প্রথিতযশা সাংবাদিক, গবেষক ও কলাম লেখক সৈয়দ আবুল মকসুদ আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আকস্মাত্ তাঁর এ চলে যাওয়া মেনে নিতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। এর থেকেও বেশি উদ্বেগ কাজ করছে। উদ্বেগ এজন্য যে, তাঁর মৃত্যুতে যেন নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর সীমিত হয়ে না আসে। ধর্মীয় সংখ্যালঘু কিংবা ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষের ন্যায্য দাবিতে তিনি যেমন সোচ্চার ছিলেন, তেমনটি খুব কমই দেখেছি। দেশের প্রগতিশীল চিন্তা, গবেষণা এবং আন্দোলনের অন্যতম অগ্রণী এই মানুষটির প্রয়াণে যে শূন্যতা সৃষ্টি হলো তা সহজে পূরণ হবার নয়। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রাক্কালে—নিঃসন্দেহে এটা বিরাট ক্ষতি।
সৈয়দ আবুল মকসুদ আমৃত্যু লেখা-পড়া আর গবেষণায় ডুবে ছিলেন। সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি যেসব কলাম লিখেছেন, তাতেও ছিল চিন্তার গভীর ছাপ। বিচিত্র বিষয় নিয়ে লিখেছেন। গবেষণা, জীবনী, ভ্রমণকাহিনি, কবিতা— সাহিত্যের সকল শাখাতেই ছিল তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে তিনি বেশকিছু লেখার পরিকল্পনা নিয়েছিলেন। জানি না কতটা সম্পন্ন করে যেতে পেরেছেন।
প্রথাগত পণ্ডিতেরা যেসব বিষয় উপেক্ষা করতেন, সৈয়দ আবুল মকসুদ সেসব বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন। যখনই তাঁর মনে হয়েছে কোনো বিষয় মানুষের জানা দরকার, তিনি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে প্রকাশ করেছেন। তথ্য সংগ্রহের জন্য দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছেন, এমনকি বিদেশেও। গবেষণা যাদের প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব, গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অর্থ পান, তাদের অনেকেই মকসুদ ভাইয়ের মতো নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেন না। অথচ তিনি নিজের আয়ের অনেকাংশই ব্যয় করেছেন গবেষণার কাজে।
দেখা হলেই তিনি তাঁর গবেষণা নিয়ে কথা বলতেন। কলকাতার এক মুদির দোকান থেকে গান্ধীর ডায়েরি উদ্ধারের গল্প বলতেন, গান্ধী আশ্রমের গল্প বলতেন। সেসব গল্প আমার মতো হয়তো অনেককেই বলেছেন। ‘গান্ধী মিশন ডায়েরি’ বইয়ের তথ্য-উপাত্তের জন্য তিনি একাধিকবার ভারতে গিয়েছেন, নোয়াখালীর গান্ধী আশ্রমে গিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট অনেকের সঙ্গে কথা বলেছেন, বহু বইপত্র সংগ্রহ করেছেন। এমন নিষ্ঠার সঙ্গেই তিনি গবেষণা করে গেছেন। গবেষণাকর্মের জন্য নিশ্চয়ই সৈয়দ আবুল মকসুদ স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
