নুজহাত নূর সাদিয়া
গণতন্ত্রের সূতিকাগার বলে বিশ্বব্যাপী পরিচিত ব্রিটিশ পার্লামেন্ট। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে এক নতুন ব্রিটেনের জন্ম দেওয়া সবচেয়ে সফল ব্রিটিশ নেতাটি কি আকাশের ওপার হতে এক দারুণ মর্মবেদনায় ছটফট করছেন না তার অতি সাধের জন্মভূমির করুণ দ্বিধাবিভক্তি দেখে। তারই হাত ধরে জন্ম নেওয়া ঐতিহ্যবাহী ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির উত্তরসূরিরা যেন সিদ্ধান্ত নামক এক অনিশ্চয়তার ঘেরাটোপে বন্দি। টোরি দলের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে তো তাঁর রাজনৈতিক আচরণে ‘আয়রন লেডি’ খ্যাত মার্গারেট থ্যাচারকেও টেক্কা দিয়েছেন।
রেফারেন্ডাম পরবর্তী ক’টি বছর পার হয়ে গেল, হবে হবে করেও নানা আলাপ-আলোচনার অজুহাতে গাধার সামনে মূলা ঝুলিয়ে রাখার মতো আমজনতাকে এতটাদিন বোকা বানিয়ে রেখেছিলেন দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা। তবে দায়িত্ব হতে পালিয়ে বেড়িয়ে আর কতদিন? শেষ অবধি চলতি মাসে জন্ম নিলো সে বহুল কাঙ্ক্ষিত প্রশ্নের উত্তর, হ্যাঁ ব্রিটেন ভীতু নয়— দেশটি প্রকৃত গণতন্ত্রকে শ্রদ্ধা করে। বাস্তবতার নিরিখেই এমপিদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ব্রেক্সিট বাস্তবায়নে না-সূচক ভোট দিয়েছে। একরোখা থেরেসা মে শত চেষ্টা করেও এ দোদুল্যমান মানসিকতার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করতে পারেননি।
পরাজিত প্রধানমন্ত্রী কি এ বিশ্বায়নের যুগে দেশের স্বার্থ রক্ষার্থে আপসের পথে হাঁটবেন না তাঁর স্বেচ্ছাচারী মনোভাবের আর একটি মনোজ্ঞ নাটক সংসদে প্রদর্শন করবেন? ব্রিটেনের পার্লামেন্টের দেয়ালে দেয়ালে এখনও শোভা পায় ইরাক যুদ্ধের সে ভয়াবহ বীভত্সতার ছবি। আর এ ইরাক যুদ্ধের মূল হোতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের চোখও আজ দেশটির ভবিষ্যত্ চিন্তায় অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। সময়ের পটপরিবর্তনে যুদ্ধবাজ লেবারটি আজ লেবার প্রধান বামপন্থি করবিনের অনুগামী।
সানডে টাইমসের শিরোনাম অনুযায়ী ইতোমধ্যে জানা গিয়েছে এমপি ডোমিনিক ক্লার্ক আর সংসদীয় পিয়নের মধ্যে এক গোপন লেন-দেনের এক বিস্ফোরক পরিকল্পনা— যারা প্রকৃত অর্থেই ঠেকিয়ে দিতে চেয়েছে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বহির্গমনকে। ফাঁস হওয়া এই স্পর্শকাতর বিষয়টি নিঃসন্দেহে থেরেসার বজ্রকঠিন সুরটিকে নমনীয় করে তুলেছে। প্রতিবেশী দেশ আয়ারল্যান্ডের সাথে এক দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন থেকে তাঁর প্রণোদিত চুক্তিটি সরিয়ে ফেলতে চাইছিলেন তিনি। তাঁর বিরোধী পক্ষ লেবার পার্টির অধিকাংশ এমপি দ্ব্যর্থহীনভাবেই তাঁর প্রস্তাবিত পরিকল্পনাটিকে ঠিক বাস্তবসম্মত বলছে না।