করোনার দীর্ঘ প্রভাবে ব্যাপক লোকসানের শিকার জয়পুরহাটের পোলট্রি খামারিরা বর্তমানে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন, চেষ্টা করছেন লোকসান কাটিয়ে ব্যবসাকে আবার আগের লাভজনক পর্যায়ে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে।
জয়পুরহাট জেলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি, পদ্মা ফিডস অ্যান্ড চিকস প্রা. লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী আনোয়ারুল হক আনু জানান, করোনার প্রভাবে জেলায় পোলট্রি শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাতে ৩০০ কোটি টাকার ওপরে লোকসান হয়েছে। এ শিল্প এখনো বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে। বর্তমানে খামারে মুরগি কম থাকায় দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে এ অবস্থা কতদিন থাকবে তা নিয়ে তিনি সংশয় প্রকাশ করেন। এই শিল্পে করোনার ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারের সহায়তা কামনা করেন তিনি।
জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগ জানায়, জয়পুরহাট জেলা পোলট্রি শিল্পে বিশেষ করে সোনালি মুরগি ও ডিম উত্পাদনে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উত্পাদনকারী জেলা হিসেবে পরিচিত। এখানে ছোট বড় সোনালি ও ব্রয়লার মুরগির খামার রয়েছে ১১ হাজার ১২০টি। আর লেয়ার মুরগির (ডিম পাড়া) খামার রয়েছে ৩৭০ টি। জেলায় প্রতি বছর মাংস উত্পাদন হয় ১ লাখ ২৩ হাজার ২০০ মেট্রিক টন। জয়পুরহাটের সাড়ে ৯ লাখ জনসংখ্যার মানুষের মাংসের চাহিদা ৪ হাজার ২০০ মেট্রিক টন। উদ্বৃত্ত মাংসের পরিমাণ ৮১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন, যা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়ে থাকে। জেলায় মুরগির ডিম উত্পাদন হয় প্রতি বছর ৩৮ কোটি ৯ লাখ। আর জেলায় ডিমের চাহিদা ৯ কোটি ৮৮ লাখ। উদ্বৃত্ত ডিম দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করে থাকেন খামারিরা। জয়পুরহাট জেলায় সোনালি জাতের বাচ্চা ফুটানোর হ্যাচারি রয়েছে ৫২টি। মুরগির খাদ্য উত্পাদনের জন্য ফিড মিল আছে ১১টি। হ্যাচারিগুলো থেকে প্রতি বছর সোনালি জাতের মুরগির ডিম থেকে বাচ্চা উত্পাদন হয়ে থাকে ৮ কোটি ৫০ লাখ। জেলায় মুরগির বাচ্চার চাহিদা রয়েছে ৬ কোটি ২৫ লাখ। উদ্বৃত্ত মুরগির বাচ্চা জয়পুরহাট জেলার বাইরে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। পোলট্রি শিল্পকে কেন্দ্র করে জেলায় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ ১ বছর ধরে করোনার প্রার্দুভাব থাকায় পোলট্রি খামারিরা পড়ে যান মহাবিপর্যয়ের মুখে। ছোট ও মাঝারি খামারিরা পুঁজি হারিয়ে পথে বসেছেন। তবে গত এক মাস ধরে মুরগির দাম বাড়তে থাকায় আশার আলো দেখছেন খামার মালিকরা।
সোনালি মুরগির খামার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমানে সোনালি মুরগির এক দিনের বাচ্চা ১২ টাকা থেকে ১৪ টাকায় কিনে তা ৬০-৬৫ দিন লালন পালন করতে হয়। প্রতি কেজি মাংস উত্পাদনে তাদের খরচ হয় ১৬০ টাকা থেকে ১৭০ টাকা। বর্তমান পাইকারি বাজারে ২৩০ টাকা থেকে ২৪০ টাকা কেজি দরে সোনালি মুরগি বিক্রি করছেন। বাজারে খুচরা ব্যবসায়ীরা ঐ মুরগি প্রতি কেজি ২৮০ টাকা দরে ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করছেন। আর ব্রয়লার মুরগি ১৬০ টাকা কেজি দরে খুচরা বিক্রি হচ্ছে। দাম বৃদ্ধি প্রসঙ্গে খামারি ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, করোনার প্রভাবে জেলায় সিংহভাগ পোলট্রি খামার বন্ধ থাকায় চাহিদার তুলনায় বাজারে সরবরাহ কম, ফলে মুরগির দাম বেড়েছে। করোনার প্রার্দুভাব কমতে শুরু করায় বর্তমানে বিয়ে-শাদি, পিকনিকসহ নানা অনুষ্ঠানের জন্য মুরগির মাংসের চাহিদা কিছুটা বেড়ে গেছে।
জেলার পোলট্রি খামারিদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ যুব উদ্যোক্তার পুরস্কারপ্রাপ্ত ক্ষেতলাল উপজেলার তাহেরামজিদ অ্যাগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আতিকুর রহমান বলেন, করোনা শুরু হওয়ার তিন মাসের মধ্যে তার লোকসান হয়েছে ৯৬ লাখ টাকা। নিজস্ব খামারে উত্পাদিত ১ লাখ সোনালি (মাংসের) মুরগী, ১০ হাজার সোনালি ডিমের মুরগী ও ৫০ হাজার ব্রয়লার মুরগি প্রতিষ্ঠানের পিকআপের মাধ্যমে ঢাকা, চাপাইনবাবগঞ্জ ও দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন স্থানে সরবারহ করা হতো। তিনি জানান, ব্যাংক ঋণ ৫০ লাখ টাকাসহ তার পুঁজি ছিল প্রায় ৩ কোটি টাকা। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তিনি এখন পুঁজিশূন্য অবস্থায় রয়েছেন। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সরকারের প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় সাড়ে ২২ হাজার টাকা পেয়েছেন তিনি। টুকটাক মুরগি উত্পাদন শুরু করলেও করিমপুরের ৬০ হাজার মুরগি উত্পাদনের শেডগুলো টাকার অভাবে এখনো বন্ধ রয়েছে। কালাই উপজেলার বাদাউচ্চ গ্রামের খামারি কাওসার, কাদিরপুর গ্রামের খামারি আবু সাঈদ ও কয়তাহার গ্রামের খামারি সাইদুল ইসলাম বলেন, করোনায় পুঁজি হারিয়ে তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। জেলা সদরের আমতলি এলাকার বাসিন্দা উত্তরণ ফার্মিং কমপ্লেক্স এবং কিষাণ হ্যাচারির মালিক ফরিদ হোসেন জানালেন, করোনার কারণে গত বছরের ২৭ মার্চ থেকে পোলট্রি শিল্পে ধস নামতে শুরু করে। হ্যাচারিগুলোতে উত্পাদিত এক দিনের বাচ্চা ১-২ টাকা দামেও কেনার মতো ক্রেতা পাওয়া যায়নি সে সময়ে। হ্যাচারির মালিকদের যে কী পরিমাণ লোকসান গুণতে হয়েছে তা বলে বুঝানো যাবে না। এ ক্ষত শুকাতে কত দিন লাগবে কে জানে।
ক্ষেতলাল উপজেলার মহব্বতপুর গ্রামের ক্ষুদ্র খামারি জুলকার নাইন সিমু বলেন, করোনার সময়ে তার খামারে ১ হাজার ৫০০ সোনালি জাতের মাংসের মুরগি ছিল। প্রায় ২ লাখ টাকা লোকসানে পড়ে তার খামার বর্তমানে বন্ধ। আক্কেলপুর উপজেলার জামালগঞ্জ বাজারের বড় পোলট্রি শিল্প শেফালি পোলট্রি ফার্ম লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী সাইফুল আলম বলেন, অধিকাংশ খামারি, হ্যাচারি ও ফিড মিল মালিকদের ব্যাংক ঋণ আছে। তিনি সরকারের কাছে ঋণের সুদের টাকা মওকুফের আহ্বান জানান।
জয়পুরহাট জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (ডিএলও) ডা. মাহফুজার রহমান বলেন, বর্তমানে করোনার প্রভাব অনেকটা কমে যাওয়ায় পোলট্রি শিল্পটি আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগ জেলায় ৫ হাজার ১০০ পোলট্রি খামারিকে প্রণোদনার আওতায় এনেছে।