দেশ-রাজনীতি সচেতন সৈয়দ আবুল মকসুদের অবস্থান সবসময় মানুষের পক্ষে ছিল। শোষিত-নিপীড়িত মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আমৃত্যু নিয়োজিত থেকেছেন। সেটা লেখালেখির মাধ্যমে, রাজপথে অবস্থান নিয়ে—এমনকি সারাদেশ ঘুরে অন্দোলনে অংশ নিয়ে। কেবল লেখার মধ্যেই তাঁর জীবনসাধনা সীমিত রাখেননি। যেখানে অন্যায় দেখেছেন, কথা বলেছেন স্পষ্ট ভাষায়, লিখেছেন শাণিত শব্দে। দেশের যে প্রান্ত থেকে ডাক এসেছে—ছুটে গেছেন, একাত্মতা পোষণ করেছেন। প্রয়োজনে একা দাঁড়িয়েছেন শহিদ মিনার, প্রেসক্লাবে। নির্যাতনও সহ্য করেছেন, কিন্তু পিছপা হননি কখনো। যখন মনে করেছেন মানুষের অধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে, সুশাসন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, পরিবেশ বিপন্ন হতে পারে—তিনি সরব হয়েছেন, লিখেছেন, পথে নেমেছেন। সাদাকে সাদা বলেছেন স্পষ্ট ভাষায়, অন্যকে পথ দেখিয়েছেন যুক্তির মাধ্যমে।
ব্যক্তিগতভাবে আমার সঙ্গে পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা সত্তরের দশক থেকে, কথাশিল্পী শান্তনু কায়সারের সূত্রে মকসুদ ভাই প্রথম ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসেন। ১৯৮৩ সালে সাহিত্য একাডেমি প্রতিষ্ঠার পর যোগাযোগ আরো নিবিড় হয়। আশির দশকে সৈয়দ আবুল মকসুদকে সম্মাননা জানানোর মাধ্যমে সাহিত্য একাডেমি সম্মাননা প্রদান শুরু করে। অধ্যাপক হরলাল রায় তখন সাহিত্য একাডেমির সভাপতি, আমি সাধারণ সম্পাদক। বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন সৈয়দ আবুল মকসুদ, কিন্তু সাহিত্য একাডেমির সম্মাননা এবং পরবর্তী সময়ে প্রদানকৃত খান মোহাম্মদ স্মৃতি পুরস্কারের কথা স্মরণে রাখতেন।
সাহিত্য একাডেমির প্রায় সকল উত্সবে, আন্দোলনে মকসুদ ভাই ছিলেন সামনের সারির। মানিকগঞ্জে জন্ম হলেও অনেকেই তাঁকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ মনে করতেন—একথা মকসুদ ভাই নিজেই আমাকে বহুবার বলেছেন।
সৈয়দ আবুল মকসুদের প্রতিবাদী মানস সকলেরই জানা। তাঁর প্রতিবাদের ভাষা অভিনব, কোমল কিন্তু শাণিত এবং দৃঢ়। ২০০৩ সালের মার্চে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার প্রতিবাদে তিনি পশ্চিমাদের উদ্ভাবিত সেলাই করা কাপড় পরা ছেড়ে সেলাইবিহীন ধবধবে সাদা কাপড় পরতে শুরু করেন। সেই থেকে ঘরে-বাইরে তাঁর পরনে এই পোশাকই শোভা পেত। ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি লেখক হুমায়ুন আজাদ আক্রান্ত হলে প্রতিবাদে ‘হুমায়ুন আজাদের ওপর আঘাত-ফ্যাসিবাদের নগ্নরূপ’ শিরোনামে কলাম লেখেন সৈয়দ আবুল মকসুদ। ১ মার্চ একটি জাতীয় দৈনিকে তা প্রকাশিত হয়। সেসময় সৈয়দ আবুল মকসুদ বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) উপপ্রধান বার্তা সম্পাদক। সরকার থেকে লেখালেখি বন্ধ করার চাপ দেওয়া হলে তিনি চাকরি ছেড়ে দিলেন, কিন্তু চাপের মুখে নতি স্বীকার করেননি।
হূদয়ের ঔদার্যে মানুষকে কাছে টেনেছেন সৈয়দ আবুল মকসুদ। তাঁর মধ্যে কোনো সংকীর্ণতা ছিল না। ছিল না অহমবোধ। পোশাকে-আশাকে, চলনে-বলনে অতি সাধারণ ছিলেন তিনি। যা বিশ্বাস করতেন, কর্মে তারই প্রতিফলন ছিল। তাঁর লেখা নিপীড়িত মানুষকে শক্তি জোগাবে, সম্মানের সাথে মাথা তুলে বাঁচতে শেখাবে। প্রতিবাদের আলো ছড়িয়ে তিনি বিরাজ করবেন মানুষের প্রাণে। বিদায় হে সাদা সন্ত।
সৈয়দ আবুল মকসুদ [২৩ অক্টোবর ১৯৪৬—২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২১]
