অর্থনীতি ও ব্যবসা বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পৃথিবীর সব দেশেই প্রত্যাশা করা হয়, সম্ভাবনাময় খাতকে সামনে আনার। বিশেষ করে রপ্তানির নতুন খাত চিহ্নিত করে তার বিকাশ ঘটাতে নেওয়া হয় নানা উদ্যোগ। গত কয়েক বছরে দেশের রপ্তানি আয় বেড়েছে যতটা; কাঙ্খিত হারে বিকাশ ঘটেনি সম্ভাবনাময় খাত। ফলে একক নির্ভরতার হাত ধরেই অনেকটা এগিয়ে চলছে রপ্তানি আয়ের হিসাব নিকাশ। এই যেমন বিশ্ব অর্থনীতির দুই পরাশক্তি চীন-যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য দ্বন্দ্ব, ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতন, ব্রেক্সিট কার্যকরসহ নানা ইস্যুর পরও সুবাতাস বইছে দেশের রপ্তানি আয়ে। তবে তার একক নির্ভরতা হলো তৈরি পোশাকে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হালনাগাদ হিসাব বলছে, অর্থবছরের প্রথম চার মাস অর্থাত্ জুলাই থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত তৈরি পোশাক খাত থেকে রপ্তানি আয় এসেছে ১ হাজার ১৩৩ কোটি ডলার। যা বছর ব্যবধানে বেড়েছে ২০ শতাংশের বেশি। তৈরি পোশাকের এই প্রবৃদ্ধি ছাড়িয়েছে প্রত্যাশাকেও। তবে পোশাকের মতো সুখবর নেই অন্য খাতগুলোতে।
রপ্তানি বাণিজ্যকে উত্সাহিত করতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পণ্য রপ্তানির বিপরীতে ৩৫ টি খাতে নগদ অর্থ সহায়তা বা ভর্তুকি দিয়ে আসছে সরকার। এছাড়াও গত আগস্ট মাসে আরো ৯টি পণ্যে ১০ শতাংশ নগদ ভর্তুকির ঘোষণা দেওয়া হয়। প্রশ্ন হলো রপ্তানি বাণিজ্য বাড়াতে নগদ প্রণোদনা ও সহায়তা বাড়ানো হলেও বিপরীতে সুফল মিলছে কতটা।
রপ্তানি আয় বাড়াতে প্লাস্টিক, তথ্য প্রযুক্তিসহ একাধিক খাতকে সামনে আনার কথা বলা হলেও তার কার্যকর বাস্তবায়ন মিলছে না। বরং উল্টো অসমতা তৈরি হচ্ছে রপ্তানি প্রবৃদ্ধিতে। ফলে ছন্দহীন এক প্রবৃদ্ধি আসছে দেশের সামগ্রিক রপ্তানি বাণিজ্যে।
যেমন চলতি অর্থবছরে তৈরি পোশাকের প্রবৃদ্ধিতে একরকম চমক মিললেও হতাশা বাড়াচ্ছে বিকল্প সম্ভাবনাময় খাতগুলো। কারণ চামড়া, কৃষিপণ্য, হিমায়িত পণ্যের মতো খাতগুলো চলে যাচ্ছে পেছনের দিকে। বিশেষ করে, কয়েক বছর ধরে বিলিয়ন ডলারের বৃত্তে আটকে থাকা চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের আয় বছর ব্যধানে উল্টো কমেছে সাড়ে উনিশ শতাংশ। রপ্তানির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এই খাতে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে রপ্তানির এমন চিত্র নিয়ে বিশ্লেষকরা বলছেন, চামড়া খাতে গত কয়েক বছরে বিপুল ব্যয় করেও মিলছে না এ খাতের রপ্তানির সুফল।
হিসাব বলছে, বিশ্বে চামড়াজাত পণ্যের বাজারের আকার প্রায় ২৪ হাজার কোটি ডলারের। বিশাল এই বাজারে বাংলাদেশের হিস্যা খুবই নগণ্য। যা বাড়ানোর অনেক সুযোগ রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট অনেকেই। এক গবেষায় উঠে এসেছে যে, চামড়া শিল্প নগরে ট্যানারি স্থানান্তর সফল হলে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে রপ্তানি আয় ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত হতে পারে। কেননা বাংলাদেশের চামড়ার মান যে ভালো এ বিষয়ে সন্দেহ নেই। এছাড়া পোশাক খাতের চেয়ে এ খাতে মূল্য সংযোজন বেশি। তবে যে প্রত্যাশা নিয়ে ট্যানারি শিল্প স্থানান্তর করা হয়েছে তার প্রকৃত সুফল মিলছে না বলে মনে করেন অর্থনীতি বিশ্লেষক ও গবেষকরা। ফলে রপ্তানি তালিকায় ২য় অবস্থানে থেকেও রপ্তানি বাজারে বিশাল ব্যবধান হয়ে আছে তৈরি পোশাকের সঙ্গে।
রপ্তানির হালনাগাদ পরিসংখ্যান বলছে, একই অবস্থা পাট ও পাটজাত পণ্যেও। এখাতেও নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি এসেছে অর্থবছরের প্রথম চার মাসে। আলোচ্য সময়ে এ খাতে রপ্তানির লক্ষ্য ছিল প্রায় ৩৪ কোটি ডলার, বিপরীতে আয় করা গেছে ২৮ কোটি ডলার। এছাড়া হিমায়িত খাদ্য রপ্তানিতেও প্রবৃদ্ধি কমেছে ১৩.০৪ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, তৈরি পোশাক ছাড়া বিকল্প সম্ভাবনাময় রপ্তানি খাতগুলোকে আন্তর্জাতিক মান এবং প্রতিযোগিতা সক্ষম করে তোলা যায়নি। এমনকি অন্য খাতগুলোর কমপ্লায়েন্স ইস্যুতেও কার্যকর মনোযোগ দেওয়া হচ্ছে না। ফলে কেবল সম্ভাবনাময় তালিকায় আটকে আছে একাধিক খাত। যা থেকে কাঙ্খিত প্রবৃদ্ধি আসছে না।
এমন অবস্থা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ, প্রধান রপ্তানি খাতগুলো কেন পিছিয়ে পড়ছে তা চিহ্নিত করে বহুমুখীকরণ আর বৈচিত্র্যকরণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার। নয়তো এমন চিত্র না পাল্টালে, রপ্তানিতে আয় বাড়লেও অসমতা থেকেই যাবে যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই সুফল বয়ে আনবে না।
