একইসঙ্গে ভারত ও চীনকে কীভাবে সামলাবেন শেখ হাসিনা

আপডেট : ২৫ জানুয়ারি ২০১৯, ০৩:৪৯

চীনের ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোডে’ বাংলাদেশের যোগ দেওয়া নিয়ে ভারতের চিন্তিত হওয়ার কোনো কারণ নেই বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সম্প্রতি ভারতীয় টেলিভিশন চ্যানেল সিএনএন নিউজ এইটিনের সঙ্গে এক সাক্ষাত্কারে তিনি বলেন, গোটা পৃথিবী এখন একটি গ্লোবাল ভিলেজে পরিণত হয়েছে। এই মুহূর্তে সবার জন্যই অর্থনৈতিক দিকটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। চীনের এই উদ্যোগের মাধ্যমে যোগাযোগ ব্যবস্থা বা কানেক্টিভিটির অগ্রগতি হবে এবং তার ফলে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে সবকটি দেশ। এই পরিকল্পনায় ভারতেরও যুক্ত হওয়া উচিত বলে শেখ হাসিনা মন্তব্য করেছেন।

শেখ হাসিনা আরো বলেছেন, ভারত একটি বড় অর্থনীতির দেশ, তার এ নিয়ে চিন্তিত হওয়া উচিত নয়। ভারতের যদি বিষয়টি নিয়ে আপত্তি থাকে, তাহলে এ নিয়ে আলোচনা হতে পারে এবং আলোচনার মাধ্যমেই যেকোনো ইস্যু সমাধান হতে পারে।

২০১৩ সালে ‘ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ নামে একটি উন্নয়ন কৌশল ও কাঠামো উপস্থাপন করেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। এই পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে বিশ্বের ৬০টি দেশের সঙ্গে চীনের মূল ভূখণ্ডকে সংযুক্ত করা। এই পরিকল্পনার অংশ মূলত দুটি, সড়ক পথে মধ্য এশিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে সংযুক্ত হবে চীন। এই সড়ক পথের সঙ্গে রেলপথ ও তেলের পাইপলাইনও রয়েছে। একইসঙ্গে সমুদ্রপথেও, বিশেষ করে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সংযুক্ত হবে চীন। বলা হয়ে থাকে প্রাচীন সিল্ক রুটের আধুনিক সংস্করণ এটি।

২০১৬ সালের অক্টোবরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এর ঢাকা সফরের সময় ‘ওয়ান বেল্ট, ওয়ান রোড’ উদ্যোগে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ যোগ দেয়। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী চীন দুটি ‘ইকোনমিক করিডর’ তৈরি করছে। একটি কুনমিং থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত সড়ক ও রেলপথ। আর দ্বিতীয়টি- চীনের জিনজিয়াং থেকে পাকিস্তানের বেলুচিস্তানের সমুদ্রবন্দর গাওদার পর্যন্ত রেল ও সড়কপথ। তবে এই করিডরের ব্যাপারে ভারতের আপত্তি রয়েছে। ভারতের প্রথম আপত্তির কারণ হলো, চীন যে দুটি ‘ইকোনমিক করিডর’ পরিকল্পনা করেছে, তার একটি পাকিস্তান-শাসিত কাশ্মীরের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। এ কারণে ভারত কয়েক বছর আগেই এ পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে।

ভারতের অর্থনীতিবিদ এবং কানেক্টিভিটি বিশেষজ্ঞ ড. প্রবীর দে বলেন, ভারত এই পরিকল্পনাকে কোনো গ্লোবাল বা আন্তর্জাতিক প্রকল্প হিসেবে দেখে না, বরং একে আঞ্চলিক পরিকল্পনার অংশ মনে করে। ফলে ভারতের উদ্বেগের কারণ ভিন্ন বলে তিনি মনে করেন। প্রথমত এটা যাবে কাশ্মীরের ভেতর দিয়ে, যেটা নিয়ে ভারতের বহুদিনের বিরোধ আছে পাকিস্তানের সঙ্গে। আর দ্বিতীয়ত, এটার অর্থায়ন মোটেও সলিড কোনো খাত থেকে হচ্ছে না। বরং সেটা হবে ডেট ফাইন্যান্সিং এর মাধ্যমে, অর্থাত্ এটা আপনাকে ঋণের মধ্যে ফেলে দেবে।

এ ছাড়া, গত দশ বছরে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে যে উন্নতি হয়েছে, এ প্রকল্পে যুক্ত হওয়ার পর বাংলাদেশ চীনের প্রভাব বলয়ে ঢুকে যেতে পারে এমন একটি শংকাও রয়েছে ভারতের।

কিন্তু বাংলাদেশ কেন যেতে চাইছে?

বিশ্লেষকরা মনে করেন, গত এক দশকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে অর্থনৈতিক উন্নয়নের বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আর সেকারণেই বাংলাদেশ সরকার চীনের এই প্রকল্পে যোগ দিয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন মনে করেন, এই মুহূর্তে বাংলাদেশের কাছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের গুরুত্ব বেশি হওয়ার কারণে কেবল চীন নয়, আশেপাশের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সংযোগ গড়ে তোলাতেই বেশি গুরুত্ব দেবে বাংলাদেশ। ভৌগলিক কারণে বাংলাদেশ যেহেতু ছোট দেশ এবং সীমান্তের তিনদিকে রয়েছে ভারত, ফলে তার কিছু সুবিধা ও অসুবিধা দুই-ই রয়েছে। সে সীমাবদ্ধতা কাটাতে হলে আমাদের বাকি দুনিয়ার সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে হবে।

আরও পড়ুন: ভেনিজুয়েলায় বিরোধী নেতাকে ট্রাম্পের স্বীকৃতি

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কী বার্তা দিলেন ভারতকে?

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সিএনএন নিউজ এইটিনের সঙ্গে সাক্ষাত্কারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতকে তার নিজের দেশের অগ্রাধিকারের ব্যাপারটাই আরেকবার মনে করিয়ে দিয়েছেন। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের রাজনৈতিক সম্পর্ক ভালো, তবে একইসাথে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক অংশীদার দেশ চীন। দেশটির সাথে বাংলাদেশের প্রায় দেড় হাজার কোটি মার্কিন ডলারের ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে। অন্যদিকে ভারতের সাথে বাংলাদেশের ব্যবসা চীনের তুলনায় এক তৃতীয়াংশ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী চীন বাংলাদেশকে ২,৪০০ কোটি ডলারের ঋণ দেবে, যার বেশির ভাগই অবকাঠামো খাতে। বর্তমানে চীন বাংলাদেশে পদ্মা সেতুসহ নানা অবকাঠামো প্রকল্পের সাথে সরাসরি জড়িত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, প্রধানমন্ত্রী আলোচনার মাধ্যমে আপত্তি নিষ্পত্তির কথা বলে এই বার্তাও দিয়েছেন যে হয়তো এ প্রশ্নে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি বাংলাদেশ।

ইত্তেফাক/আরকেজি