বাইশে জানুয়ারি বিশ্ব মিডিয়ায় সবচাইতে বড় খবর ছিল, আফগানিস্তানের নিরাপত্তা ঘাঁটিতে তালেবান বাহিনীর দুর্ধর্ষ আক্রমণ এবং তাতে ১২৬ জন আফগান সেনা সদস্য নিহত। ২০১৮ সালের আগস্ট মাসের পর এটাই ছিল তালেবানদের আরেকটি বড় আক্রমণ এবং হতাহতের ঘটনা। বাংলাদেশের প্রায় সব পত্রিকায়ই খবরটি গুরুত্ব সহকারে ছাপা হয়, কোনো কোনো পত্রিকা এই খবরকে প্রধান হেডলাইনও করেছে। এর সঙ্গত কারণ রয়েছে। আফগান পরিস্থিতির অবনতি হলে এবং সেখানে তালেবানি শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে তার বিরূপ প্রভাব পড়বে বাংলাদেশসহ পুরো অঞ্চলের ওপর। সমস্ত বিদেশি সেনাবাহিনী আফগানিস্তান থেকে উত্খাত এবং পুনরায় সেখানে কট্টর শরিয়াপন্থি ইসলামিক শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুদ্ধরত তালেবান বাহিনীর মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদের ভাষ্য মতে, ২১ জানুয়ারির আক্রমণে তারা ১৯০ জন আফগান সরকারের মুরতাদ বাহিনীর সদস্যকে হত্যা করতে সক্ষম হয়েছে। এটাকে তারা বিশাল সাফল্য বলে দাবি করছে।
দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের একটা আপস ফর্মূলা বের করার জন্য তালেবানদের প্রতিনিধি দল যখন আমেরিকার বিশেষ দূত জালসে খলিলজাদের সঙ্গে কাতারে আলোচনার টেবিলে বসা— ঠিক তখনই এ রকম একটা রক্তক্ষয়ী দুর্ধর্ষ সফল আক্রমণ চালিয়ে তালেবান বাহিনী বুঝিয়ে দিল সহজে তারা পিছু হটবে না। এক সপ্তাহ আগে খোদ রাজধানী কাবুলে কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেদ করে আরেকটি আক্রমণ চালায় তালেবান বাহিনী এবং তাতে পাঁচজন নিহত ও ১১০ জন আহত হয়। ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে স্বল্প সময়ের জন্য তালেবান বাহিনী পুরো গজনী প্রদেশ দখলে নিতে সক্ষম হয় এবং তাতে সরকারি বাহিনীর ১৫০ জন সৈন্য নিহত হয়। পশ্চিমা বিশ্বের সামরিক বিশ্লেষকদের ভাষ্য মতে, প্রতিনিয়তই আফগান সরকারি বাহিনীর হতাহতের সংখ্যা বেড়েই চলেছে; যদিও সরকারের পক্ষ থেকে কখনো হতাহতের সঠিক সংখ্যা প্রকাশ করা হয় না। আফগান প্রেসিডেন্ট আশরাফ ঘানির নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ২৮ হাজার সরকারি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য নিহত হয়েছে।
এই যে চিত্র তার মাধ্যমে ক্রমশই যে বিষয়টি স্পষ্ট হচ্ছে তা হলো, আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্ব কর্তৃক গত ১৭ বছর ধরে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে চালিত যুদ্ধের লক্ষ্য পুরোটাই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হতে যাচ্ছে। এই ব্যর্থতার বীজ রোপিত হয় তখনই, যখন আফগানিস্তানের পরিস্থিতি স্থিতিশীল ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসার পূর্বেই ২০০৩ সালের মার্চ মাসে সাদ্দাম হোসেনকে উত্খাত করার জন্য ইরাকে সামরিক অভিমান চালায় আমেরিকা। এখন বোঝা যাচ্ছে, আমেরিকান সেনাবাহিনীর এক ঢিলে তিন পাখি মারার কৌশল ব্যর্থ হয়েছে। তখন আমেরিকান সেনাবাহিনীর হয়তো এমন একটা পরিকল্পনা ছিল যে, ভৌগোলিকভাবে পূর্বে আফগানিস্তান এবং পশ্চিমে ইরাক থেকে ইরানের বিরুদ্ধে একটা বড় আকারের ঝটিকা সামরিক অভিযান চালিয়ে যদি ইরানের ইসলামিক রিজিমের পরিবর্তন ঘটানো যায় তাহলে সেটা হবে আমেরিকার মধ্যপ্রাচ্য নীতির সবচেয়ে বড় সাফল্য। কিন্তু আমেরিকার ক্যালকুলেশন ভুল ছিল— সেটা এতদিনে প্রমাণিত হয়েছে।
