ল্যাটিন আমেরিকার দেশ ভেনিজুয়েলার অবস্থা এখন টালমাটাল। সেখানকার রাজনৈতিক উত্তাপ তুঙ্গে উঠিয়াছে। গতকাল বিবিসির শেষ খবর অনুযায়ী ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো যুক্তরাষ্ট্রের সহিত সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করিয়াছেন। তিনি সেই দেশটির কূটনীতিকদের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে দেশত্যাগের নির্দেশ দিয়াছেন। বিরোধী দলীয় নেতা জুয়ান গুয়াইদোকে অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্বীকৃতি দেওয়ার পর এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হইয়াছে। কিন্তু সেই দেশের কূটনীতিকরা ভেনিজুয়েলা ছাড়িয়া চলিয়া যাইতে অস্বীকৃতি জানাইয়াছেন। তাহাদের মতে, মাদুরো এখন একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট এবং তাহার এইরূপ নির্দেশ দেওয়ার কোনো অধিকার ও কর্তৃত্ব নাই। ইহার আগে রাজধানী কারাকাসসহ বিভিন্ন শহরে মাদুরোর পদত্যাগ দাবিতে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। বিক্ষোভ চলাকালে সৃষ্ট সংঘর্ষে সেখানে গত কয়েকদিনে নিহত হইয়াছে অন্তত ১৪ জন। অর্থাত্ সব মিলাইয়া ভেনিজুয়েলার অবস্থা সংকটাপন্ন।
ভেনিজুয়েলায় আজ যাহা ঘটিতেছে তাহা ষাটের দশকের রাজনৈতিক চিত্রকেই যেন আবার তুলিয়া ধরিতেছে। স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলিতে অস্থিরতা প্রায় লাগিয়াই থাকিত। একের পর এক ক্যু-পাল্টা ক্যু, বিপ্লব-প্রতিবিপ্লব ছিল যেন একটি সাধারণ ঘটনা। ইতোমধ্যে রাশিয়া, চীন, তুরস্ক ও মেক্সিকো ভেনিজুয়েলায় যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যুত্থান চেষ্টার কড়া সমালোচনা করিয়াছে। বলিভিয়া ও কিউবা মাদুরোর পক্ষাবলম্বন করিয়াছে। আর তরুণ নেতা গুয়াইদোকে সমর্থন দিতেছে দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্র ব্রাজিল, কলম্বো, চিলি, পেরু, ইকুয়েডর, আর্জেন্টিনা ও প্যারাগুয়ে। কানাডাও তাহাকে সমর্থন দিতেছে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চাহিতেছে নূতন নির্বাচন। আর সুপ্রিম কোর্ট ও সেনাবাহিনীর অধিকাংশ মাদুরোর পক্ষে থাকায় স্পষ্টভাবে বোঝা যাইতেছে যে, ভেনিজুয়েলা আজ দুইভাগে বিভক্ত এবং দুই শিবিরেই প্রায় সমান জনসমর্থন ও শক্তি রহিয়াছে। আসলে ভেনিজুয়েলার বর্তমান সংকটের মূলে রহিয়াছে সেখানকার সাধারণ নির্বাচন। গত মে মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠানের পর চলতি মাসে তিনি প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ গ্রহণ করেন। কিন্তু বিরোধীরা নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে তাহা বয়কট করে। মাদুরো ২০১৩ সালে হুগো শ্যাভেজের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন।
এখানে স্পষ্ট দেখা যাইতেছে, যাহারা নির্বাচনে হারিয়া গিয়াছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাহাদের পক্ষাবলম্বন করিয়াছে। তাহারা বলিতেছে ইহাই সঠিক। অথচ বিশ্বের কোনো দেশের নির্বাচনই আজ ত্রুটিমুক্ত নহে। এমনকি যাহারা অন্য দেশে গণতন্ত্র রফতানি করেন এবং ইহা লইয়া নানা নসিহত করেন, খোদ সেইসব দেশেও নির্বাচন ও নির্বাচনী ব্যবস্থা লইয়া প্রশ্ন উঠিতে দেখা যায়। সামপ্রতিককালে ইভিএম লইয়াও বিভিন্ন দেশে প্রশ্ন উঠিয়াছে। অর্থাত্ কোনো নির্বাচনই বিতর্কের ঊর্ধ্বে নহে। কিন্তু নিজেদের নির্বাচন লইয়া যখন প্রশ্ন ওঠে, তখন তাহারা মানিয়া নেন। কিন্তু অন্যের ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপের জন্য সেনাবাহিনী পর্যন্ত পাঠানো হয়। ভেনিজুয়েলায় যাহা ঘটিতেছে তাহা অত্যন্ত দুঃখজনক। শক্তিশালী দেশগুলির অন্যায় হস্তক্ষেপ কাম্য নহে। ল্যাটিন আমেরিকার ইতিহাসে দেখা যায়, উগ্রপন্থি কমিউনিস্টদের তাড়াইতে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা করা হইয়াছে। ইহা করিতে গিয়া সংঘটিত হইয়াছে প্রতিবিপ্লব। বর্তমানে ল্যাটিন আমেরিকায় মার্কিনপন্থি কোনো সরকার নাই। অন্য দেশে নাক গলানোর ফল যে শুভ হয় না, ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলিই তাহার প্রমাণ।
আমরা বারবার বলিয়া আসিতেছি যে, বিশ্ব মোড়লদের উচিত নিজেদের দেশের নাগরিকদের সমস্যা লইয়াই সীমাবদ্ধ থাকা। কিন্তু চোরা না শোনে ধর্মের কাহিনি। যেকোনো শাসনব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্যও হইল, জনগণ যাহা চাহেন, তাহার বাস্তবায়ন করা। নিজেদের ভাগ্য নিজেদের গড়িতে দিলে কোনো দেশেই অশান্তি ও অস্থিতিশীলতা থাকিবে বলিয়া মনে হয় না।
