মিনার মনসুর

আপডেট : ২৪ জানুয়ারি ২০১৯, ২০:৩৫

আমার আজব ঘোড়া

যে-শহরে আমাদের বেড়ে ওঠা— সেটি ছিল পাহাড়বেষ্টিত। যখনতখন আমরা পাহাড় ভ্রমণে যেতাম। বড়োরা যেত সমুদ্রস্নানে। বাতাসে ভেসে বেড়াতো তাদের অলৌকিক মেয়েবন্ধুদের শিহরণজাগানো সব গল্প। ঢেউয়ের ডানায় চেপে ‘লাল দোপাট্টা’ উড়িয়ে তারা আসতেন।

সব ওলটপালট হয়ে গেল হঠাত্। আমি যখন স্কুলের পোশাক পাল্টাচ্ছিলাম ঠিক তখনই বিদঘুটে একটি পাহাড় আমাদের শহরের ওপর চড়াও হয়েছিল। সেটা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না— সবাই জানতো।

নগরবাসী বিস্ময়করভাবে আত্মগোপন করেছিল স্বনির্মিত এক বিষণ্নতার কুয়োয়। সাগরপাড়ের এই মানুষগুলোকে আমি চিনতাম। বংশানুক্রমিকভাবে তারা ছিল লড়াকু।

আমার ঘোড়াটিও তখন অদ্ভুত আওয়াজ করছিল। আমি কোমলস্বরে জিজ্ঞেস করি : ‘তুমিও কি ভয় পেলে নাকি, বাছা?’ প্রতিবাদে সে দু’পায়ে দাঁড়িয়ে যায়— যেন গর্জমান আগুনের শিখা। আমি এক লাফে চেপে বসি সেই অগ্নিরথে। পাহাড় পিছু হটেছিল।

বন্ধুরা মাথা নাড়ে। তাদের সংশয়— ঘোড়া আবার উড়তে শিখলো কবে!

০০০০০

আমার বালখিল্যতা দেখে ঘোড়াটি হাসত

ঘোড়াটি সবই জানত। ত্রিকালদর্শী অভিধাটি ঠিক তার বেলায় খাটে না; তবে কীভাবে যেন আগেভাগেই সে সব জেনে যেত। দেখতে পেত মুদ্রার উভয়পিঠ। অথচ তার মুখটি ছিল প্রস্তরনির্মিত। অজস্রবার হাতবদল হয়েছে তার। কিন্তু কেউ তাকে ঘুমাতে দেখেনি। এমনকি তার জন্মবৃত্তান্তও কেউ জানে না।

মিথ্যে বলব না। ঘন কুয়াশার আলখেল্লার ভেতর থেকে সূর্য যখন মাথা বের করছিল, আমি তখন ঘাসফড়িং আর প্রজাপতির পেছনে ছুটছি। কান পেতে শুনছি বৃক্ষ আর লতাগুল্মের ফিসফিসানি। প্রত্যেকেরই নিজস্ব ভাষা ছিল। নিঃসঙ্গতাই আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিল সেই ভাষা। অতুলনীয় তার সম্মোহন। প্রেমিকারা ক্ষুব্ধ হবে তবু বলি, ঘাসের ডগায় জমে থাকা শিশির আমাকে যতটা শিহরিত করেছে— মেয়েরা ততটা কখনোই নয়।

আমার হাফপ্যান্টের পকেটদুটি ভরে গিয়েছিল তখনই। কত কিছুই না ছিল সেখানে! দোয়েলের শিস, ঘুঘুর প্রেমগান, ডানাভাঙা প্রজাপতির আর্তনাদ আর বুড়ো বকুলের মৃতসঞ্জীবনী ঘ্রাণ...। আমি চাইতাম, মাতৃঘ্রাণে ম-ম করা শীত-সকালের সোনারঙ উষ্ণতাটুকু আমাকে জড়িয়ে থাকুক সর্বক্ষণ।

আমার বালখিল্যতা দেখে ঘোড়াটি হাসত। কারণ সর্বত্র প্রসারিত ছিল তার সদাজাগ্রত চোখ।