যের জন্য এটা এমন কিছু, যার জন্য কৃতজ্ঞ থাকতে হয়। শেক্সপিয়ার, বালজাক বা ডিকেন্সের মতো ব্যক্তিত্বদের বাদ দিয়ে সাহিত্যের ইতিহাস কল্পনা করা কঠিন। এসব বিশাল আকারের মানুষেরা শেষাবধি বিশালাকৃতিরই থাকেন—ব্যতিক্রমী কিংবদন্তিতুল্য ব্যক্তিত্ব। বাকি বেশির ভাগ লেখক যাঁরা এই উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেন না, (অবশ্যই আমিসহ) তাঁদের যেকোনো উপায়ে সম্ভব মেধার ভাণ্ডারে যে অভাব থাকে, তার ঘাটতি পূরণ করতে হয়। অন্যথায় তাঁদের পক্ষে কোনো মানসম্পন্ন উপন্যাস লিখে যাওয়া সম্ভব হয় না। এই ঘাটতি পূরণের জন্য লেখকদের যে পন্থা ও গতিপথ নিজ থেকে গ্রহণ করতে হয়, সেটা সেই লেখকের স্বাতন্ত্র্যে পরিণত হয়, যা তাঁকে বিশেষ করে তোলে।
অনুবাদকের টীকা :
১. ফ্রানজ পিটার শুবার্ট (১৭৯৭—১৮২৮) : অস্ট্রিয়ান গীতিকার। আয়ুষ্কাল কম হওয়া সত্ত্বেও তিনি রেখে গেছেন সাতটি সম্পূর্ণ সিম্ফনিসহ ছয় শতাধিক কণ্ঠসংগীত।
২. উলফগাং আমাদিউস মোত্সার্ট (১৭৫৬—৯১) : ধ্রুপদি যুগের প্রভাবশালী গীতিকার। পরবর্তী সময়ের পাশ্চাত্য সংগীতে তাঁর গভীর প্রভাব রয়েছে।
৩. রেমন্ড থর্নটন শ্যান্ডলার (১৮৮৮—১৯৫৯): ইঙ্গ-মার্কিন ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার। তিনি লেখালেখির জগতে আসেন একজন গোয়েন্দা কাহিনি লেখক হিসেবে। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘দ্য বিগ স্লিপ’ প্রকাশিত হয় ১৯৩৯ সালে।