সব বিবেচনায় আফগানিস্তান ও ইরাক থেকে ইরানের অবস্থান ও শক্তির মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছে। তাই একই সঙ্গে ইরানকে আবার করতলে নিয়ে আসার যে তৃতীয় লক্ষ্য আমেরিকার ছিল তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। বরং হিতে বিপরীত হয়েছে। ২০১২ সাল থেকে ইরাকে আমেরিকার সীমিত আকারের সেনা উপস্থিতির সুযোগে পূর্বের যেকোনো সময়ের চাইতে সেখানে ইরানের প্রভাব এখন অনেক বেশি। অন্যদিকে ২০১৫ সালে আফগান সরকারি বাহিনীর হাতে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিয়ে মাত্র ১৪ হাজার সেনা রেখে বাকি মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করার পর থেকে পরিস্থিতি ক্রমশই সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণের বাইরে যেতে শুরু করে, যা এখনো অব্যাহত আছে। নতুন বছরের শুরুতে যে রিপোর্ট আসছে তাতে দেখা যায়, পাকিস্তানের প্রক্সি তালেবান বাহিনী বিশাল আয়তনের আফগানিস্তানে এক-চতুর্থাংশেরও বেশি অঞ্চল নিজেদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। আমেরিকা প্রথম থেকেই চেষ্টা করে আসছে যাতে আফগানিস্তানের নিজস্ব সেনাবাহিনী শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং নিজেরাই রাষ্ট্রের নিরাপত্তা রক্ষায় যথেষ্ট হয়। কিন্তু সে চেষ্টাও এখন মনে হচ্ছে ব্যর্থ হয়েছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন ২০১৭ সালের পূর্বে থাকা ১৪ হাজারের সঙ্গে নতুন করে আরো পাঁচ হাজার সেনা মোতায়েন করে। লক্ষ্য ছিল তার মাধ্যমে আফগানিস্তানের নিজস্ব সেনাবাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানো এবং পাকিস্তানকে এই মর্মে বার্তা দেওয়া যে, তারা যদি তালেবান বাহিনীর ওপর থেকে সকল প্রকার সমর্থন প্রত্যাহার না করে তাহলে আফগানিস্তানে আমেরিকান সেনা উপস্থিতি আরো বৃদ্ধি করা হবে। তাতেও পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি। বরং পরিস্থিতি দিনদিনই তালেবান বাহিনীর পক্ষে চলে যাচ্ছে এবং পাকিস্তানও পূর্ণ উদ্যমে তালেবান বাহিনীকে সব রকমের সাহায্য দিয়ে যাচ্ছে।
আফগান সরকারি বাহিনী যুদ্ধের পরিপূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার পর ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩০ হাজার আফগান সেনা সদস্য যুদ্ধে নিহত হয়েছে। তালিকায় তার অতিরিক্ত বেসামরিক মানুষ রয়েছে আরো প্রায় তিন হাজার। সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়ার জন্য নতুন করে লোক পাওয়া যাচ্ছে না। বরং অনেক সেনা সদস্য বাহিনী ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ২০০১ সাল থেকে গত ১৭ বছর সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত আমেরিকান সেনাবাহিনী অনেকটাই রণক্লান্ত বলে মন্তব্য করছেন আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকগণ। আফগান যুদ্ধে এ পর্যন্ত আমেরিকার ট্রিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে, নিহত হয়েছে প্রায় আড়াই হাজার সেনা সদস্য এবং আহত হয়েছে আরো ২০ হাজার। এ অবস্থায় এখন সবার সঙ্গে আপসরফা করে একটা মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তন চাইছে আমেরিকা। এ উপলক্ষে আফগান-বংশোদ্ভূত জালসে খলিলজাদকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিয়োগ দিয়েছেন বিশেষ দূত হিসেবে। আফগান পরিস্থিতি নিয়ে এক প্রকার কঠিন উভয় সংকটে পড়েছে আমেরিকা। গ্রাউন্ডে যুদ্ধ করা এক বিষয়, আর শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রতিপক্ষের সঙ্গে টেবিলে বসে দর কষাকষি করা অন্য বিষয়। যুদ্ধের চেয়ে সেটি আরো বেশি কঠিন কাজ। আমেরিকান দূত খলিলজাদ ইতোমধ্যে তালেবানদের সঙ্গে তিন দফা আলোচনা করেছেন। তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে সব পক্ষের আবার সৌদি আরবে বসার কথা রয়েছে। আলোচনার টেবিলে তালেবান প্রতিনিধি বলছেন, তারাই আফগানিস্তানের একমাত্র আইনত বৈধ সরকার, আমেরিকার সেনাবাহিনী ২০০১ সালে তাদের অবৈধভাবে ক্ষমতা থেকে উত্খাত করেছে। সুতরাং আফগান জনগণের পক্ষে কথা বলার অধিকার শুধু তাদেরই রয়েছে।
তাই আমেরিকার পুতুল সরকার আশরাফ ঘানির কোনো প্রতিনিধির সঙ্গে তারা এক টেবিলে বসবে না। তালেবানদের বিকল্প প্রস্তাব হলো, আমেরিকাসহ সব বিদেশি সৈন্য সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করে নেওয়া হোক, তারপর তারা আশরাফ ঘানি সরকারের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ও বোঝাপড়া করে নিবে। বিদেশিদের কোনো হস্তক্ষেপ তারা চায় না। দুটি প্রস্তাবের যেকোনো একটা গ্রহণ করা মানে আফগানিস্তানে আবার তালেবান সরকার ফিরে আসা, অথবা তালেবানদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া। তাতে আমেরিকাসহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের গত ১৭ বছরের যুদ্ধ এবং তার জন্য রক্তক্ষরণ ও অর্থ ব্যয় সবই বৃথা হয়ে যাবে। আফগানিস্তানে তালেবান সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া মানে, সেখানে ভারতের আর কোনো সংশ্লিষ্টতা থাকবে না। পাকিস্তানের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে এবং পুরোপুরি ২০০১ সালের পূর্বাবস্থায় ফিরে যাবে আফগানিস্তান। আইএস, আল কায়েদা এবং অত্র অঞ্চলের সকল দেশসহ বিশ্বের জঙ্গি-সন্ত্রাসীদের আশ্রয়স্থল হবে আফগানিস্তান এবং তাদের সবার পরিচালক হিসেবে থাকবে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। ভারতে, বিশেষ করে কাশ্মিরে এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়বে। তবে আমেরিকা তার নিজের নিরাপত্তার স্বার্থে এমনটি হতে দিবে তা এখনো মনে হচ্ছে না। পেন্টাগনের নীতি-নির্ধারকদের ধারণা আফগানিস্তান থেকে পুরোপুরি হাত গুটিয়ে নিলে এক সঙ্গে এই অঞ্চল থেকে আমেরিকার জন্য নতুন করে দ্বিমুখী হুমকির সৃষ্টি হবে। প্রথমত, ২০০১ সালের পূর্বাবস্থার মতো আল কায়েদা শক্তিশালী হবে এবং তারা বিশ্বব্যাপী আমেরিকার স্বার্থের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আক্রমণ জোরদার করবে, যেমনটি তারা করেছিল নব্বই দশকের শেষের দিকে। দ্বিতীয়ত, আফগানিস্তানে নিয়ন্ত্রণ না থাকলে পাকিস্তানের ওপর থেকেও আমেরিকার নজরদারি ও প্রভাব বহুলাংশে হ্রাস পাবে। তাতে একদিকে যেমন চীন-রাশিয়ার পূর্ণ প্রভাববলয়ে চলে যাবে পাকিস্তান, তেমনি পাকিস্তানের পারমাণবিক বোমা যদি সেনাবাহিনীর কট্টরপন্থিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায় তাহলে সেটা ইসরাইলসহ পুরো উপমহাদেশের নিরাপত্তার জন্য ভয়ঙ্কর হুমকি সৃষ্টি করবে।
n লেখক: রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক