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মী ডেভিড ক্যামেরন রাজনৈতিক জুয়া খেলায় এক হেরে যাওয়া বাজিকর। তাঁর প্রস্তাবিত প্রথম রেফারেন্ডামটি এখনও দড়ির উপর ঝুলন্ত। সামাজিক সংঘর্ষের ধুয়া তুলে মে দ্বিতীয় রেফারেন্ডাম বাস্তবায়নে স্বাভাবিকভাবেই তেমন কোনো আগ্রহ দেখাননি। যদিও সংসদীয় এমপিদের একটি বড় অংশ রের্কডসৃষ্টিকারী না-বোধক ভোটের পর বিরতিহীন মিটিং করেছেন মে’র প্রধান ডেপুটি লিডিংটনের সঙ্গে। ব্রিটেনবাসীর সঙ্গে প্রতিশ্রুত সততা বজায় রাখার উপর জোর দিয়েছেন মে, তথাপি তরুণ এমপি লেবারের কুপারের সজোর উচ্চারণ: কেন মে’র প্রস্তাবিত পরিকল্পনাটিতে সংসদে একটি বর্ডার লাইন টেনে দেওয়া হচ্ছে না? তা না হলে কী করে আমরা বুঝতে পারব তাঁর কথার সাথে কাজের মিল আছে? ২৬ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যদি ব্রাসেলসের সাথে চুক্তিটি বাস্তবায়ন না হয় তাহলে ইচ্ছাকৃতভাবেই ব্রেক্সিট বাস্তবায়নে দেরি করাটা ভালো হবে। মে’র দেওয়া লিখিত বক্তব্যে উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতিগুলো হলো:
* সংসদ অবশ্যই একটি সঠিক উদ্যোগ নিবে ইউরোপের সাথে ব্রিটেনের পরবর্তী দরকষাকষিতে।
* সরকার গোপনীয় কমিটি সেশনের মাধ্যমে সকল সদস্যকে সর্বশেষ তথ্য প্রদান অব্যাহত রাখবে।
* হাউস অফ কমন্সে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাথে প্রতি ছয় মাসের কার্যক্রম পুনরায় বিবেচনা করা হবে।
* তিনি গভীরভাবেই ব্যবসায়ী, সুশীল সমাজ আর ট্রেড ইউনিয়নের সঙ্গে দৃঢ় সম্পর্ক বজায় রেখে কর্মক্ষেত্রে বেতনভুক্ত কর্মীদের কাজের অধিকার বজায় রাখতে চান।
ঘণ্টাপ্রতি কাজের হিসেবে যেদেশে কর্মমূল্য নির্ধারিত হয়, সেখানে অনাবাসী ইউরোপীয়দের ব্রেক্সিট পরবর্তী ব্রিটেনে স্থায়ী ফি ৬৫ পাউন্ড নির্ধারণ করা আপাতদৃষ্টিতে হয়ত-বা খুব একটা বেশি নয়। ব্রিটেনে সেটেলমেন্টের জন্য পুরো পাঁচ বছরের অপেক্ষা তাও হয়তো এ গতির যুগে অধিবাসীদের কাছে নিছক সময় চুরি বলে মনে হতে পারে। তবে সব ছাপিয়ে বোদ্ধা রাজনীতিবিদদের এ সমস্ত ভারী চিন্তাকে দূরে ঠেলে আমজনতার সরস উক্তি: ব্রেক্সিট তো এখনও আলোর মুখ দেখেনি, অথচ সুপার মার্কেটগুলোতে ব্রিটেনের সবচেয়ে পরিচিত সবজি ব্রুকলির দাম গিয়ে ঠেকেছে একলাফে ৪৫ পেন্স হতে ৭৯ পেন্সে। আর এশিয়া ও ইউরোপিয়ান দেশগুলো হতে আগত জিনিসপত্রের দামও ঊর্ধ্বমুখী। নাগরিকবৃন্দ রাজনীতির জটিল খেলায় অভ্যস্ত নয়, তারা চায় সাধ ও সামর্থের মধ্যেই খেয়ে-পরে সুখে বেঁচে থাকতে। কিন্তু রাজনীতির দাবার চাল নিয়ে যারা নিত্য ঘুঁটিবাজি খেলছেন তারা কি জনতার মন পড়তে পারছেন?
শত বছর আগে, পলাশীর প্রান্তরে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদেদৗলার আক্ষেপভরা উক্তি ছিল: কে দেবে আশা কে দেবে ভরসা? ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী মে-ও কি নিজের অজান্তে মনের ভেতর প্রতিনিয়ত আউড়ে চলেছেন সেরকমই কোনো অনুচ্চ পঙিক্তমালা!
n লেখক:এলবিপিসি, লন্ডন
