দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার তথ্য আগেই কিভাবে জানল পি কে হালদার

আপডেট : ০১ মার্চ ২০২১, ২৩:০৫

হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারে জড়িত পি কে হালদার আছেন কানাডায়। ঐ দেশে যাওয়ার আগে তিনি যাতে কোনোভাবেই বাংলাদেশ ত্যাগ করতে না পারেন, সেজন্য ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছিল দুদক। ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের হাতে ঐ চিঠি পৌঁছানোর প্রায় এক ঘণ্টা আগেই যশোরের বেনাপোল চেকপোস্ট দিয়ে দেড় বছর আগে দেশত্যাগ করেন পি কে হালদার। দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার এমন অতিগোপনীয় চিঠির বিষয়বস্তু পি কে হালদার কীভাবে জানলেন বা তাকে কে অবহিত করল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এ প্রসঙ্গে দুদকের কৌঁসুলি মো. খুরশীদ আলম খান ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি, হয়তো ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের কাছে যাওয়ার পরই এটা ফাঁস হয়েছে। এখন সরকারের উচিত বিষয়টি তদন্ত করে দেখা যে, এখানে কারো কোনো গাফিলতি আছে কি না। তবে দুদকের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর গাফিলতি থাকার প্রশ্নই আসে না। কারণ গোপনীয় কাজটি অতিগোপনীয়ভাবেই করে থাকে দুদক। তবে রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ কে এম আমিনউদ্দিন মানিক বলেন, ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ আমাকে বলেছে যে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞার চিঠিটি দুদক ডাকযোগে না পাঠিয়ে বিশেষ বার্তাবাহকের মাধ্যমে পাঠালে হয়তো পি কে হালদারের বিদেশ গমন রোধ করা সম্ভব হতো।

চারটি ননব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে পি কে হালদার ও তার সহযোগীদের আত্মসাত্ করা অর্থের পরিমাণ কয়েক হাজার কোটি টাকা। এই চার প্রতিষ্ঠান হলো ইন্টারন্যাশনাল                 লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস লিমিটেড, ফাস ফাইন্যান্স, পিপলস লিজিং ও রিলায়েন্স ফাইন্যান্স। নিজ আত্মীয়স্বজন ও সহযোগীদের দ্বারা নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান তৈরি করে পি কে হালদার এই অর্থ আত্মসাত্ করে কানাডায় পালিয়ে যান। হাজার হাজার কোটি টাকা কানাডা, সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করেন। এসব প্রতিষ্ঠানের অর্থ পাচার নিয়েও তদন্ত অব্যাহত রেখেছে দুদক ও বিএফআইইউ। কীভাবে পি কে হালদার নিজে ও তার সহযোগীদের নিয়ে বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন, তার নথিপত্র হাইকোর্টে দাখিল করা হয়েছে। সম্প্রতি এসংক্রান্ত অর্থ পাচার মামলার শুনানিতে পি কে হালদারের দেশত্যাগের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য চায় হাইকোর্ট। দুদক ও আইজিপিকে এ বিষয়ে তথ্য দাখিল করতে নির্দেশ দেয় আদালত।

হাইকোর্টে দাখিল করা তথ্যে যা বলা হয়েছে

হাইকোর্টের নির্দেশনার পর দুদক ও ইমিগ্রেশন আদালতে তথ্য দাখিল করে। দুদকের দেওয়া তথ্যে দেখা যাচ্ছে, পিপলস ও ইন্টারন্যাশনাল লিজিংসহ বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাত্ ও পাচারে জড়িত পি কে হালদারের বিরুদ্ধে ২০১৯ সালের ১৪ অক্টোবর প্রথম অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরু করে দুদক। অনুসন্ধানে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচারের বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত পাওয়ায় তিনি যাতে বিদেশে যেতে না পারেন, সেজন্য ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেয় দুদক। ২০১৯ সালের ২২ অক্টোবর দুদকের দেওয়া ঐ চিঠি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ইমিগ্রেশনে পাঠানো হয়। সেখানে বিদেশ গমনে নিষেধাজ্ঞার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ইমিগ্রেশনকে অনুরোধ করে দুদক।

এ প্রসঙ্গে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের বরাত দিয়ে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আমিনউদ্দিন মানিক বলেন, ডাকযোগে পাঠানো অতিগোপনীয় ঐ চিঠি পরদিন ২৩ অক্টোবর বিকাল সাড়ে ৪টায় পায় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ। এরপর প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে বিকাল ৫টা ৪৭ মিনিটে বিমানবন্দরসহ দেশের সব স্থলবন্দরে পি কে হালদারের বিদেশ গমনের নিষেধাজ্ঞার আদেশ জারি করা হয়। দুদকের চিঠিপ্রাপ্তি ও আদেশ জারির আগেই ঐ দিনই বেলা ৩টা ৩৮ মিনিটে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে দেশত্যাগ করেন পি কে হালদার। তিনি বলেন, বিদেশ গমনে দুদকের নিষেধাজ্ঞার চিঠিতে পি কে হালদারের পাসপোর্ট নম্বর ছিল না। এই পাসপোর্ট নম্বর সংগ্রহ করে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।

দুদকের কৌঁসুলি বলেন, তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে অনুসন্ধানকাজ পরিচালনার অংশ হিসেবে পি কে হালদারের বিদেশ গমন রোধে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা হয়। দেখা যাচ্ছে, দুদকের ঐ চিঠি ২০ ঘণ্টার মধ্যেই হাতে পায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কাজেই এখানে দুদকের কোনো গাফিলতি নেই।