সাগরকন্যার ছবিয়াল

আপডেট : ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ১৯:০৪

সূর্যটা যেন সমুদ্রের পানি থেকে উঠে আসছে। এখনো চারদিকে কুয়াশা আর ঝিরিঝিরি বাতাস। গায়ে চাদর জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছি। পেছন থেকে কেউ একজন আমাকে ডাক দিলো। বললো, স্যার আপনার ছবিটা অনেক সুন্দর করে তুলছি, নিয়ে যান না। ঘাড় ঘোরাতেই দেখি হলুদ জামা গায়ে এক ছেলে দাঁড়িয়ে, হাতে ক্যামেরা। তার ছবি দেখে আমি মুগ্ধ। এই ছবির কাছে তার টাকা নিশ্চই তুচ্ছ! ছেলেটির নাম সাজেদ। ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সাগরকন্যা কুয়াকাটায় ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে থাকে ছেলেটি। এটাই তার পেশা। যত বেশি ছবি তুলতে পারবে ততো বেশি আয়। সাজিদের মতো এমন অনেক ছবিয়াল আছে, যারা পুরোটা দিন এই সাগরকন্যার কোলঘেঁষে ক্যামেরা হাতে দাঁড়িয়ে থাকে জীবিকা নির্বাহের তাগিদে।

কুয়াকাটার প্রকৃতির নৈসর্গ বিশেষ করে সমুদ্রের ঢেউয়ের গর্জন আর মনমাতানো ঝিরঝির বাতাসে প্রাণজুড়ে যায়। পরিবার ও প্রিয়জনকে নিয়ে যারা ঘুরতে আসেন তাদের স্মৃতিগুলো ধরে রাখতে ফটোগ্রাফারের বিকল্প নেই। যদিও যুগের হাওয়ায় মোবাইল ফোন এসেছে, তবুও প্রাণের তৃষ্ণা মেটাতে ফটোগ্রাফারদের চাই-ই চাই।

সাগরকন্যা কুয়াকাটাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠেছে স্টুডিও ব্যবসা। এসব স্টুডিওর মাধ্যমে প্রায় দুইশতাধিক ক্যামেরাম্যান সমুদ্র সৈকতের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত ছুটে বেড়াচ্ছেন। ছবি তুলবেন বলে চলছে সারাদিনই ছুটোছুটি। ছবির প্রয়োজনে নামছেন সাগরের পানিতেও। ডিএসএলআর লেন্সওয়ালা ক্যামেরা ঝুলানো গলায় আর কাঁধে ক্যামেরা ব্যাগ। সবার গায়ে হলুদ রঙয়ের জার্সি। পর্যটক ও দর্শনার্থীরা সহজে ফটোগ্রাফারকে চিনতে পারে সেজন্য এই পোশাক। ছবিকে আকর্ষণীয় করার জন্য সঙ্গে রেখেছেন রোদ চশমা, ক্যাপসহ আনুষাঙ্গিক জিনিসপত্র।

মূলত স্টুডিও মালিকদের বেতনভুক্ত ক্যামেরাম্যান এরা। সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত বিচ এলাকায় ছবি তোলার কাজ করেন তারা। প্রতি ছবি মেমোরি কার্ডে দিলে ১০ টাকা আর ফোরআর সাইজের একটি ছবি প্রিন্ট করে দিলেই স্টুডিও মালিক পান ২৫ টাকা। মাস শেষে ক্যামেরাম্যানরা ১৫ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা পেয়ে থাকেন। এসব কথা জানান মাসুদ নামের এক ফটোগ্রাফার। ২৩ বছর বয়সী এই তরুণ অনেকদিন ধরেই সাগরপাড়ে ছবি তুলছেন।

মাসুদের মতো রবিন, জনি, জলিল, শান্ত ও রবিউলও এখানে ছবি তোলেন। তাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এরা কেউ ফটোগ্রাফির প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেনি। তবে দেখতে দেখতে দক্ষ হয়ে উঠেছেন তারা। অনেকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন ফটোগ্রাফিকে। মুহূর্তে তুলে দিচ্ছেন পছন্দের ছবি।

সৈয়দপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ আর্মি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয়বর্ষের ছাত্র রওনক জামান হূদয় তার বাবা-মা ও মামার সাথে সাগরকন্যা কুয়াকাটায় বেড়াতে এসেছেন। তিনি বলেন, কুয়াকাটার পরিবেশ, নিরাপত্তা সবই সুন্দর। কুয়াকাটায় আরো পর্যটক টানার জন্য যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি সরকারের দৃষ্টি প্রয়োজন। পর্যটক ও দর্শনার্থীরা সমুদ্র সৈকতে যেখানে সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলছেন, সেদিকে কর্তৃপক্ষের সজাগ দৃষ্টি প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

বরগুনার পাথরঘাটা থেকে আসা গৃহবধূ লিজার সাথে কথা হয় সি বিচে। তিনি বলেন, মৌসুম, ঈদ ও উত্সবে প্রচুর ভিড় হয়। তাই ভিড় এড়াতে স্বামী-সন্তানসহ এ সময় বেড়াতে এসেছেন সাগরকন্যা কুয়াকাটায়। তবুও প্রতিটি আবাসিক হোটেলে সিট নেই এমন অবস্থা। খাবার হোটেলগুলোতে বাসি খাবার বিক্রি হচ্ছে। দামও বেশ চড়া।