রিফাত মুনীর ইতি
উদ্যমী ও প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে গঠিত হয়েছে এবারের মন্ত্রীসভা। তাঁদের নিয়ে মানুষের আকাঙ্ক্ষার পারদ ক্রমশ ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে। বিশেষত দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা দুর্নীতি ও অব্যবস্থার বিরুদ্ধে সোচ্চার হবার যে প্রাথমিক নীতি গ্রহণ করেছে সরকার, তা প্রশংসার যোগ্য।
আমরা সবাই জানি, দেশের স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান অবস্থার কথা। যেখানে একজন পাস করা ডাক্তারের বিপরীতে প্রতিদিন বাড়ছে জনস্রোত, সেখানে বেড়ে যাচ্ছে চিকিত্সা ব্যয়। ঠিক এমনই পরিস্থিতিতে সরকারি হাসপাতালে ডাক্তারদের নিয়মিত অনুপস্থিতি, থানা, উপজেলা ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে প্যাথলজ্যিকাল পরীক্ষার ভালো ব্যবস্থা না থাকা এবং প্রয়োজনীয় চিকিত্সা উপকরণ ও লোকবলের অভাব পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলেছে। তাই সময় এসেছে পরিবর্তনের। স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি রোধ করে একে প্রকৃত জনকল্যাণে কাজে লাগানোর জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ কার্যকর হতে পারে। যেমন—
এক. বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকের অভাব দূর করতে নবীন চিকিত্সকদের ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নেবার ব্যাপারটি নিশ্চিত করা।
দুই. যে কোনো পেশার মতোই যোগ্য, সত্ ও মেধাবী ব্যক্তির মূল্যায়ন এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনে ইচ্ছাকৃত অবহেলার জন্য সাময়িক কিংবা দীর্ঘমেয়াদি শাস্তি এই পেশার প্রতি দায়বদ্ধতা ও নিষ্ঠা বাড়িয়ে দেবে নিঃসন্দেহে।
তিন. সরকারি হাসপাতালেগুলোতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নার্সসহ ওয়ার্ড বয়, ঝাড়ুদার, পরিচ্ছন্নতা-কর্মী, নিরাপত্তা-কর্মীসহ বিভিন্ন পদে কর্মীর সংখ্যা বাড়াতে হবে। এদের প্রতিও মানুষের আস্থা অর্জনের জন্য কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা দরকার।
চার. সরকারি হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকদের উপস্থিতি ও সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সবরকম সরকারি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। তাঁদের প্রাইভেট ক্লিনিক কিংবা চেম্বারে অতিরিক্ত ফি আদায়ের ব্যাপারে সরকারি নজরদারি প্রয়োজন।
পাঁচ. প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার জন্য রাজধানীর ল্যাবগুলোতে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এসব ল্যাবে ব্যবহূত নিরীক্ষার যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষিত নিরীক্ষক নিয়োগের বিষয়টি নিশ্চিত করা দরকার।
ছয়. শুধু চিকিত্সাসেবা নিতে বিদেশ গমনের হার গত তিন দশকে বেড়েছে কয়েক শ গুণ, যার কারণে অনুসন্ধান ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
সাত. একজন চিকিত্সকের কাজ শুধু রোগের বিবরণ শুনে ব্যবস্থাপত্র লেখা নয়, বরং রোগীর মানসিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ ও বিশেষণ যেটি আমাদের দেশে একরকম অনুপস্থিত বলা চলে। কাজেই এ ব্যাপারেও সচেতন হতে হবে ।
আট. এদেশের প্রাইভেট মেডিকেল কলেজগুলোর শিক্ষানীতি, প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক ক্লাস ও অন্যান্য অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা কতটুকু সে ব্যাপারে নিশ্চিত না হয়েই প্রতিবছর হাজার হাজার টাকা খরচ করে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হচ্ছে, এবং একসময় সার্টিফিকেট পেয়ে যাচ্ছে। এই ডাক্তারদের একটা বড় অংশ বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিক অথবা ব্যক্তিগত চেম্বারে সেবাদান করতে ব্যস্ত। প্রাইভেট মেডিকেল কলেজগুলো নির্দিষ্ট মানদণ্ডে যাতে শিক্ষা ও সার্টিফিকেট প্রদান করতে পারে সে ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন জরুরি।
নয়. চিকিত্সকও একজন মানুষ—এই কথাটি মাথায় রেখে ডাক্তার রোগী সমপর্ক উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া দরকার। আমাদের পারসপরিক ভুল বোঝাবুঝি নিরসনে উদ্যোগী হবার অভাবেই মূলত এই উভয় শ্রেণির মধ্যে দূরত্ব বেড়ে চলেছে। দীর্ঘদিন ধরে রোগের চিকিত্সা না করার প্রবণতাসহ মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হবার পর, যে কোনো দুর্ঘটনার জন্য আমরা সহজেই চিকিত্সকের ওপর দোষ চাপানোর যে সহজ পন্থা বেছে নেই, তা যে কতটা অযৌক্তিক সেটিও সাধারণের কাছে পরিষ্কার হওয়া দরকার।
সর্বোপরি, স্বাস্থ্য খাতের সকল অব্যবস্থা দূর করে একে নিয়মতান্ত্রিক, সুশীল রূপ দিতে নাগরিকদের সচেতনতার পাশাপাশি সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা দরকার।
ঢাকা
