১৯৭১ সালে দৈনিক ইত্তেফাক (৫ মার্চ)

আপডেট : ০৫ মার্চ ২০২১, ১৫:৩৯

১৯৫৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর দৈনিক হিসেবে যাত্রা শুরুর পর থেকে ইত্তেফাক হয়ে ওঠে গণমানুষের মুখপত্র।  বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে অসামান্য ভূমিকা রেখেছিল পত্রিকাটি। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে আপসহীনভাবে সত্য প্রকাশ করে গেছে ইত্তেফাক। পত্রিকাটির এই ভূমিকা উপমহাদেশের সংবাদপত্রের ইতিহাসের একটি উজ্জ্বল অধ্যায়।

স্বাধীনতার মাস অগ্নিঝরা মার্চে দৈনিক ইত্তেফাক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৭১ সালের ৫ মার্চ প্রকাশিত দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতার প্রধান শিরোনাম ছিল, ‘জয় বাংলার’ জয়। রাজনৈতিক ভাষ্যকার নামে সম্পাদকীয়র আদলে মূল খবরটি উপস্থাপন করা হয়। আগের তিন দিনের ঘটনাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে ‘অস্ত্রের ভাষার’ মোকাবিলায় স্বাধিকারকামী নিরস্ত্র জনগণের সংগ্রামকে জয়যুক্ত হিসেবে দেখেছে দৈনিক ইত্তেফাক। পরদিন ৬ মার্চ পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের ঢাকায় আসার গুঞ্জনের তথ্য উল্লেখ করা হয় খবরটিতে। 

জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত রাখার প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকা কর্মসূচির দুই দিন না যেতেই শহর থেকে সান্ধ্য আইন প্রত্যাহার করা হয়। ৩ মার্চ ক্ষেত্রবিশেষে গুলি চললেও আগের দিন (৪ মার্চ) দিনে ও রাতে সামরিক প্রহরীদের আনাগোনা ছিল না বলে জানানো হয় রাজনৈতিক ভাষ্যকারের তথ্যে। 

১৯৭১ সালের ৪ মার্চ সংগ্রামী জনতার প্রতি  অভিনন্দন জানিয়ে বিবৃতি দেন বঙ্গবন্ধু। ৫ মার্চ দৈনিক ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় এ নিয়ে একটি খবর প্রকাশিত হয়। শোষণ ও উপনিবেশবাদী শাসন অব্যাহত রাখার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর আহ্বানে সাড়া দেওয়ায় বীর জনতাকে জানান তিনি। আওয়ামী লীগ প্রধান বলেন, ‘বিশ্ববাসী দেখে রাখুক. বাংলাদেশের নিরস্ত্র ছাত্র-শ্রমিক-জনতা বুলেটের মুখেও কী দুর্দান্ত সাহস ও দৃঢ়তার সঙ্গে তাদের অধিকার হরণের চক্রান্তের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে।’

শেখ মুজিব বিবৃতিতে মনে করিয়ে দেন, ‘চরম ত্যাগ স্বীকার ছাড়া কোনোদিন কোনো জাতির মুক্তি অর্জিত হয়নি। জনগণকে তাই যেকোনো মূল্যে স্বাধিকার আদায়কল্পে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।’

দৈনিক ইত্তেফাকের ৫ মার্চের প্রথম পাতায় ওপরের দিকে রাখা একটি খবরের শিরোনাম ছিল, ‘অবিলম্বে আওয়ামী লীগের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করুন’। করাচি প্রেসক্লাবে ৪ মার্চ এই দাবি জানান এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান। 

‘গোলটেবিলে নয়, জাতীয় পরিষদে’ শিরোনামে আরেকটি খবর ছিল ইত্তেফাকের ৫ মার্চের প্রথম পাতায়। পিপিপি প্রধান নুরুল আমিন শিগগিরই জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ডাকার আহ্বান জানান। পাকিস্তানের সামরিক শাসকদের ডাকা ১০ মার্চের নেতৃসম্মেলন যোগদানের আমন্ত্রণ এক বিবৃতির মাধ্যমে প্রত্যাখ্যান করেন তিনি।

ইত্তেফাকের ৫ মার্চের প্রথম পাতায় নিচের অংশের বাঁ-দিকে প্রকাশিত একটি খবরে জানানো হয়, বেতার, টিভি ও চলচ্চিত্রের ২০ জন বিশিষ্ট শিল্পী সংবাদমাধ্যমে দেওয়া যৌথ বিবৃতিতে বেতার-টেলিভিশন বর্জনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যতদিন গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র এবং জনগণ ও ছাত্র-সমাজ সংগ্রাম করবে ততদিন তারা বেতার-টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন না।

জাতীয় পরিষদের অধিবেশ স্থগিত রাখার প্রতিবাদে বঙ্গবন্ধুর ডাকা কর্মসূচিতে আগের দুই দিন অগ্নিসংযোগ, গোলাগুলি ও সংঘর্ষসহ চট্টগ্রামে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১২১। এছাড়া খুলনায় ৬ জন নিহতসহ ৩৩ জন হতাহতের ঘটনা ঘটে। ৫ মার্চের ইত্তেফাকের প্রথম পাতায় এই তথ্য জানানো হয় একটি খবরের শিরোনামে। এ কারণে ব্লাড ব্যাংকে রক্ত দিতে আবেদন জানান শেখ মুজিব। ইত্তেফাকের প্রথম পাতার নিচের অংশে ডান দিকে এই খবর ছাপা হয়। 

প্রথম পাতার অন্যান্য খবরগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল- ঢাকায় কারফিউ প্রত্যাহার, ভাইস অ্যাডমিরাল আহসানের ঢাকা ত্যাগ, ১১৩ নং সামরিক আইন আদেশ জারি, ঢাকা বেতার থেকে আরও দুইবার স্থানীয় সংবাদ প্রচারের ব্যবস্থা। এছাড়া প্রকাশিত হয়েছে স্বাধিকার আন্দোলনের সময়সূচি। 

ইত্তেফাক/জেএইচ